বিকেলবেলা রেহানা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। মা তখনো রান্নাঘরে। এতগুলো মানুষের খাওয়া কেবল শেষ হলো। সবকিছু গোছগাছ করতে তিনি সাহায্য করছেন আবদুলদের। বাসার সামনে একটা আমগাছ। গাছটা দোতলা পর্যন্ত উঠে এসেছে। আমের ছোট ছোট গুটি এসেছে গাছে। যা সুন্দর লাগছে। দেখতে। দুই দিন আগের বৃষ্টিতে পাতাগুলো ধোয়া হয়ে গেছে। পাতাগুলো সবুজ আর বেশ পুষ্ট দেখাচ্ছে।
বাড়ির সামনে একটা মোটরসাইকেল এসে দাঁড়াল। দুজন আরোহী তাতে। তরুণ বয়সী বলেই মনে হয়। একজন তাঁদের বাড়ির সামনেই থাকলেন। আরেকজন মোটরবাইকটা নিয়ে রাস্তার উল্টো পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রেহানার গভীর সন্দেহ হচ্ছে। এই দুজন কারা? কেন তারা এই বাড়ির সামনেই এসে দাঁড়াল?
একটু পরে রঙিন জামা পরা, মাথার মধ্যখানে সিঁথি, দাড়িগোঁফবিহীন। ছেলেটা এসে ঢুকে পড়ল বাসায়। তারপর সোজা চলে গেল রেনুর কাছে। মা বলে জড়িয়ে ধরল তাঁকে।
মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন, কামাল, কই ছিলি বাবা এত দিন?
কামাল আস্তে আস্তে মুখ খুললেন। একটা সুইডিশ ফ্যামিলির সাথে ছিলাম। গোঁফ তো আগেই কেটেছি। হেয়ারস্টাইলও বদলে ফেলেছি। দেখছ না কেমন লাল ফুলওয়ালা জামা পরেছি। যাতে কেউ চিনতে না পারে।
রেহানা বললেন, আমিই তো চিনতে পারি নাই। কামাল ভাই, মোটরসাইকেল চালাচ্ছে কে?
তারেক।
রেনু বললেন, তারেককে ওপরে ডেকে নিয়ে আয়।
তারেক এলেন। দেখা করে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। মা ছেলের জন্য ভাত বাড়লেন। কামাল আস্তে আস্তে ভাত খাচ্ছেন। রেহানাও পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
কামাল খোকা কাকুর গাড়ি নিয়ে বের হলেন। সবাই খুব উদ্বিগ্ন। রেনু বারবার করে বলতে লাগলেন, ভাইডি, কাজটা কি তুই ঠিক করলি? অরে গাড়ির চাবি দিলি ক্যান?
ও চাইলে আমি না করি কী করে?
এখন সেই যে গেল। আসতেছি বলে গেল। আসে না তো। রাস্তায় মিলিটারি চেকপোস্ট। চেক করলেই তো ওকে ধরে ফেলবে।
সবার চোখেমুখে উদ্বেগের ছায়া এসে ভর করল। রেহানা বারান্দায় কামাল ভাইয়ের পথ চেয়ে তাকিয়ে রইলেন। কোনো গাড়ি যদি এদিকটায় আসে, তাহলে তো চোখে পড়বেই। জামালও উদ্বিগ্ন। কামাল ভাই যে কী করে না? গাড়ি নিয়ে যাওয়ার দরকার কী! জামাল বললেন।
সন্ধ্যার দিকে কামাল ফিরলেন। বললেন, আমি চলে যাব মা।
কই যাবি?
আপাতত টুঙ্গিপাড়া যাব। ঢাকায় থাকা একদম নিরাপদ নয়।
মা বললেন, আচ্ছা যা।
কামাল বললেন, রেহানা, ওই ব্যাগটা আন। খোল। দ্যাখ ভিতরে একটা টু ইন ওয়ান আছে। আমার হোস্ট ফ্যামিলি আমাকে গিফট করেছে। এটা তুই রাখ। দেশ-বিদেশের খবর শুনতে পারবি। গানও শুনতে পারবি। আর শোন, পাকিস্তানি মিলিটারি যদি আসে, খবরদার ধরা দিবি না। হয় পালিয়ে যাবি, না হলে মারা যাবি।
রেনু বললেন, এগুলো কী ধরনের কথা?
কামাল বললেন, যা রিয়েল, তাই বললাম। পাকিস্তানি সৈন্যরা তো মানুষ না, পশু।
কামাল বেরিয়ে পড়লেন। লঞ্চ ধরতে হবে। সদরঘাট যেতে হবে। নিচে তারেক দাঁড়িয়ে আছেন মোটরসাইকেলসমেত।
রেহানার ইচ্ছা হলো, নিচে গিয়ে ভাইকে বিদায় দিয়ে আসেন। কিন্তু সম্ভব নয়। তারা এখানে আছেন নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে। পাড়া প্রতিবেশীকে তাঁরা জানাতে চান না নিজেদের পরিচয়।
সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। হেডলাইট জ্বালিয়ে ভটভট শব্দ তুলে কামালকে পেছনে তুলে নিয়ে তারেকের মোটরবাইক অদৃশ্য হয়ে গেল।
রেনু বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
পরের দিন বাড়িতে এলেন কয়েকজন মহিলা। তাঁরা বললেন, আমরা এসেছি আশপাশের বাসা থেকে।
তাঁরা রেনুকে বললেন, আপনারা নাকি শেখ সাহেবের আত্মীয়।
সবাই চুপ করে আছেন। কী বলবেন এই প্রশ্নের উত্তরে।
কালকে নাকি শেখ সাহেবের ছেলে কামাল এই বাড়িতে এসেছিল? আপনারা আপা প্লিজ এই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। জানেনই তো ৩২ নম্বরের বাড়িতে মিলিটারিরা হামলা চালিয়েছে। শেখ সাহেব চলে যাওয়ার পরও মিলিটারি গিয়ে পুরা বাড়িতে গুলি করেছে। জিনিসপত্র তছনছ করেছে। আপনারা এই বাড়িতে আছেন জানলে এই বাড়িতেও কামান দাগাবে। আপনারা চলে যান প্লিজ।
রেনু বললেন, আচ্ছা, একটা দিন সময় অন্তত দেন।
এরই মধ্যে রেহানার ছোট ফুফু খবর পাঠালেন, তিনি গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন। রেনু বললেন, তাহলে জেলি, রোজী, ডলি এদেরকেও নিয়ে যা। ঘরে মেয়েদের রাখা বড়ই বিপদের কথা।
খোকাকে বললেন, ভাইডি, ওদের একটু সদরঘাট পৌঁছায়ে দাও না।
ভাবির কথা খোকার জন্যে অলঙ্ঘনীয় হুকুম। কী সর্বনাশের কথা! সদরঘাটের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গেলে রক্ষা আছে? তবু আল্লাহর নাম নিয়ে খোকা বের হলেন জেলি, রোজী, ডলি, তাদের মাকে নিয়ে সদরঘাটের দিকে।
আরেকটা বাড়ি খুঁজে বের করতে হবে। একটা সমাধান আপনাপনিই পাওয়া গেল। বদরুন্নেসা আর নূরুদ্দিন ভারত চলে গেছেন। তাঁদের মগবাজারের বাড়ির চাবি রেখে গেছেন। খবর দিয়েছেন, মুজিব ভাই নেই, এই দুঃসময়ে বাসা ভাড়া করে থাকার দরকার কী। আমাদের মগবাজারের বাড়িতে থাকুন।
এত দিন ওই বাড়ির কথা রেনু ভাবতে চাননি, বাড়িটা একেবারে বড় রাস্তার ওপরে। ১ নম্বর সার্কুলার রোড। এখন আর উপায় কী?
তারা গিয়ে মগবাজারের বাড়িতেই উঠলেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, এই ছিল তাগো বরাতে।
