এই তো চৌধুরীপাড়াতেই। গোলচত্বরের কাছে। ফ্ল্যাটবাড়ি। বাড়িওয়ালি তো আমার আগের পরিচিত। কমলাপুর জাহাজবাড়ির মালিক। ওদের বাড়িতে আগে তো আমি ভাড়া থাকতাম।
বাসা ভালো? রেনু বললেন।
হ্যাঁ। ভালো। চলেন দেখে আসি।
তুই দেখেছিস। তোর পছন্দ হয়েছে। আর দেখতে হবে না নে। ভাড়া কত?
পাঁচ শ টাকা।
এত টাকা কই পাব?
ভাবি। আমি তো আছি, ভাবি। মিয়া ভাই আমাকে বলে গেছেন, আপনাদের দায়িত্ব আমার।
অগ্রিম দিতে হবে?
না। এক মাসের ভাড়া দিয়ে এসেছি।
চল, তাহলে উঠে যাই।
পলির শাশুড়ি দিলেন চাদর। কিছু হাঁড়িকুঁড়িও দিয়ে দিলেন। খোকার গাড়ি করে রেনু, জামাল, রেহানা, রাসেল উঠলেন নতুন বাসায়। বাসাটা বড়সড়। বেশ পছন্দই হলো রেনুর। খোকার বাড়িতে ফরিদ নামের একজন গৃহপরিচারক ছিলেন, দেখতে একেবারে চীনাদের মতো, সবাই তাকে ডাকত টুংফুং বলে, তাকে বলাই হয়েছিল, বাসা পেলে চলে এসো। সে চলে এল। সঙ্গে এল কাজের ছেলে আবদুলও। চুপচাপ তারা নতুন বাড়িতে উঠলেন। যেন কেউ টের না পায় কোন ভাড়াটে এসে উঠেছে এখানে।
আবদুল গেল কলাবাগান। রেহানাদের ফুফুর বাড়িতে। রেনুই পাঠিয়েছেন তাকে। যা তো খবর নিয়ে আয় ডলি, রোজী, ওরা কেমন আছে। লিলি কেমন আছে।
কলাবাগানে বঙ্গবন্ধুর বোন লিলির বাড়ি এসে আবদুলের চোখ ছানাবড়া। আবদুর রহমান রমা, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের লোক, যাকে কিনা ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের সময়ে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায়, সে এই বাড়িতে! লিলি যখন শুনলেন, রেনু ভাবি বাড়ি পেয়ে গেছেন, তখন তার দুই মেয়ে ডলি আর রোজীকে পাঠিয়ে দিলেন সেই বাড়িতে। কারণ, ৩২ নম্বরের খুব কাছের এই বাড়িটি যে শেখ সাহেবের বোনের, সেটা সবারই জানা। এই বাড়িতে দুই তরুণীকে রাখা মোটেও নিরাপদ নয়।
৩২ নম্বরের আরেক পরিচারক, ২৫ মার্চ রাতে মিলিটারির হাতে ধরা পড়া রমা এল চৌধুরীপাড়ার বাড়িতে। সবাই তাকে ঘিরে ধরলেন।
রমা, কী খবর? আব্বা কোথায়? রেহানা জিজ্ঞেস করলেন।
সাহেবকে তো আমাদের সাথে একটা স্কুলে রাখছিল।
তোমরা আব্বাকে দেখলা কীভাবে?
সাহেব বাথরুমে যাচ্ছিল। তখন বুড়ি চিৎকার করে ওঠে তাকে দেখে। আমরাও দেখি। স্যার তখন ইংরেজিতে অনেক গালি দিল। আমাকে এনেছ, এনেছ, এদেরকে কেন এনেছ। তখন আমাদেরকে ছেড়ে দেয়।
কত তারিখে ছাড়ে?
তিন রাইত আছিলাম তো ওইখানে।
কেমনে ছাড়ল?
আমাদেরকে ট্রাকে তুলে আইয়ুব গেটের কাছে নামায় দিয়ে গাড়ি চইলা যায়!
আব্বা এখন কোথায় জানো?
না তো জানি না।
আব্বা বেঁচে আছে, মা, আব্বা বেঁচে আছে। কাঁদতে কাঁদতে রেহানা জড়িয়ে ধরলেন মাকে। রেনু চোখ মুছতে লাগলেন আঁচল দিয়ে। বললেন, আজিজ কই?
আজিজ মিয়া যে কই গেল, জানি না। রমা বলল।
আম্বিয়ার মা কোথায়?
অর মাইয়াদের লগে কলাবাগানে গিয়া উঠছে।
টুংফুং (ফরিদ, বয়স ১৭) একটা আস্ত হাঁস নিয়ে এসেছে। তাকে পাঠানো হয়েছিল চাল-ডাল কিনতে। এরই মধ্যে রব উঠল মিলিটারি আসছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেনু দেখতে পেলেন, লোকজন ছুটে গ্রামের দিকে যাচ্ছে। খিলগাঁও, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া এলাকাটা আধা শহর, আধা গ্রাম। তারপরও মানুষ আরও গ্রামের দিকে ছুটছে।
রেনু ভয় পেয়ে গেলেন। ফরিদ বাইরে। না জানি কী হয়।
খানিক পরে ফরিদ এল। খোকার শাশুড়ি মাওইমা তো বলেই দিয়েছিলেন, ও চটপটে। ওকে নিয়ে যাও। আসলেই ছেলে চটপটে। চাল ডাল তো কিনে এনেছে। আবার লোকেরা যখন পালাচ্ছিল, একজনের হাতে ছিল হাঁস। সে দুই টাকা দিয়ে সেই হাঁস কিনে এনেছে।
রাসেল বলল, মা, হাঁস পুষব।
রেনু বললেন, বাবা! হাঁস পুষতে তো পানি লাগবে। আমাদের ৩২ নম্বরের বাসায় কত হাঁস ছিল! আবদুল তো হাঁস-মুরগিগুলোর খাঁচা খুলে দিছিল। গরুগুলোর দড়ি খুলে দিছিল। জানি না, সেগুলো বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে।
রাসেল বলল, বাথরুমে বালতিতে পানি ভরব। তার মধ্যে হাঁসটাকে রাখব!
রেনু বললেন, এত বড় হাঁস, বালতির পানিতে থাকবে কী করে?
এই বাড়িতে এখন মমিনুল হক খোকার বউ মমতাজও এসে গেছেন। তাঁর সঙ্গে ছোট্ট বাচ্চা, পুতুল। আর আছে ছোট্ট দুই খোকা টিটো আর সাব্বির। লিলির মেয়ে ডলি আর রোজী আছে। হাসিনা আর ওয়াজেদের ওখান থেকে চলে এসেছে জেলিও।
রেনু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। হাসুর এখন শরীরের দিকে যত্ন নেওয়া দরকার। বিশ্রাম দরকার। মন ভালো রাখা দরকার। অথচ একা একা মেয়েটা মানুষের বাসায় আশ্রিতের মতো না জানি কত কষ্ট করেই আছে। যাক, তবু তো বেঁচে আছে। কিন্তু কামালের যে কোনো খবর নেই। কামাল ভালো আছে তো!
হাসুর আব্বাই-বা কোথায় আছেন? রমার কাছ থেকে জানা গেল, বেঁচে ছিলেন। ক্যান্টনমেন্টে রেখেছে।
এই বাসায় কবে যে মিলিটারি হামলা করে ঠিক নেই। সারা রাত রেনু আর মমতাজ জেগে থাকেন। বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখেন। মিলিটারি এল কি না। জামাল আর খোকা বাড়ির পেছনের বারান্দা পরখ করে রেখেছে। একটা গাছ আছে। পানির পাইপ আছে। দিব্যি পাইপ বেয়ে নামা যাবে। মিলিটারি এলে ওরা দুজন পাইপ বেয়ে নেমে পালিয়ে যাবে।
চারদিক থেকে শুধু খারাপ খবর আসে। মানুষ মেরে ওরা রাস্তার ধারে ফেলে রেখেছে। বাসভর্তি মানুষকে বাস থেকে নামিয়ে লাইন ধরে গুলি করে মেরেছে। তবে আকাশবাণী থেকে, বিবিসি থেকে ভালো সংবাদও আসে। চট্টগ্রাম এখনো মুক্ত। কুষ্টিয়া মুক্ত। বগুড়া মুক্ত। ওখানকার মুক্তিবাহিনী। ভালো লড়াই করছে।
