তিনি বললেন, তাহলে আমি একটু দেশের ভেতরে যাই। আমাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আসি।
ঠিক আছে। আসুন।
তাজউদ্দীন ও আমীর-উল আবার সীমান্ত অতিক্রম করলেন। তৌফিক আর মাহবুব তো ছিলেনই। বিএসএফের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্য নেতাদের খবর দেওয়া হলো। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ এলেন। নির্বাচিত পরিষদ সদস্য আসহাব-উল হক এলেন। সবার সঙ্গে আলাপে তাজউদ্দীন খোলাখুলিভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন : আমাদের অস্ত্র লাগবে। ট্রেনিং লাগবে। সরকার লাগবে। হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করলে কোনো লাভ হবে না। কেবল মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়বে। আপনারা অনুমতি দিলে আমি কলকাতা যাব, দিল্লি যাব, অস্ত্র, গোলাবারুদ চাইব। আপনারা কী বলেন।
সংসদ সদস্যরা এবং অফিসাররা তখন অস্ত্র আর গোলাবারুদের জন্য। মরিয়া হয়ে আছেন। আজকে কুষ্টিয়ার লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনী জয়লাভ করেছে, আগামীকাল কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে মিলিটারি ক্যাম্প দখল করা হবে। অস্ত্র চাই। অস্ত্র। আর অস্ত্র পেলে যশোর ক্যান্টনমেন্ট দখল করা কোনো ব্যাপারই নয়।
সবাই বললেন, আপনি ভারতে যান। আমাদের জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ পাঠান। আমরা লড়াই করব।
জয় বাংলা বলে সবার কাছ থেকে অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়ে আবারও তাজউদ্দীন এবং আমীর-উল ফিরে এলেন নদীয়া জেলার টুঙ্গি সীমান্তচৌকিতে।
গোলোক মজুমদারের সঙ্গে তারা এক গাড়িতে উঠলেন। আরও আছেন কর্নেল চক্রবর্তী। গাড়ি চলেছে দমদম এয়ারপোর্টের দিকে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, অহন আমারে কও। বিএসএফের ডিজি ছুঁইটা আসতাছেন। বিএসএফের আইজি আইসা বইসা আছেন বর্ডারে তাজউদ্দীনরে রিসিভ করবার জন্য। এইটা কি বিএসএফ নিজে নিজে করল? নাকি এইটা একটা পলিটিক্যাল ডিসিশন আছিল ভারতের!
ব্যাঙ্গমি বলল, ভারত একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাগো বিএসএফ দিল্লির গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া নিজেরা নড়াচড়া করা শুরু করল, এই রকম ভাবা একদম বোকামি হইব। হয়তো তারা ভাবছিল, শেখ সাহেব নিজেই আইছেন। তাগো গোয়েন্দারা তাগো ভুল খবর দিছিল। কিন্তু এইটা হইতেই পারে না যে দিল্লির অতি উচ্চ পর্যায় থাইকা হুকুম না পাইয়াই রুস্তমজি ছুঁইটা আসতেছেন দিল্লি থাইকা।
.
গাড়ি ছুটছে। অন্ধকার পথ ধরে এগিয়ে। সামনে-পেছনে বিএসএফের আরও আরও এসকর্ট গাড়ি। পেছনের গাড়ির হেডলাইট এই গাড়িতে পড়ছে। এই গাড়ির হেডলাইট সামনের গাড়িতে পড়ছে। পূর্ব বাংলা আর পশ্চিম বাংলার দৃশ্যপটে খানিকটা পার্থক্য আছে। জল-জঙ্গল, বন-বনানী পশ্চিমে কম।
গোলোক মজুমদার বললেন, বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুবৃত্ত। বাংলায় চিরকাল বর্গিরা হানা দিয়েছে, কিন্তু কোনো দিনও এইখানে বাংলার মানুষের বীরত্বের সঙ্গে পারেনি। মানসিংহ এসে হার মেনেছেন ঈশা খাঁর তরবারির কাছে। আজকে পাঞ্জাবিরা এসেছে আপনাদের ধ্বংস করবে বলে, কিন্তু তারাও পারবে না। হার তাদের স্বীকার করতেই হবে। জয় বাংলার জয় হবেই।
দমদম এয়ারপোর্টে ভিআইপি লাউঞ্জে গেলেন তারা। তাজউদ্দীন আর আমীর–দুজনের পোশাক লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। গোলোক মজুমদার নির্দেশ দিলেন, এঁদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করো। পোশাক এল। দাড়ি কামানোর রেজর এল, সাবান এল, ব্রাশ এল। ভিআইপি লাউঞ্জের বাথরুমে ঢুকে দুজনেই ভদ্রস্থ হয়ে এলেন। তাজউদ্দীন সবচেয়ে বেশি অনুভব করছিলেন চশমার অভাব। কাছের জিনিস দেখতে পারছিলেন না ঠিকমতো। রিডিং গ্লাস চলে এল।
রাত ১১টা ৪৫। দমদম বিমানবন্দর। ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের একটা বিমান এসে বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল। বিমান থেকে নেমে এলেন কে এফ রুস্তমজি। বিএসএফের ডিজি। একটা কালো অ্যাম্বাসেডর গাড়ি এল। রুস্তমজি প্রায় ছয় ফুটের মতো লম্বা। তিনি সোজা এলেন গোলোক মজুমদার, তাজউদ্দীন ও আমীর-উলের কাছে। হাত বাড়িয়ে দিলেন। করমর্দন শেষে তারা অ্যাম্বাসেডরে উঠলেন।
গাড়ি গিয়ে থামল কলকাতার অসম হাউসে।
