তাজউদ্দীন আর আমীর উঠে বসলেন। মেজর এসে স্যালুট দিলেন দুজনকে।
সঙ্গে এলেন মাহবুব আর তৌফিক।
মাহবুব ফিসফিস করে বললেন, গোলোক মজুমদারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। উনি শুনেছেন যে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের দুজন। এসেছেন। শেখ মুজিবও হতে পারেন। বিএসএফের গোয়েন্দারা তাঁকে আগে থেকেই ইনফর্ম করে রেখেছিল। তাই তিনি নিজেই আপনাদের খোঁজে এই দিকটায় আসছিলেন…
আমি তাকে আপনাদের পরিচয় দিয়েছি। বলেছি, আপনারা ভারতে আসতে নারাজ। দেশের ভেতরে থেকেই সংগ্রাম করতে চান। তিনি আমাদের অনেক করে বোঝালেন। দেশে মুসলিম লীগার আছে, জামায়াত আছে, শত্রু কম নয়। ওদের এপারে চলে আসতে বলুন। আমরা বলেছি, ওরা আসবেন। গার্ড অব অনার দিতে হবে। সেই ব্যবস্থাও হয়েছে।
বিএসএফের অফিসার বললেন, স্যার, ইউ আর ইনভাইটেড টু আওয়ার ক্যাম্প। আমাদের বিএসএফের ইস্টার্ন জোনের আইজি গোলোক মজুমদার আসছেন, আপনাদের রিসিভ করার জন্য।
তাঁরা দুজন হাঁটতে লাগলেন। হেঁটে নো ম্যানস ল্যান্ড পার হলেন। তাজউদ্দীনের বুক ব্যথা করছে। একটা অসহ্য চাপ। নিজের দেশের মাটির বাইরে তিনি পা রাখছেন। অন্ধকারের ভেতর। অজানার ভেতর। রাতের অন্ধকারে শুধু সাধ্যমতো আলো দিয়ে যাচ্ছে জোনাকি। আহা আমার দেশ! আহা আমার দেশের মাটি!
সীমান্তের ওপারে তাজউদ্দীন ও আমীরকে গার্ড অব অনার দেওয়া হলো। সারিবদ্ধ বিএসএফ জওয়ানদের বড় বড় ছায়া পড়েছে মাটিতে।
আলো জ্বলছে ক্যাম্পের সামনে। সালাম গ্রহণ করে তারা ক্যাম্পে গিয়ে বসলেন। তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন কর্নেল চক্রবর্তী। চা-বিস্কুট-ফল দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো।
আমাদের আইজি আসছেন-কর্নেল চক্রবর্তী জানালেন।
বিএসএফ অফিসারদের একজন বললেন, শেখ সাহেবের মেসেজ আমাদের কাছে আছে। টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে মেসেজ এসেছে। আমাদের কাছে প্রিন্ট আছে। তখন তারা একটা কাগজ দেখালেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা। তাজউদ্দীন আহমদ টেলেক্স বার্তাটা বারবার করে পড়লেন। একটুখানি শিহরিত হলেন। একটুখানি উদ্বেগও। মুজিব ভাই এখন কোথায় কে জানে? কোন অকূল পাথারে। তাজউদ্দীন তরি ভাসাতে যাচ্ছেন!
.
গোলোক মজুমদার এলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিএসএফের আইজি। বছর ৪৫ এর মতো বয়স। ধারালো নাক, তীক্ষ্ণ চিবুক, জ্বলজ্বলে চোখ। পরনে বিএসএফের তারকাখচিত ইউনিফরম। দুহাত জোড় করে নমস্কার জানালেন। বললেন, একেবারে কৃষকের বেশ নিয়ে এসেছেন। কে বলবে যে ইনি আওয়ামী লীগের সেকেন্ড ইন কমান্ড শেখ মুজিবের ডান হাত তাজউদ্দীন।
ব্যারিস্টার আমীর নিজের পরিচয় দিলেন।
তাজউদ্দীন বললেন, মুজিব ভাই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে। লড়াই চালিয়ে যেতে। তবে তিনি বের হতে পেরেছেন। কি না জানি না। তিনি কোথায় আছেন কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না, আমরা কেউই সেটা বলতে পারছি না। এই নিয়েই আমার খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তবে মুজিব ভাই আমাদের বলে রেখেছেন, ভারত আমাদের শেষ ভরসা। আগেই ভরসার জায়গাটা নষ্ট কোরো না। ওদের বিব্রত কোরো না। তাই আমরা দেশেই ফিরে যাব।
না না। ভারত একদম বিব্রত হবে না। আপনাদের পাশে ভারত আছে। আমাদের পার্লামেন্টে এ নিয়ে কথা হয়েছে।
আমাদের এখন অস্ত্র-গোলাবারুদ দরকার। আপনি অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যবস্থা করুন। আপনি কথা দিন যে আপনারা অস্ত্র দেবেন। আর তা দেবেন। এখনই। অস্ত্র-গোলাবারুদ পেলেই আমরা সারা বাংলাদেশ থেকে একযোগে ঢাকায় ঢুকে পড়তে পারব এবং ঢাকা দখল করতে পারব। লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের সঙ্গে যাবে। বলুন, আপনারা অস্ত্রশস্ত্র দেবেন?
গোলোক মজুমদার বললেন, আপনাদের এই প্রশ্নের জবাব মাত্র একজনের কাছে আছে। তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাজি। আপনি চাইলে আমি তাঁর সঙ্গে আপনার দেখা করিয়ে দিতে পারব! আপনারা আমার সঙ্গে চলুন।
কোথায়?
প্রথমে যাব দমদম এয়ারপোর্ট। বিএসএফের ডিজি রুস্তমজি আসছেন দিল্লি থেকে। আপনাদের সঙ্গে কথা বলতেই। চলুন।
তাজউদ্দীনের জীবনে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখন। মুজিব ভাই বলেছেন, ভারতকে বিব্রত কোরো না। আবার মুজিব ভাই-ই তাকে পাঠিয়েছিলেন ঢাকার ভারতীয় উপহাইকমিশনে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে, প্রস্তাবটা ছিল এই যে, মুজিব যদি ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেনস করেন, যদি একপক্ষীয়ভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ভারত বাংলাদেশকে কীভাবে সাহায্য করবে? তারা কি বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেবে? তারা কি অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং দরকার হলে ট্রেনিং দেবে? কাজেই মুজিব ভাইয়ের পক্ষ থেকে এটা পাওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ ছিল না তো বটেই, বরং অনুরোধই ছিল। ১৪ মার্চে বঙ্গবন্ধু আবার পাঠিয়েছিলেন। সুজাত আলীকে, ভারতের কাছ থেকে এই সংকটময় মুহূর্তে দরকারি সাহায্য চাওয়ার বার্তা নিয়ে। তাজউদ্দীন তা-ও জানেন। কাজেই যদি অস্ত্র, গোলাবারুদ সবকিছু পেতে হয়, তাহলে ভারতে যেতে হবে, আর যেহেতু গোলোক মজুমদার বলছেন যে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার দেখা করিয়ে দেবেন, এই সুযোগ ছাড়া উচিত হবে না। কাজেই তিনি এই সুযোগটা নিতে চান। সে ক্ষেত্রে তার উচিত হবে তাঁর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে একবার পরামর্শ করে নেওয়া।
