আরও দু-চারজন নেতা এসেছেন।
তাঁদের সবার কথা, অস্ত্র দেন। গোলাবারুদ দেন। আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করব। যশোর পুরাটাই দখল করে নেব।
বোঝা গেল, এদের সঙ্গে পরামর্শ করা যাবে। মাহবুব এবং তৌফিক-ই ইলাহীকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাজউদ্দীন বললেন, তোমাদের এক কাজ করতে হবে। আমাদের একটু বর্ডারে নিয়ে যেতে হবে। মুজিব ভাই আমাদের একটা ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন। কলকাতার। সেখানে গেলে সাপোর্ট পাওয়া যাবে। এটা মুজিব ভাইয়ের আদেশ। তিনি বলেছেন, ওই ঠিকানায় যোগাযোগ করলে অস্ত্র-গোলাবারুদ-ট্রেনিং পাওয়া যাবে। তোমরা কী বলো?
মাহবুব এবং তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, আমাদের অস্ত্র দরকার। গোলাবারুদ দরকার। তাহলে আমরা কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো দক্ষিণ পশ্চিম বাংলা মুক্ত করে ফেলতে পারব। আমি এরই মধ্যে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের কাছে অস্ত্র চেয়ে চিঠি দিয়েছি। ওরা আমাদের কাছে জানতে চায়, রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সঙ্গে আছে কি না। শুধু অফিসারের চিঠির ওপরে ওরা ভরসা করতে পারছে না। আপনারা দুজন যদি বিএসএফের সঙ্গে কথা বলেন, ওরা অস্ত্রশস্ত্র দেবে। বিএসএফের আইজি গোলোক মজুমদার জাতীয় নেতা কাউকে খুঁজছেন। আপনারা চলেন আমাদের সঙ্গে বর্ডারে।
ঝিনাইদহ ছেড়ে যাচ্ছে গাড়ি। দেখা গেল, হাজার হাজার মানুষ দা, কুড়াল, বল্লম, শাবল নিয়ে ট্রাকে করে করে যাচ্ছে, তাদের মুখে স্লোগান, যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জয় বাংলা। মাহবুব বললেন, জনতা যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে রেখেছে। কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘেরাও করে রেখেছে মুক্তিকামী জনতা। দুপক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে ডিসি সাহেব মারা গেছেন।
সামনের জিপে তৌফিক-ই-ইলাহী। ওই গাড়ি ড্রাইভার চালাচ্ছে। পেছনে জিপে ড্রাইভারের পাশে বসেছেন মাহবুব। পেছনের আসনে তাজউদ্দীন আর আমীর। তারা প্রথমে গেলেন চুয়াডাঙ্গা। সার্কিট হাউসের সামনে গাড়ি দাঁড়াল। মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সামরিক সদর দপ্তর। তিনি বেরিয়ে এসে জিপের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে কথা বলে নিলেন দুই নেতার সঙ্গে। দ্রুত বেলা পড়ে আসছে। আবার রওনা দেওয়া দরকার।
আবার স্টার্ট নিল দুই জিপ। তাজউদ্দীনের পরনে তেমনি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। ময়লা হয়ে সেসবের আদি রং আর বোঝা যাচ্ছে না।
তাঁরা পৌঁছালেন জীবননগর থানায়। এটা সীমান্তের সবচেয়ে নিকটবর্তী থানা। সেখান থেকে তারা এগিয়ে গেলেন বেতনাপুর সীমান্তচৌকির দিকে।
সীমান্তের কাছাকাছি একটা জায়গায় গিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হলো।
এবার তাঁরা হাঁটতে লাগলেন ভারত সীমান্তের দিকে। নো ম্যানস ল্যান্ডে গিয়ে তাজউদ্দীন এবং আমীর একটা কালভার্টের ওপরে গিয়ে বসলেন। রোদ মরে আসছে। আকাশের মেঘে মেঘে হলুদ, লাল, খয়েরি তুলির টান। ছোট্ট খাল। খালে পানি নেই। কচুরিপানা কাদামাটিতে বেগুনি রঙের ফুল ফুটিয়ে রেখেছে। কাটাগুল্মের আড়ালে একটা বেজি দুপায়ে দাঁড়িয়ে মাথা বাড়িয়ে আগন্তুকদের নিরীক্ষণ করছে।
মাহবুব আর তৌফিক তাজউদ্দীনের সামনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা পড়েছে দুই যুবকের চোখে-মুখে-চুলে।
তাজউদ্দীন বললেন, মাহবুব-তৌফিক, তোমরা বর্ডার পার হও। তোমরা স্বাধীন দেশের অফিসার। তোমাদের পাঠানো হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে। আমাদের স্বাধীন দেশের নেতা হিসেবে ওয়েলকাম জানাতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা ভারতে ঢুকব। তা না হলে জনগণের মধ্যে থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাব।
জি আচ্ছা স্যার। বললেন দুজনেই। সরকারি অফিসার হিসেবে স্যার বলাটা তাদের অভ্যাসের অংশ। আর ১ মার্চ থেকে দেশ যে ৩২ নম্বর থেকে পরিচালিত হয়েছে, আর আদেশগুলো যে তাজউদ্দীন লিখতেন, সেসব খবর তো এই দুজনের অজানা নয়।
তাঁরা দুজন ধীরে ধীরে সীমান্তের দিকে চলে গেলেন।
তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম অপেক্ষা করছেন।
সূর্য ডুবে গেল। আকাশে তবু আভা। তাদের শরীর ক্লান্ত। তারা দুজন দুই রেলিংয়ের ওপরে শুয়ে পড়লেন।
তাজউদ্দীনের মনে হলো :
কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যারবি
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।
.
মাহবুব আর তৌফিক হাঁটছেন। অন্ধকার নেমে আসছে। তারা যাচ্ছেন অচেনা বিওপির দিকে। নিজেদের পায়ের শব্দে নিজেরাই চমকে উঠছেন। হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল : হুকুমদার! (হু কামস দেয়ার!)।
মাহবুব বললেন, ফ্রেন্ডস!
হ্যান্ডস আপ!
দুজনেই হাত মাথার ওপরে তুললেন।
এগিয়ে এলেন এক নবীন বিএসএফ অফিসার। তিনি পরিচয় দিলেন, আই অ্যাম মহাপাত্র, বিএসএফ।
ক্যাপ্টেন মাহবুব, ক্যাপ্টেন তৌফিক। মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশ।
.
আকাশের আভা নিভে যাচ্ছে। তারা উঠছে। জোনাকির আলো জ্বলছে-নিভছে মাথার ওপরে।
কী হলো, তাজউদ্দীন ভাই, ওরা যে আর ফেরে না। আমীর বললেন।
তাজউদ্দীন বললেন, হয়তো ওরা কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হয়তো ওরা দিল্লিকে জানাচ্ছে।
প্রচণ্ড গরম। একটু একটু করে বসন্তের বাতাস বইতে শুরু করল। হঠাৎ ঝোঁপের ভেতর থেকে অন্ধকারের মধ্যে ধপধপ বুটের আওয়াজ।
ড্রাইভার ছুটে এল আগে আগে। বলল, একজন মেজর আসছেন।
