তাজউদ্দীন বললেন, সোহরাব সাহেবের বাড়িতে যাব। সোহরাব সাহেব কোথায়?
সোহরাব সাহেব তো বাড়ি নাই। তবে তার বাড়ি যাওয়ার পথেই তার দেখা আপনেরা পাবেন। চলেন আমি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি।
রিকশাও জোগাড় হয়ে গেল।
রাত তিনটায় তাঁরা পৌঁছালেন মাগুরায় সোহরাব হোসেনের বাড়ি। গোসল সারলেন। রাতের বেলা ভাত চড়ানো হলো চুলায়। খেতে বসলেন। চারটায়। ৩০ মার্চ ১৯৭১। ভোর হচ্ছে।
ঘণ্টা দুয়েক তারা একটুখানি ঘুমিয়ে নিলেন। সকাল সাতটার মধ্যে বেরিয়ে পড়লেন পথে। এইবার সোহরাব হোসেনের জোগাড় করা জিপে।
সোহরাব হোসেনই বললেন, মাগুরার এসডিও কামাল সিদ্দিকী খুব ভালো কাজ করছেন। ইপিআর, পুলিশ, আনসার, সবাইকে নিয়ে বাহিনী গড়ে তুলেছেন। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা সমন্বয় করছেন। ইনশা আল্লাহ জয় আমাদের হবেই।
গাড়ি মাগুরা-ঝিনাইদহ সদর রাস্তা দিয়ে না গিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা দিয়ে চলতে লাগল।
সকালবেলা রোদ উঠেছে। গ্রাম-গ্রামান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। সোহরাব আর আমীর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন।
তাজউদ্দীন চুপ করে আছেন। কী সুন্দর নীলাকাশ। কী সুন্দর সবুজ বিস্তৃত মাঠ। কলাইয়ের খেত। কোথাওবা চষা জমি। জল-জঙ্গল-বিল। হাঁস যাচ্ছে দল বেঁধে, সড়কের ওপর দিয়ে। একটা ছাগলের দড়ি ধরে টানছে একটা কিশোরী। গাড়ি দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। একপাল আধা ন্যাংটো ছেলে দৌড়ে আসছে জিপের পিছু পিছু। কলাগাছের ফাঁকে একটা বেগুনি শাড়ি পরা বধূ ঘোমটা বাড়িয়ে দিয়ে গাড়ির ধূলি ওড়ানো দেখছে।
তাজউদ্দীন ভাবছেন, রবীন্দ্রনাথের লিপিকায় পড়েছেন–
এই তো পায়ে চলার পথ।
এসেছে বনের মধ্যে দিয়ে মাঠে, মাঠের মধ্যে দিয়ে নদীর ধারে, খেয়াঘাটের পাশে বটগাছের তলায়। তার পরে ও পারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে; তার পরে তিসির ক্ষেতের ধার দিয়ে, আমবাগানের ছায়া দিয়ে, পদ্মদিঘির পাড় দিয়ে, রথতলার পাশ দিয়ে কোন্ গায়ে গিয়ে পৌচেছে জানিনে।
এই পথে কত মানুষ কেউ বা আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, কেউ বা সঙ্গ নিয়েছে, কাউকে বা দূর থেকে দেখা গেল; কারো বা ঘোমটা আছে, কারো বা নেই; কেউ বা জল ভরতে চলেছে, কেউ বা জল নিয়ে ফিরে এল।
২. এখন দিন গিয়েছে, অন্ধকার হয়ে আসে।
একদিন এই পথকে মনে হয়েছিল আমারই পথ, একান্তই আমার; এখন দেখছি কেবল একটিবার মাত্র এই পথ দিয়ে চলার হুকুম নিয়ে এসেছি, আর নয়।
নেবুতলা উজিয়ে সেই পুকুরপাড়, দ্বাদশ দেউলের ঘাট, নদীর চর, গোয়ালবাড়ি, ধানের গোলা পেরিয়ে সেই চেনা চাউনি, চেনা কথা, চেনা মুখের মহলে আর একটিবারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না, এই যে! এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।
তাজউদ্দীন ভাবছেন, এ যেন তাঁর শুধু চলার পথ না হয়, যেন তাঁর ফেরার পথও হয়। তা হতেই হবে। তা না হলে এই শাশ্বত বাংলা যে আর থাকবে না!
১০টা ৩০ মিনিটে গাড়ি গিয়ে থামল ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আজিজ সাহেবের বাড়ির প্রাঙ্গণে। তিনি এলাকার সংসদ সদস্যও। বাড়ির সেই ভোলাজুড়ে অনেক কবুতর। সাদা, কালো, বাদামি কবুতরগুলো গাড়ি দেখেও সাইড দিচ্ছিল না। শেষে নিতান্ত অনিচ্ছায় একটুখানি উড়ে একটুখানি সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।
আজিজ ছুটে এলেন। আসেন আসেন। এই দুর্দিনে কী সৌভাগ্য আমার। স্বয়ং তাজউদ্দীন ভাই। ব্যারিস্টার ভাই। আসেন আসেন।
আমীর বললেন, আমাদের আসল নাম বলবেন না কাউকে। ওনার নাম মোহাম্মদ আলী, আর আমার নাম রহমত আলী।
আজিজ সাহেব বললেন, জি আমীর ভাই জি, কাউকে নাম বলব না।
ঝিনাইদহের সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী। এই দুজনকে আজিজ সাহেব খবর পাঠালেন। তারা গাড়ি নিয়ে চলে এলেন।
মাহবুব বললেন, কী অবস্থা হয়েছে যে আপনাদের চেহারার। আমি তো চিনতেই পারছিলাম না।
আমীর বললেন, আপনি পুলিশ হয়ে না চিনলে চলবে? গ্রামে-গঞ্জে লোকেরা কিন্তু আমাদের ঠিকই চিনে ফেলেছে।
তাজউদ্দীন বললেন, কেউ না চিনুক, সেই রকম বেশ নিতেই তো চেয়েছি। কী অবস্থা এখানে বলেন।
তৌফিক-ই-ইলাহী মানুষটা ছোটখাটো। কিন্তু কথায় স্পষ্ট। কাজে নিখুঁত। তিনি পুরো পরিস্থিতির একটা ছবি তুলে ধরলেন।
বললেন, এখানে ইপিআরের মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। তিনি তাঁর পুরো বাহিনী নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। মাহবুব সাহেবের নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ, কুষ্টিয়ার পুলিশ, মেহেরপুরের পুলিশ, আনসার-সব আমাদের সঙ্গে।
মাহবুব বললেন, আজকেও কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ হচ্ছে। আমাদের বাহিনী হাজার হাজার মানুষ সঙ্গে নিয়ে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউস ঘেরাও করেছে। তবে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের পাকিস্তানিরা নিরস্ত্র করে। ২৮ মার্চ ঘুমন্ত বাঙালি সৈনিক আর তাদের পরিবার-পরিজন, নারী শিশু সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলে। ওদেরকে বলা হয়েছিল, আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে। ওরা বাইরেই ছিল। চৌগাছা ছিল। ওসমান সাহেব চিঠি দিয়েছিলেন। ওরা বোকার মতো ফিরে গিয়ে অস্ত্র জমা দেয়। তারপর সবাই মিলে মারা পড়ে। দুধের শিশু পর্যন্ত রক্ষা পায়নি।
কুষ্টিয়ার নেতা ডা. আসহাব-উল হক জোয়ারদার এলেন।
