এইবার জামালেরও চোখ মোছার পালা!
১৯
হাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশায় উঠেছিলেন তাজউদ্দীন ও আমীর। কিন্তু রিকশা বেশি দূর যেতে পারল না। পথে পথে ব্যারিকেড। রিকশা ছেড়ে হাঁটতে হচ্ছে।
বিপরীত দিক থেকে একটা জিপ আসছে। সবুজ রঙের জিপ। ভয়াবহ ব্যাপার! তাজউদ্দীন, আমীর-উল একটা গাছের আড়ালে নিজেদের আড়াল করলেন। জিপটাতে তো দেখা যাচ্ছে সাদাপোশাকের বেসামরিক লোকদেরই। তারা রাস্তায় উঠলেন। হাত নেড়ে ইশারা করলেন জিপ থামাতে।
জিপটা থামল। আমীর জিজ্ঞাসা করলেন ড্রাইভারকে, জিপে কে যাচ্ছেন?
এসডিও সাহেব। ড্রাইভার বলল।
পাশের আরোহী বললেন, আমি শাহ মোহাম্মদ ফরিদ। রাজবাড়ীর এসডিও।
আচ্ছা, কী খবর? কোত্থেকে আসছেন? আমীর বললেন।
শাহ মোহাম্মদ ফরিদ বললেন, আমি তো চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। খবর ভালো। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর–সবখানে প্রতিরোধসংগ্রাম খুব ভালোভাবে চলছে। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর মুক্ত হয়ে গেছে। এখন কুষ্টিয়া দখলের প্রস্তুতি চলছে।
আমীর বললেন, বর্ডারের দিকের কী খবর। বর্ডার পর্যন্ত যাওয়া যাবে?
যাবে স্যার। কোনো অসুবিধা নাই।
আচ্ছা আমরা তাহলে চলি। আমীর আর কথা বাড়ালেন না। প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।
জিপও চলে গেল। আমীর বললেন, তাজউদ্দীন ভাই, এসডিও মনে হয় আমাদের চিনতে পারে নাই।
তাজউদ্দীন বললেন, না চেনাই ভালো।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ আসার পর পাওয়া গেল একটা বাস। দুজনে বাসে উঠে বসলেন। যাক। খানিকটা তো বসা গেল। সেই বাসও বেশি দূর যেতে পারল না। রাস্তায় বিশাল বিশাল গাছ কেটে রাখা হয়েছে। সেই গাছ সরিয়ে এগোনোর সাধ্য কারও নেই।
তাঁরা দুজন বাস থেকে নামলেন। গাছের ব্যারিকেডের ওপরে উঠলেন। পায়ের ফোঁসকা কষ্ট দিচ্ছে। কী আর করা! হাঁটা অব্যাহত রইল।
.
এভাবে হেঁটে রিকশায়-বাসে চড়ে আবার হেঁটে দুজন এসে পৌঁছেছেন মধুমতী নদীর পারে। ততক্ষণে আকাশ কালো হয়ে গেছে। যেকোনো সময় ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। সন্ধ্যাও নেমে আসছে দ্রুত। কামারখালী ঘাটে একটা দোকানে। রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র চলছে। ঘোষণা আসছে : আপনারা সাবধান থাকুন। পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডোরা বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে আছে। তারা আক্রমণ করতে পারে।
নৌকা দরকার। নদী পার হতে হবে। ঘাটে নৌকা বাঁধা। কিন্তু কোনো মাঝি রাজি হয় না। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। আমীর ভিজছেন। তাজউদ্দীন ভিজছেন। এই পারে থাকা মানে মূল্যবান সময়ের অপচয়। আজকের রাতটা তাঁরা পথ চলতে চান। যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে যেতে হবে। তাজউদ্দীন ভাবছেন, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারে নানা ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কে দিচ্ছে, কে জানে। সমন্বয় দরকার। তা না হলে দেখা যাবে, চার জায়গায় চারটা সরকার। চার রকমের ঘোষণা।
একজন বলল, আপনেরা ওই বুড়া মিয়াকে ধরেন। ওনার বাড়ি ওই পারে। ওনাকে তো বাড়ি যেতেই হবে। ধরেন ওনাকে।
আমীর এগিয়ে গেলেন, চাচা! আপনার বাড়ি নদীর ওই পারে?
জি বাবা।
আমারও বাড়ি নদীর ওই পারে। চলেন, আল্লাহর নামে চলে যাই। শুধু। তো বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড় তো আর হচ্ছে না।
যাবেন। ভরসা পান?
জি চাচা চলেন। নদীর পানি তো শান্ত আছে। ঢেউ তো নাই।
আচ্ছা চলেন, আল্লাহর নামে পাড়ি দেই।
তারা উঠলেন নৌকায়। মাঝনদীতে বৃষ্টি থেমে গেল। তবে ঘনঘোর অন্ধকার। শুধু নদীর কল্লোল আর বইঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে। ওই পারে ঘাটে আলো আছে। সেই আলো অভিমুখে চলছে এই নৌকা। একসময় নৌকা ঘাটে এসে পৌঁছাল। মাঝির হাতে পাড়ানির টাকা তুলে দিয়ে দুজন ঘাটে নামলেন।
নদীর পশ্চিম পারে আরও কিছুসংখ্যক মানুষ যানবাহনের খোঁজ করছে। এখান থেকে মাগুরা শহর প্রায় আট মাইল দূরে। কোনো যানবাহন নেই। ২৫-৩০ জন মানুষ একসঙ্গে রওনা হলেন। আমীর আর তাজউদ্দীনও হাঁটছেন। সেই কাফেলা ধরে।
বৃষ্টিতে রাস্তার অবস্থা খারাপ। এখানে-ওখানে কাদা। হাঁটতে হাঁটতে আমীর আর তাজউদ্দীনের ভেজা কাপড় শরীরেই শুকাল।
সামনে ছোট্ট একটা খাল। খালের ওপরে আগুন জ্বলছে। কী ব্যাপার? একটা কাঠের সেতু ছিল। প্রতিরোধকামী জনতা সেটাতে আগুন দিয়েছে, যাতে ঢাকা বা ফরিদপুর থেকে পাকিস্তানি সৈন্য এসে পৌঁছাতে না পারে। সংগ্রাম পরিষদের ছেলেরা খাল পাহারা দিচ্ছে। এই ২৫-৩০ জনের দলের প্রত্যেককে তারা দেহতল্লাশি করল।
তাজউদ্দীন আহমদের পাঞ্জাবির ভেতরে বুকের কাছে এক গোপন পকেটে পাওয়া গেল পিস্তল।
সেটাতে হাত দিয়েই আওয়ামী লীগের কর্মী টর্চলাইটের আলো ধরলেন তাজউদ্দীনের মুখের দিকে। ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন তার মুখটাকে। তিন দিনের না কামানো দাড়ি। পরনে লুঙ্গি। লোকটা কে? তাঁর বুকপকেটে পিস্তল কেন? একমুহূর্ত নিলেন তিনি ভাবতে, তারপর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন, লিডার। আপনাকে চিনতে পারছি। আপনি তাজুদ্দীন ভাই। ভাই, আমি ওয়াহেদ।
ওয়াহেদ, বেশি আওয়াজ দিয়ো না। চুপচাপ আমাদের ওই পারে নিয়ে চলো। আমাদের পরিচয় কারও কাছে প্রকাশ কোরো না।
নৌকা লাগানো হলো ঘাটে। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। নৌকা চলতে আরম্ভ করল। ওপাশ থেকে চিৎকার : কে আসে?
বন্ধু।
ঠিক আছে, আসো।
ওই পারে দেখা গেল, রীতিমতো মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। বন্দুক কাঁধে ছেলেরা পাহারা দিচ্ছে। আনসার বাহিনীর সদস্যরা আছে।
