রেনু বিদায় নিলেন খোকার শাশুড়িদের কাছ থেকে, মাওইমা, আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করলেন। আসি মাওইমা। ভালো থাকবেন। রেনু, জামাল, রাসেল, রেহানা গাড়িতে গিয়ে বসলেন। গাড়ি চলছে। ততক্ষণে রোদ মরে এসেছে, বিকেল হয়ে গেছে। মালিবাগ পৌঁছাতে পৌঁছাতে রোদ সিঁদুরে আমের মতো লাল হয়ে এল।
মালিবাগ তখন অজপাড়াগা। বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই কোত্থেকে ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষ এসে ভিড় করল। গাড়ি ঘিরে দাঁড়াল। ঢাকা শহরে তো গাড়ির সংখ্যা এমনিতেই কম। তার মধ্যে এই জলো-জংলা জায়গা। এখানকার মানুষ কি এর আগে গাড়ি দেখেনি নাকি?
এখন এর মধ্যে তারা গাড়ি থেকে নামবেন কী করে? নামার সঙ্গে সঙ্গে লোকে চিনে ফেলবে যে বেগম মুজিব নামলেন। তারা দেখে ফেলবে তারা কোন বাসায় উঠলেন। জানাজানি হয়ে যাবে। মিলিটারি চলে আসবে। এ তো এক ভয়াবহ ব্যাপার হলো।
এদিকে সন্ধ্যা তার কালো মশারি নামিয়ে ফেলছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। একটু পরে শুরু হয়ে যাবে কারফিউ। তখন তো গাড়ি নিয়েও চলা যাবে না। এখন? ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
রেনু বললেন, ভাইডি। আগে গাড়ি এখান থেকে নড়াও।
খোকা গাড়ির ব্রেক থেকে পা সরালেন। গিয়ারে হাত দিয়ে গিয়ার বদলে বাঁ পায়ে ক্লাচ চেপে ধরে ডান পা রাখলেন অ্যাক্সিলারেটরে। গাড়ি চলতে শুরু করল।
অন্ধকার নেমে এসেছে। গাড়ির হেডলাইট জ্বালাতে হলো। বড় রাস্তায় ওঠা মানেই বিপদ। বড় রাস্তায় কারফিউ।
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার রাস্তায় গাড়ি চলছে। ফাঁকা ফাঁকা ঘরবাড়ি। প্লটে প্লটে বড় বড় ঘাস। কাশবন। রাস্তায় কোনো লোক নেই। লোকজন থাকার প্রশ্নও আসে না। কারফিউ।
এর মধ্যে বিপরীত দিক থেকে হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা গাড়ি আসছে দেখা গেল। রেহানা বললেন, চাচা, ওইটা মিলিটারির গাড়ি না তো।
রেনু বললেন, খোকা, গাড়ি গলির মধ্যে ঢোকা।
খোকা সামনে ডানে-বাঁয়ে আর কোনো গলি দেখেন না। বাঁয়ে একটা পলেস্তারা খসা দোতলা বাড়ি। বড় বাউন্ডারি। গেট খোলা। একমাত্র উপায় এই বাউন্ডারির ভেতরে গাড়ি ঢুকিয়ে দেওয়া। তা-ই করলেন তিনি। অচেনা অজানা একটা বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে হেডলাইট নিভিয়ে দিলেন। হেঁটে এসে পেছনের গেটটা দিলেন বন্ধ করে।
রেনু বললেন, কেউ যদি আপত্তি না করে, তাইলে আমরা রাতটা গাড়িতেই কাটায়ে দিব খোকা। তুই ভাইডি একদম চিন্তা করবি নে।
খোকা বললেন, আমি একটু দেখি, মনে হচ্ছে ঘরবাড়ি ফাঁকা। মানুষজন
থাকলে ঘরের ভেতরেই থাকা যাবে। দেখে আসি।
খোকা পোড়ো বাড়িটার নিচতলায় উঠলেন। এ ঘর ফাঁকা। ও ঘর ফাঁকা। অন্ধকারে ফাঁকা ঘরগুলোয় মনে হচ্ছে অশরীরী ছায়া পাখা বিস্তার করে আছে। নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠছেন খোকা।
দোতলাও মনে হচ্ছে ফাঁকা। তবে একটু যেন প্রাণের সাড়া, একটুখানি নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে। আচ্ছা, উঠেই দেখি না দোতলাটা। একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলেন। একটা ঘরে কেউ নেই। আরেকটা ঘরে মনে হচ্ছে মানুষ আছে। একটুখানি আলোও জ্বলছে। তিনি দরজায় নক করলেন। তারপর ভেতরে কেউ আছেন বলে কপাট ঠেললেন।
ও মা এ কী? এ-ও কি সম্ভব?
মামা! আপনি! বলে ছুটে আসছেন পলি। বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের মেয়ে। পাশেই দেখা গেল তার স্বামী ওদুদকে।
খোকা নিচে গেলেন। বললেন, ভাবি আসেন। ওপরে পলি আছে। ওদুদ আছে। চলেন চলেন।
বলিস কী? রেনু ওপরে উঠলেন। মামিকে পেয়ে পলি জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। দুই নারী কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। দুজনের অশ্রুধারা একধারায় বইতে লাগল।
পলিরা এই বাড়িতে আজই উঠেছেন। আসবাব নেই। বাসনকোসনও নেই। আজকের রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে কাল তারা বাজারসদাই করবেন। চাদর বিছিয়ে কোনোরকমে আছেন। তবে তার শ্বশুর-শাশুড়ি দুজন। এই বাড়িতে থাকেন। কাজেই তেমন অসুবিধা হবে না।
বাড়িতে খাবার নেই। রাসেলের মুখটা এরই মধ্যে শুকিয়ে গেছে।
পলি বললেন, মামি, এই ছিল আমাদের কপালে। ফাঁকা বাড়িতে আপনাদের তুলতে হলো! এই বাড়িতে তো আমরা থাকি না। আমরা ভয়ে এই বাড়িতে এসে উঠেছি।
রেনু বললেন, আমাদের আর কী কষ্ট! ভেবে দ্যাখ, তোর মামা কোথায় আছে, কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না, আমরা তো কিছুই জানি না। সে কী খাচ্ছে, কোথায় ঘুমাচ্ছে। আল্লাহর কাছে চাই শুধু মানুষটা যেন বেঁচে থাকে!
পলি বলল, ঠিক কথা মামি। আল্লাহর কাছে সেই দোয়াই করি। মাকে কাঁদতে দেখে কাঁদছেন রেহানা। কাঁদতে লাগল রাসেলও। জামাল তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, চলো রাসেল, ওই দেখো নিচে থোকা চাচার গাড়ি!
রাসেল কোল থেকে নামতে চাইছে। সে বড় হয়ে গেছে। সে জানে, একটা বড় ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একজন বড় মানুষ হিসেবেই সে এই ঝড়টাকে সামলাতে চাইছে। মা কাঁদছেন বলেই তারও কান্না পাচ্ছে। আর আব্বার কথা উঠল যে! আব্বা এখন কোথায় আছে? বেঁচে আছে কি না! সেই ভয়াবহ রাতে গুলির শব্দের মধ্যে আগুন, আলো, ভয়ের মধ্যে আব্বা তো তাকেই দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। তারপর আব্বাকে ধরে নিয়ে গেল। কত কান্নাকাটি, কত আগুন, কত গোলাগুলি, কত রক্ত, কত এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলা।
রাসেল বলল, জামাল ভাই, আব্বা কোথায়? চলো না আব্বাকে খুঁজতে যাই!
