ঠিক ঠিক। কিসিঞ্জার বললেন।
ঠিক ঠিক বলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিসিঞ্জার জানেন। রুল নম্বর ওয়ান : দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট। রুল নম্বর টু : ইফ দ্য বস ইজ রং, সি রুল নম্বর ওয়ান।
২৬ মার্চ বিকেলে কিসিঞ্জার বসেছিলেন ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ নিয়ে। বিষয় পূর্ব পাকিস্তান। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্তা ভ্যান হেলেন বলেছিলেন, মিলিটারি দেশটার ভাগ হওয়া বন্ধ করতে একটা চেষ্টা নেবেই, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা শেষ পর্যন্ত তাদের কম্মো নয়।
তখন কিসিঞ্জার বলেছিলেন, আমি তো আজ সকালেও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলেছি, তিনি কিছুই না করবার পক্ষে। তিনি এমন একটা অবস্থান না নেওয়ার পক্ষে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাকে পাকিস্তান ভাঙার কাজে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারে। তিনি কোনো অ্যাকটিভ পলিসির পক্ষে না। এর মানে এই যে যুদ্ধ করতে আমরা ইয়াহিয়াকে নিষেধ করব না। তার এই কথায় পুরো গ্রুপ সায় দিয়েছে। মাথা নেড়েছে। মাথা তাদের নাড়তেই হবে। দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।
.
আমেরিকান দুই কূটনীতিক–ঢাকা থেকে আর্চার ব্লাড এবং দিল্লি থেকে রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং-ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠাচ্ছেন বাংলাদেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে। নির্বাচিত গণহত্যা (সিলেকটিভ জেনোসাইড) কথাটা তাঁরা ব্যবহার করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হত্যা করা হয়েছে, ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে। এই খবরও পেয়েছেন কিসিঞ্জার। তিনি সিআইএর একজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কি অধ্যাপক রাজ্জাককেও হত্যা করেছে?
মনে হয়। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককেই হত্যা করেছে।
এবার কিসিঞ্জার চুপ করে গেলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পরিচিত মুখটাকে, যার নাম রাজ্জাক। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তিনি স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
১৮
মমিনুল হক খোকা গাড়ি চালাচ্ছেন। পাশে জামাল। পেছনে রেনু, রেহানা, জেলি। গাড়ির মেঝেতে রাসেল। রেনু বড় করে ঘোমটা দিয়ে রেখেছেন, যেন কেউ চিনতে না পারে। গাড়ি চলেছে মগবাজার থেকে ওয়ারীর দিকে। ওয়ারী বলধা গার্ডেনের পাশে বাবু ভিলা। খোকার শ্বশুরবাড়ি। সেখানেই থাকবেন। বেগম মুজিব এবং তাঁর সন্তানেরা।
গাড়ি চলছে। দুই ধারে ধ্বংসযজ্ঞ। রাস্তার ধারে লাশ পড়ে আছে। কুকুর আর কাক লাশ নিয়ে টানাটানি করছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন একটা। পোড়া বস্তি।
ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো আগুন পুরোপুরি নেভেনি। নিউজপ্রিন্টের স্তূপ থেকে এখনো আগুনের শিখা এবং ধোঁয়া বের। হচ্ছে। বাতাসে ছাই উড়ছে। দেখে শিউরে উঠলেন রেনু। মানিক মিয়ার ইত্তেফাক। হাসুর আব্বার সবচেয়ে বড় সমর্থক। বাঙালির অধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় কণ্ঠস্বর। কত প্রিয় পরিচিতজনই তো ইত্তেফাক-এ কাজ করেন। ২৫ মার্চ রাতেও তো কাজ করছিলেন। তারা কি বেঁচে আছেন?
বাবু ভিলার সামনে গাড়ি দাঁড়াল। গাছপালাঢাকা এক সুন্দর বাড়ি। আরোহীরা গাড়ি থেকে নামলেন।
গাড়ির শব্দ শুনে বেরিয়ে এলেন খোকার শাশুড়ি। খোকার শ্যালকেরা। তারা বেগম মুজিবকে পেয়ে আত্মহারা হয়ে পড়লেন। কী করবেন, কোথায় রাখবেন, কী খাওয়াবেন, কী করলে তাদের যোগ্য সমাদর হবে, এই নিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। খোকার শাশুড়ি বললেন রেনুকে, মা, তুমি একদম দুশ্চিন্তা করবে না। নিশ্চিন্ত মনে এখানে থাকবে। আমরা তোমাদের। কোনো অযত্ন হতে দেব না। আর আমার ছেলেগুলোকে দেখেছ। সব তো। পাহাড়ি সাইজ। ওরা লাঠি হাতে পালা করে পাহারা দেবে। কেউ তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
তারা দিনে এই বাড়িতে থাকবেন। রাতে তাদের রাখা হবে পেছনের একটা ফাঁকা বাড়িতে। পেছনের বাড়িতে যেতে হলে দেয়াল টপকাতে হবে। মইয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
খোকার শাশুড়ি বললেন, অসম্ভব। বউমাকে কিছুতেই আমি দেয়াল। টপকাতে দেব না। পাঁচিল ভাঙো।
মিস্ত্রি ডেকে দুই বাড়ির মধ্যকার দেয়াল ভেঙে রাস্তা বানানো হলো।
কিন্তু পাড়াপড়শিরা জেনে গেলেন যে শেখ মুজিবের পরিবার এই বাড়িতে থাকেন। তারা যেমন নিজেদের জন্য ভয় পেতে লাগলেন, তেমনি বেগম মুজিবও এই বাড়িতে থাকাটা নিরাপদ বলে মনে করলেন না। তিনি খোকাকে বললেন, বাড়ি খোজো। এই বাড়ি তো আমার শেষ আশ্রয় হিসেবে থাকলই। আপাতত অন্য কোথাও যাই।
খোকা চেনেন তাঁর ভাবিকে। ভাবি যখন বলেছেন, তখন তাঁর কথা শুনতেই হবে। বাসা একটা দেখতেই হবে। বিশেষ করে পড়শিদের চোখে মুখে ভয়, এটা খোকার শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য যে বিব্রতকর, ভাবি তা অনুভব করতে পারছেন। তাঁর জন্য আরেকটা ফ্যামিলি কথা শুনুক, এটা তিনি হতে দেবেনই না। রেনু বললেন, খোকা, হাসুর কাছাকাছি থাকতে হবে। মালিবাগের দিকে চল।
খোকা একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে গেলেন মালিবাগের দিকে। বহু বাড়িতে টু-লেট দেখা ঝুলছে। ট্যাক্সি থেকে নেমে নেমে বাড়ি দেখলেন। একটা বাসা বেশ পছন্দ হওয়ারই মতো। বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বললেন খোকা। ভাড়া কত, শর্ত কী কী, সব পাকা হলো।
খোকা খুশি। এই রকম একটা বাড়ি হলে কথাই নেই। এখানে হাসুদেরও এনে রাখা যাবে। যে বেবিট্যাক্সি নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা নিয়েই ফিরে এলেন ওয়ারীতে।
