আমীর-উল কইলেন, ভালো। আমগো মিলিটারি বিদ্রোহ করছে। এইটা বড়ই আশার সংবাদ।
তাজউদ্দীন কইলেন, হ। আশার সংবাদ। তয় হে আবার পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে ক্যান। কইল তো মুজিব ভাইয়ের নেতৃত্বে সরকার হইছে। অহন না আবার সরকার বানায় ফেলে। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ আর তার নেতৃত্বে আস্থা রাখে। সামরিক সরকারের ওপরে না। পৃথিবীর মানুষও মুজিব ভাইরে ইলেকটেড প্রতিনিধি হিসেবে জানে, জনগণের নেতা হিসেবে জানে। মিলিটারিগো না।
ব্যাঙ্গমা বলে, তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থাইকা নোট নিয়া রাখছিলেন আজিজ আহমেদ বাগমার। সেই নোট থাইকা তিনি লেখা বানাইছিলেন। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সেইটা দৈনিক আজকের কাগজ-এ প্রকাশিত হইছে।
ব্যাঙ্গমি বলে, বাগমারের লেখা স্বাধীনতার স্বপ্ন : উন্মেষ আর অর্জন বইতেও তাজউদ্দীনের জবানিতে এই কথা লেখা হইছে।
.
তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ভাবি, বেশি কিছু করতে যাবেন না। শুধু ডাল আর ভাত। এই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
তাজউদ্দীন এটা বলেছিলেন, যাতে হাসি ভাবির কষ্ট কম হয়, তিনি যেন বাড়তি কিছু আয়োজনের চেষ্টা করতে ব্যস্ত হয়ে না পড়েন। কিন্তু ফল হলো উল্টো। হাঁড়িতে ভাত রান্না করা ছিলই, সে ভাত গরমই, কেবল চুলা থেকে নামানো হয়েছে। সে যুগে সবাই বেশি করে ভাত রাঁধতেন, ভাত বেঁচে গেলে পান্তা করা যায়, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিকেও খাওয়ানো যায় কিন্তু কেউ না কেউ হুট করে এসেই পড়ে, ভাত মেপে রাধলে তখন অসুবিধা হয়। কাজেই গরম ভাত রেডি, কিন্তু ডাল তো আজ রাধা হয়নি। হাসি তাই তাজউদ্দীন আর আমীরকে বললেন, আপনারা খেতে বসেন। হাত-মুখ ধুয়ে নেন। বাড়ির কাজের লোক পানি তুলে দিয়েছে। মেহমানরা হাতমুখ ধুচ্ছেন বারান্দাতেই, পানি গড়িয়ে পড়ছে উঠানে। এই সুযোগে হাসি চুলায় ডাল চড়িয়ে দিলেন। কতক্ষণ আর লাগবে।
তাঁরা দুজন হাতমুখ ধোয়া শেষ করে গামছা দিয়ে হাতমুখ মুছে আস্তেধীরে এসে বারান্দায় মাদুরে বসলেন খেতে। চুলায় ডাল সেদ্ধ হচ্ছে, পাটখড়ি বেশি করে চুলার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে পাশের বাড়ি থেকে আসা শেফালির মাকে সেটা দেখতে বলে হাসি ভাত বাড়লেন। আলমারি থেকে কাঁচের প্লেট বের করে মাদুরে রাখলেন। ছোট মাছ, লাউ দিয়ে টাকি মাছ করাই ছিল। চটপট আরেকটা চুলায় দুটো ডিমও ভাজা হয়ে গেল। এখন ডালটুকু হলেই হয়।
হাসি মাথায় নীল রঙের শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটাটা বড় করে নিয়ে বললেন, আপনারা খেতে বসেন। আস্তে আস্তে খান। ডাল হতে কতক্ষণ। সিদ্ধ হলেই বাগার দিয়ে দিব।
এর মধ্যে ফরিদপুরের কর্মীরা উঁকি দিতে শুরু করেছে। কেউ একজন ছুটে এল। তার শরীর ঘর্মাক্ত, মুখে রাজ্যের উদ্বেগ, সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মিলিটারি আসতেছে। মিলিটারি।
তাজউদ্দীন ঠান্ডা মাথায় আরেক লোকমা ভাত মুখে পুরে মাছের টুকরার কাটা বাছতে বাছতে বললেন, মিলিটারি আসুক আর না আসুক, আমি ডাল ভাত খেয়েই যাব।
ভাত খাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু ডালটা তখনো সেদ্ধ হয়নি। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে। খড়ি সব ভেজা। শেফালির মা বাঁশের চোঙা দিয়ে ফুঁ দিতে দিতে চোখ লাল করে ফেলেছেন।
ডাল চুলাতেই রইল।
তাজউদ্দীন আর আমীর আবার যাত্রা শুরু করলেন।
১৭
ব্যাঙ্গমা বলে, পুরো বাংলায় যখন জাহান্নামের আগুন, পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচার গণহত্যা চালায়া যাইতাছে আর বাঙালিরা চেষ্টা করতাছে প্রতিরোধ গইড়া তুলতে, যার যা কিছু আছে তাই লইয়াই, তখন কী করতাছেন আমেরিকার সাহেবেরা? কী করতাছেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর কিসিঞ্জার!
ব্যাঙ্গমি বলে, হ, চলো, এটু হোয়াইট হাউস ঘুইরা আহি।
.
হোয়াইট হাউসে বসে প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা গল্পগুজব করেন। বিষয় : পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর অভিযান।
মার্চের ২৯, ১৯৭১। কিসিঞ্জার বলেন, মনে হচ্ছে, ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।
গুড। নিক্সন মাথা নাড়েন।
অনেক সময় শক্তি প্রয়োগে কাজ হয়। বিরূপ পরিস্থিতিতে কাজ হয়। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ৩০ হাজারকে দিয়ে সাড়ে সাত কোটিকে কন্ট্রোল করা যায় না। হয়তো ভবিষ্যতে কথাটা ঠিক বলে প্রমাণিত হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবকিছু ঠান্ডা মেরে গেছে। কিসিঞ্জার বলেন।
নিক্সন বলেন, হয়তো এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। কিন্তু ইতিহাসে অনেক জাতির বেলাতেই দেখা গেছে ৩০ হাজার প্রশিক্ষিত মানুষ সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দমাতে পেরেছে। স্প্যানিশদের দেখুন, তারা কজন মাত্র এল আর ইনকাদের দখল করে ফেলল। ব্রিটিশরাও অল্প কজনই গেছে ভারতে এবং ভারতকে দখল করেছে।
একদম ঠিক। কিসিঞ্জার বললেন। নিক্সন বললেন, যা-ই হোক। আমি ইয়াহিয়ার ভালো চাই। তার মানে। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার চেয়ে না ভাঙা ভালো। তবে আসল কথা হলো, তারা কি এই ঈশ্বরবর্জিত দেশটাকে আসলেই চালাতে পারবে।
কিসিঞ্জার বললেন, তা অবশ্য ঠিক। ইতিহাসে দেখা গেছে, বাঙালিদের শাসন করা সব সময়ই কঠিন।
তারা তাদের কর্তব্য ঠিক করেন। আমরা কিছু করব না। প্রেসিডেন্ট বলেন, বায়াফ্রায় যেমন আমরা কিছুই করিনি, ঠিক সে রকম এবারও আমরা কিছুই করব না। যেমন আমরা বায়াফ্রার ক্ষুধার্ত মানুষকে গুলি করা পছন্দ করি নাই। তবু কিছুই করি নাই।
