বাড়ির দাওয়ায় একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসলেন তাজউদ্দীন।
বাড়িতে দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। হাতলওয়ালা সেগুন কাঠের চেয়ার এল। কাঁসার বদনায় পানি। ধোয়া গামছা।
একটু একটু করে ভিড় হচ্ছে। এর মধ্যে হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল রুস্তমের সঙ্গে।
তাজউদ্দীনই চিনতে পারলেন আগে, আরে রুস্তম, তুমি!
আপনে আসছেন শুইনা চইলা আসলাম।
রুস্তম বাবুবাজারের পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল।
সে বলল, স্যার। কী কমু স্যার। হায়াত আছে বইলা আমি বাইচা পলায়া আসছি। আমগো ফড়ির আর কেউ বাইচা নাই স্যার।
কী বলো?
২৫ তারিখ রাইতে স্যার আমরা ফাঁড়িতে ঘুমায়া আছিলাম। লুঙ্গি পইরা। খালি গাও। যে গরম! এর মধ্যে কোথাইকা আজরাইলের মতন মিলিটারি আসল। দরজা ভাইঙ্গা ঢুইকাই স্ট্রেট ব্রাশফায়ার। মেশিনগানের গুলিতে সক্কলে ওই বিছানাতেই মইরা শ্যাষ। ফাড়ির ডিউটিতে যারা আছিল, তারা ইউনিফর্ম লইয়াই কেউ টেবিলে উপুড় হইয়া পইড়া মইরা আছে, কেউ মাটিত মইরা পইড়া আছে। একজন তো থানার মধ্যে ওয়ালের সাথে গুলিতে গাইথা আছে। আমি মরার ভান কইরা পইড়া থাকলাম। রক্ত আমার উপর দিয়া ভাইসা যাইতে লাগল। মানুষের রক্ত স্যার সেই রকম গরম! মিলিটারি চইলা গেলে কোনোরকমে উইঠা নদীতে ঝাঁপায়া পড়লাম। সাঁতরায়া নদী পার হইয়া বাইচা আইছি।
তাজউদ্দীন স্তব্ধ। তাজউদ্দীন মর্মাহত। এটা কোন ধরনের আচরণ? এটা কোন ধরনের পাশবিকতা? হিটলার কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর এই রকম নিষ্ঠুরতার বুলডোজার চালাতে পেরেছিল?
আমীরকে নিয়ে সিরাজের মোটরসাইকেল এসে গেল শব্দ আর ধুলো ছড়াতে ছড়াতে।
তাজউদ্দীন বললেন, ব্যারিস্টার সাহেব। রুস্তমের কাছ থেকে শুনুন তার বেঁচে ফিরে আসার কাহিনি। এইভাবে কেউ ঘুমন্ত মানুষকে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলতে পারে?
.
বিকেল নেমে আসছে। বাড়ির পাশে একটা সুন্দর পুকুর। টলটল করছে জল। কতগুলো হাঁস পানিতে সারবদ্ধভাবে সাঁতার কাটছে। পানি দেখে তাজউদ্দীন আর স্থির থাকতে পারলেন না। বললেন, আমি গোসল করব।
মতিউর সাহেব বললেন, আমি ধোয়া লুঙ্গি আইনা দিতাছি। আপনে নামেন পুকুরে।
তাজউদ্দীন পুকুরের শীতল জলে ডুব দিয়ে নিজের ক্লান্তি, উদ্বেগ, রাগ, ক্ষোভ, হতাশা ধুয়ে ফেলতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু মানবতার এই অবমাননার অবসান ঘটবে কী করে? এই অপমানের এই লাঞ্ছনার শোধ নেওয়া যাবে কীভাবে?
আমীর গোসল সারলেন তোলা পানিতে। হারিকেনের আলোয় রাতের খাওয়া সেরে তাঁরা পাটখড়ির বেড়ার ঘরে বড় চকিতে চাদর পেতে শুয়ে পড়লেন।
ভোরবেলা আলো ফোঁটার আগেই বাইরে মোটরবাইকের শব্দ পাওয়া গেল। আবদুল আজিজ মণ্ডল মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন। এই মোটরসাইকেলটার পাওয়ার বেশি। এটাতে একসঙ্গে তিনজন ওঠা যাবে। ভোরের বাতাস চিরে মোটরসাইকেলে চলতে গিয়ে চোখেমুখে বাতাসের স্পর্শ অনুভব করলেন তাজউদ্দীন। বোধ হয় কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। ক্যালেন্ডারে দিনটা ২৮ মার্চ ১৯৭১।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, মোটরসাইকেল দুইজনরে লইয়া গেল দোহারের এমপিএ সুবেদ আলী টিপুর বাড়ি।
ব্যাঙ্গমি বলে, তারপর আবার মোটরসাইকেলে উইঠা তাঁরা গেলেন জয়পাড়া। আশরাফ আলী চৌধুরীর দোতলা কাঠের বাড়িতে খানিকক্ষণ জিরাইলেন। গরুর গরম দুধ খাইলেন। স্কুলের পিয়ন মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ায়া তাগো লয়া গেলেন পদ্মা নদীর পাড়।
ব্যাঙ্গমা বলে, যখন তারা নদীর তীরে আইলেন, তখন আকাশ ঘন কালো। জোরে বাতাস বইতাছে। বিকেলেই সাঁঝবেলা হইয়া আইল। শুরু হইল বাতাসের দাপাদাপি।
এ মাঝি যাইবা নাকি?
কুনো মাঝি রাজি হয় না।
শেষে তারা উঠলেন একটা তাঁতি পরিবারে। শুকুর মিয়ার বাড়িতে রাতে থাকলেন দুইজন। টিউবওয়েলের পানিতে গোসল সারলেন।
২৯ মার্চ আবার সকাল সকাল হেরা দুইজন ঘাটে গিয়া হাজির। এইবার শক্তপোক্ত নৌকা বাইছা লওয়া হইল। মাঝি আল্লাহর নামে উত্তাল পদ্মার বুক চিইড়া নৌকা ছাড়ল। বইঠা বায়। পাল উড়ায়। হাল ধইরা থাকে। নৌকা ধীরে ধীরে আউগায়। যেইখানে ঢেউ বেশি সেইখানে দোল খায়। যেইখানে পাক বেশি সেইখানে মাঝি শক্ত কইরা হাল ধইরা থাকে। নদীর পানিতে সকালবেলার আলো পইড়া সদ্য ধার দেওয়া ছুরির মতন ঝলকানি ওঠে। তিন। ঘণ্টা পর নৌকা নদীর পশ্চিম পাড়ে নাড়ারটেক ঘাটে ভিড়ে।
ঘাটে নাইমা তারা আওয়ামী লীগ কর্মী গো দেখা পাইলেন।
তারা জানাইল মিলিটারি অহনও ফরিদপুর আহে নাই। তয় আইতে কতক্ষণ। আর যদি আহে, এই ঘাট দিয়াই আইব।
তাড়াতাড়ি ফরিদপুর শহর চইলা যান। কর্মীরা পরামর্শ দিল।
তয় যাওনের কোনো উপায় নাই। একমাত্র উপায় হইল ঘোড়ায় চইড়া যাওয়া।
তখন আমীর একখান আর তাজউদ্দীন আর একখান ঘোড়ায় উঠলেন। তাগো দড়ি ধইরা ছুটতে লাগল দুইজন।
শহরের কাছাকাছি গিয়া দেখা গেল রিকশা আছে। ঘোড়া ছাইড়া তারা রিকশায় উঠলেন।
গেলেন আওয়ামী লীগ কর্মী ইমামউদ্দীন আহমদের বাড়ি। তিনি আছিলেন না। তার স্ত্রী হাসি তাগো দুপুরের খাওয়া খাইতে বসাইলেন। বাড়িতে রেডিও আছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনা যাইতে লাগল। তাজউদ্দীন শুনলেন, আমীর-উল শুনলেন, মেজর জিয়া কইতাছেন, মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হইল। বিশ্ববাসী সাহায্য করেন। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হইল সবার লগে বন্ধুত্ব, কারও লগে শত্রুতা নয়।
