ততক্ষণে তাদের জন্য দুই জোড়া স্যান্ডেল শু এসে গেছে। পায়ে চমৎকার জুতে গেল। পায়ে ব্যথাও লাগছে না, আবার মনে হচ্ছে, সহজে ছিঁড়বে না।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, তাজউদ্দীন সেই স্যান্ডেল ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশেও পরতেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, জয় বাংলার জুতা তো। সহজে ছিঁড়ে না।
এবার সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন তারা। একজন মাত্র কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীন আর আমীর গেলেন খেয়াঘাটে। ছোট্ট একটা নদী। কিন্তু নদী তো। পার হওয়া যাবে কী করে? শত শত মানুষ নদী পার হয়ে যাচ্ছে। ঘাটে অপেক্ষা করছে অনেকে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী রেজার চাচা নৌকা নিয়ে এলেন ঘাটে। সেটাতে রেজা তুলে দিল তাজউদ্দীন আর আমীরকে। আরও লোকজন উঠল। নৌকা চলছে। আকাশে একখণ্ড কালো মেঘ বড় আকার নিচ্ছে। তবে সূর্যও প্রখর। মনে হয় ঝড়বৃষ্টি হবে। তাজউদ্দীন একবার নদীর দিকে, একবার আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর তাকালেন তীরের মানুষগুলোর মুখে। তাকালেন তাঁদের সঙ্গে নৌকায় ওঠা নারী-পুরুষ, শিশুদের দিকে। গরিব মানুষ। পুষ্টিহীন মানুষ। ভাঙাচোরা মুখ। তাদের সম্পদ বলতেও কিছু নেই। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে কাপড়ের পোঁটলা। হাঁড়িকুড়ি। হাঁস-মুরগি। একজনের কোলে একটা ছাগল। এই মানুষগুলো দুই দিন ধরে ছিল আর্মির প্রধান নিশানা। নির্বিচার বস্তিতে বস্তিতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়ে গুলি করা হয়েছে। তাদের অপরাধ, তারা স্বাধীনতা চেয়েছিল। তাদের অপরাধ, তারা মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।
তাজউদ্দীন পানির দিকে তাকালেন। জলের পোকা পানিতে একটা অপূর্ব নকশা আঁকছে। কালো জলে আকাশের ছায়া পড়েছে। মুজিব ভাইয়ের মুখটা কেন যেন মনে পড়ছে তার।
নৌকা নদীর অপর পারে ভিড়ল। নতুন পাওয়া স্যান্ডেল হাতে ধরে তাজউদ্দীন নামলেন কাদাভরা ঘাটে। মানুষের পা পড়ে পড়ে ঘাট কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। মানুষের সারি চলেছে ঘাট থেকে। গ্রামে হাটের দিনে সাধারণত এই দৃশ্য দেখা যায়।
নদীর পারে আঁটির বাজার। বাজারে পৌঁছাতেই মানুষজন ঘিরে ধরল তাজউদ্দীন আর আমীর-উলকে। তাজউদ্দীনের পূর্বপরিচিত কর্মী সিরাজ এগিয়ে এলেন, তাজউদ্দীন ভাই, ঢাকার খবর কী? বঙ্গবন্ধু কুনহানে? আমরা অহন কী করুম? কত প্রশ্ন সিরাজের! তাঁর এলোমেলো চুলের নিচে কোটরাগত চোখ দুটোর উজ্জ্বল তারা থেকে, তার সাদা হাওয়াই শার্টের গোটা হাতার নিচের পেশল হাতের প্রান্তে দুটো পাঞ্জা থেকে কত যে প্রশ্ন ঝরে পড়ছে!
তাজউদ্দীন কী উত্তর দেবেন। কী উত্তরই-বা আছে তাঁর কাছে।
সিরাজ বললেন, একটা মিনিট খাড়ান। আমি একটু বাড়িত থাইকা আইতাছি। সিরাজ দৌড়াতে লাগলেন। তার চেক লুঙ্গিটা ভাজ করে হাঁটুর ওপরে তুলে তিনি পাড়ি দিচ্ছেন কলাইয়ের খেত।
সিরাজ ফিরে এলেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখের তারা আরও উজ্জ্বল। তিনি দুটো ৫০ টাকার নোট বের করে তাজউদ্দীনের হাতে দিলেন।
এইটা একটু রাখতে হইব, না করবার পারবেন না।
আরে কী বলো।
আপনে কই না কই যাইতাছেন। পকেটে টাকা লওনের টাইম পাইছেন। নাকি পান নাই! ঢাকায় মানুষ মাইরা সাফ করছে, সেইটা তো আমরা জানি। নদী দিয়া লাশ ভাইসা যাইতাছে। আপনে এইটা লন। এইটা আমার জয় বাংলা ফান্ডে আমি দিলাম। কিন্তু এই টাকা আপনে পথে খরচ করবেন। গাড়িগুড়ি ভাড়া করবেন। হাইটা আর কত দূর যাইবেন। লন।
আমীর আর তাজউদ্দীনের বড় মায়া বোধ হয়। পথে পথে এই দৃশ্য। গ্রামের মানুষ সব শহরের মানুষদের বরণ করে নেওয়ার জন্য, সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা চিড়া, মুড়ি, গুড়, পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতপাখা এনে বাতাস করছেন। আহা আমার সোনার বাংলা! ভায়ের-মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ!
সিরাজ একটা মোটরবাইক জোগাড় করে ফেললেন। তারপর বললেন, এই ফিফটি হোন্ডায় তো তিনজন টানতে পারব না। এক কাজ করি। প্রথম তাজউদ্দীন ভাইরে লই। একটান দিয়া লইয়া যামু মতিউর রহমান ভাইয়ের বাড়ি। তারপর তাঁরে ওইখানে রাখুম। হাত-পা ধুইয়া চা-পানি খাইতে খাইতে আরেকটান দিয়া লইয়া যামু ব্যারিস্টার সাবরে।
তাই করতে শুরু করলেন সিরাজ। মোটরসাইকেলের পেছনে। তাজউদ্দীনকে বসিয়ে ভটভট আওয়াজ তুলে চললেন তিনি। লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় হোন্ডায় চড়া কঠিন–এটা আবিষ্কার করলেন তাজউদ্দীন। কিন্তু সিরাজও তো লুঙ্গি পরা। তার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না!
সিরাজ তাজউদ্দীনকে নামালেন একটা পাটখড়ির বেড়া দেওয়া ঘরের সামনে। চালের ওপরে গাছগাছালি। একটা কামরাঙাগাছের নিচে হলুদ পাতা পড়ে আছে। উঠোনে মোরগ-মুরগি চরছে।
মতিউর এগিয়ে এলেন। সিরাজ বললেন, মতিউর ভাই, চিনছেন তো ভাইরে। তাজউদ্দীন ভাই। আরে আমগো নেতা তাজউদ্দীন ভাই।
মতিউর রহমানের চোখে চশমা। তিনি চশমাটা ঠিকঠাকভাবে নাকে বসিয়ে নিয়ে পানের পিক ফেলে তাকিয়ে বললেন, চিনুম না ক্যান, চিনছি ঠিকই, বিশ্বাস করতে পারি নাই, এত বড় নেতা… এই চেয়ার আন। পানি দে। আপনে বসেন…
সিরাজ বললেন, আমি ব্যারিস্টার সাবরে আনতে গেলাম।
তাজউদ্দীন বললেন, আচ্ছা। যাও তুমি তাড়াতাড়ি। আমি এইখানে একটু বসি। ছায়াঘেরা জায়গাটা বড় শান্তির বলে মনে হচ্ছে।
