আবার বের হলেন। একটা গলির মুখে আশ্রয় নিলেন। এরই মধ্যে একজন-দুজন করে ছাত্র চলে এসেছে সেই গলির মুখে। তারাও বড় রাস্তায় কী ঘটছে, সে ব্যাপারে কৌতূহলী। আর কী করা কর্তব্য, তা-ও জানতে চায়। তারা অনেকেই টের পেয়ে গেল যে এখানেই তাজউদ্দীন আছেন। তারা এসে এসে খবর দিতে লাগল, কোথায় কী ঘটেছে।
তাজউদ্দীন বললেন, রহমত আলী সাহেব, যে করেই হোক, সাতমসজিদ রোডটা পার হতে হবে। চলুন।
আমীর বললেন, জি চলুন।
একজন ছাত্র আগে আগে গেল।
তাঁরা সাতমসজিদ রোডে উঠতেই দূরে দেখা গেল একটা মিলিটারি গাড়ি। রাস্তার ওপরে প্রথম যে বাড়িটার গেট, সেটা খুলে তাঁরা ভেতরে ঢুকে
পড়লেন।
আমীর বললেন, এই বাড়ির লোক যদি জিজ্ঞেস করে, কেন তাদের বাড়ি এসেছি, কী বলব?
তাজউদ্দীন বললেন, বলব যে একটা টেলিফোন করতে পারি কি? খুব জরুরি একটা কল করা দরকার।
মিলিটারি গাড়ি চলে গেল। তারা আবার বেরোলেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেলেন বিপজ্জনক সড়কটি। তারপর আরও খানিকটা হাঁটতে হবে। একটা গলিতে ঢুকে পড়তে পারলে পরে রায়েরবাজারের রাস্তা ধরা যাবে। তাঁরা ধানমন্ডি ১৯-এ ঢুকে পড়লেন।
তাজউদ্দীন বললেন, আমাদের বাসায় একবার যাব নাকি? লিলি কেমন আছে, সোহেল, মিমি কেমন আছে, একটু জেনে যাওয়া যায়। আর বিদায়ও তো নিতে হবে।
আমীর বললেন, এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী কাজ আর দ্বিতীয়টা হবে।
আপনি তাই মনে করেন?
হ্যাঁ। ইয়াহিয়া খান ভাষণে বললেন যে পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু হলো শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগ। শেখ সাহেবের পরে আওয়ামী লীগের এক নম্বর ব্যক্তি কে? তাঁর বাড়িতে আর্মি, পুলিশ, গোয়েন্দা, টিকটিকি থাকবে না, এটা হয়!
শংকর হয়ে হেঁটে হেঁটে তারা পৌঁছে গেলেন রায়েরবাজার। হাঁটা তাজউদ্দীনের অভ্যাস আছে। ছোটবেলা থেকেই বহু পথ হেঁটেই তাঁরা চলাচল করেছেন। আর রাজনীতি করতে গিয়ে হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। নির্বাচনের সময় তো কথাই নেই। দুয়ারে দুয়ারে গেছেন হেঁটে হেঁটে। ইদানীং একটু ডায়াবেটিসের সমস্যাও হচ্ছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শে যখনই সুযোগ পান, হাঁটেন। মুজিব ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়া-আসা প্রায়ই হেঁটেই সারার চেষ্টা করেন।
রায়েরবাজার খানিকটা স্বাভাবিক। এখানে মিলিটারি ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন নেই।
তবে পথে সর্বত্র এক দৃশ্য। মানুষজন দলে দলে ছুটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। পালাচ্ছে উধ্বশ্বাসে। পরিবার-পরিজন, বাক্সপেটরা নিয়ে ছুটছে তারা। তাদের চোখেমুখে ভয়, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক।
তাজউদ্দীনকে চিনতে পারলেন এলাকার নেতা-কর্মীরা। তাঁরা তাঁদের নিয়ে গেলেন রায়েরবাজার সংগ্রাম পরিষদ অফিসে। অফিসের সামনে রাইফেল হাতে একজন কর্মী পাহারা দিচ্ছে।
তারা তাদের বসতে দিল। নাশতা এনে খেতে দিল। তাজউদ্দীন এই সাহসী মানুষগুলোকে বাস্তব পরিস্থিতি কী করে বলবেন?
একজনকে তিনি ভেতরে নিয়ে গেলেন। বললেন, শোনো। একজন। একটা রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ট্যাংক, কামান, মেশিনগানের বিরুদ্ধে লড়তে পারবে না। সবাই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাও। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা কে কোথায় আছে, তাদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলো। তারপর গেরিলা কায়দায় হঠাৎ হঠাৎ করে মিলিটারির ওপরে আক্রমণ করে আবার জনগণের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে হবে। আগে পরিস্থিতি দেখো। ওই রাইফেলধারী কর্মীকে সরে যেতে বলো।
তাদের পায়ে হাঁটার উপযোগী জুতা নেই।
ছেলেরা বলল, আপনাদের কী লাগবে, বলেন?
তাজউদ্দীন বললেন, দুইজনকে দুই জোড়া শক্তপোক্ত স্যান্ডেল শু এনে দিতে যদি পারো, খুব ভালো হয়। ছেলেরা ছুটল স্যান্ডেল শুর খোঁজে।
আমীর বললেন, কাগজ-কলম দাও। একটা জরুরি চিঠি লিখতে হবে। তাজউদ্দীন বললেন, আমাকেও লিখতে হবে।
কাগজ-কলম চলে এল। নেতাদের কাজে লাগতে পেরে কর্মীরা নিজেদের ধন্য মনে করছে।
তাজউদ্দীন আর আমীর দুজনেই দুটো চিরকুট লিখতে বসলেন।
তাজউদ্দীন লিখলেন :
লিলি, আমি চলে গেলাম। আসার সময় কিছু বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিয়ো। আবার কবে দেখা হবে জানি না…মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেয়ো।–দোলনচাঁপা।
একটুখানি আবেগে যেন কেঁপে উঠল তাজউদ্দীনের হৃদয়। দোলনচাঁপা মানে কেউ না বুঝুক, লিলি ঠিকই বুঝবেন।
আমীর-উল ইসলাম লিখলেন লীলার উদ্দেশে। লীলার গর্ভে বেড়ে উঠছে তাঁদের সন্তান। আর তিনি বেরিয়ে পড়েছেন অজানার উদ্দেশে। তিনি জানেন না, তিনি আর ফিরবেন কি না। আমীর-উল লিখলেন :
প্রিয় লীলা,
আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, কবে ফিরব কিছুই জানি না। শুধু জানি, একটা শোষণমুক্ত, শৃঙ্খলমুক্ত, পরাধীনতার নিগড়মুক্ত সুন্দর একটা রাজ্যের স্বপ্ন নিয়ে যাচ্ছি। তুমি ভালো থেকো। সাবধানে থেকো। কোলজুড়ে আসুক আমাদের অনাগত নতুন প্রজন্ম। তার জন্যই তো চাই মুক্ত একটা স্বদেশ।
ইতি তোমারই…
.
ব্যাঙ্গমা বলে, তাজউদ্দীনের চিরকুটটা পৌঁছাইছিল লিলির কাছে। আমীর-উল ইসলামের চিঠিটা লীলার কাছে পৌঁছায় নাই।
.
দুজনই চিরকুট ভাঁজ করে ঠিকানা লিখে দিলেন কাগজের ওপর পিঠে। বিশ্বস্ত কর্মী স্থানীয় নেতা নাসরুল্লা দায়িত্ব নিল সুবিধামতো ঠিকঠাক ঠিকানায় চিরকুট দুটো পৌঁছানোর।
