ওয়ালাইকুম আসোলাম।
চাচা কি আশপাশেই থাকেন?
জি বাবা!
পরিস্থিতি কী বুঝছেন?
না বাবা। বুঝতেছি না। কারফিউ তো চলতেছে। দুই দিন যা গজব গেল, বাড়িঘর পোড়ায়া দিছে, গোলাগুলি…আল্লাহ মাবুদ জানে বাবা। বাবা আপনাকে তো চিনলাম না।
আমীর মুশকিলে পড়লেন। তিনি নাম নিয়েছেন রহমত আলী। বাড়ি পাবনা। তা-ই তাঁকে বলতে হলো। আমার নাম রহমত আলী। আমি এই এলাকার রাস্তাঘাট কিছু চিনি না। পাবনা থেকে এসেছি।
আমার বাড়িও তো বাবা পাবনা।
এই এলাকায় তো অনেক দিন ধরে আছেন।
জি বাবা। নিজের বাড়ি।
আপনি কি এই এলাকায় কুষ্টিয়ার আতাউল হককে চেনেন?
চিনি তো।
কোন বাসা? অনেক দূরে, নাকি কাছে?
না, বেশি দূরে না।
আমাকে একটু বাড়িটা দেখায় দিতে পারবেন?
জি বাবা, পারব। আপনি আমার জেলার মানুষ। চলেন।
আমীর ভাবছেন এখন পাবনা জেলার বিশদ বিবরণ জিজ্ঞাসা করা শুরু হলে তো তিনি মুশকিলে পড়বেন। পাবনার সুজানগর ছাড়া আর কোনো এলাকাই তো তিনি চেনেন না। কাজেই চাচা মিয়াকে বরং প্রশ্নের মধ্যে রাখা ভালো!
কী বুঝছেন চাচা, বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন?
কিছু বুঝতেছি না বাবা। ইয়াহিয়া খান তো বলে দিয়েছে তার বিচার করবে।
হ্যাঁ। তা-ই তো বলল। কিন্তু বিচারের নামে এগুলো কী হলো? এত গোলাগুলি এত আগুন।
এইটা অবিচার বাবা। আল্লাহ তাআলা সহ্য করবেন না।
আতাউল হক সাহেবের বাড়ি পাওয়া গেল। টিনে ছাওয়া বাড়ি। অর্ধেক ইটের দেয়াল। তার ওপরে আবার টিনের বেড়া অর্ধেক। দরজায় কড়া নাড়া হলে আতাউল হক বেরিয়ে এলেন। আরে ভাই, কোথা থেকে এই বিপদের মধ্যে?
আর বলবেন না। আমীর-উল ইসলাম চোখ টিপলেন। মুসল্লি মুরব্বিকে বললেন, চাচা, এক মিনিট। আমি ভেতর থেকে একটু ভাবিকে সালাম করে আসছি।
ভেতরে গিয়ে আমীর-উল বললেন, ওই চাচাকে রাস্তায় পেয়েছি। আপনার বাড়ি চেনেন কি না জিজ্ঞেস করলাম, বললেন চেনেন। তাই তাঁকে। এনেছি। তাকে বলেছি আমার নাম রহমত আলী।
এদিকে ততক্ষণে আতাউল হকের স্ত্রীও সামনে এসে হাজির।
আমীর বললেন, আমার সঙ্গে তাজউদ্দীন সাহেব আছেন। আমরা যে বাড়িটায় রাতে ছিলাম, সেটা থেকে ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার সরাসরি দেখা যায়। ওই বাড়ি আমাদের জন্য নিরাপদ না। আর পরশু রাতে যখন উঠি, তখন অনেকেই দেখেছে যে আমরা ওই বাড়িতে আছি। যে কেউ জেরার মুখে এই বাড়ি দেখিয়ে দেবে।
আতাউল হক বললেন, ওনাকে নিয়ে আসেন।
আচ্ছা চাচাকে বলি ওনাকে আনতে। আমীর বাসা থেকে বেরিয়ে প্রবীণ মানুষটাকে বললেন, চাচা, দয়া করে একটা কাজ করবেন? আমরা যে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, ওই বাড়িতে মোহাম্মদ আলী নামের একজন আছেন। তাঁকে গিয়ে বলবেন, রহমত আলী আপনাকে সবকিছু নিয়ে এই বাড়িতে আসতে বলেছে। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।
আমীর তাকে পাঠিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাজউদ্দীন সাহেব একজন। অপরিচিত লোকের সঙ্গে আসবেন তো!
পনেরো মিনিটের মধ্যে দেখা গেল লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, টুপি পরা তাজউদ্দীন সাহেব আসছেন। প্রবীণ মুসল্লি ভদ্রলোককে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে তারা এই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। হক সাহেবের স্ত্রী তাদের জন্য নাশতা বানাতে লেগে পড়লেন।
তখনো কারফিউ চলছে। বাড়ির ওই প্রান্তে বস্তি। আরেক পাশে মসজিদ। হঠাৎ হইচই। কয়েকজন লোককে দেখা গেল, মুখ রুমালে ঢেকে মাথায় খাকি রঙের পট্টি বেঁধে বস্তিগুলোতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন দিচ্ছে। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসছে। তখনই শুরু হলো মেশিনগানের অবিশ্রান্ত গুলি।
তাজউদ্দীন, আমীর, আতাউল হক, তার স্ত্রী মেঝেতে শুয়ে পড়লেন। আগুন, গুলি থেকে যে মানুষেরা বাঁচতে পেরেছে, তারা কেউ মসজিদের ভেতরে, কেউ এই বাড়ির পাঁচ ইঞ্চি দেয়ালের পাশে শুয়ে পড়ল। চারদিকে আর্তনাদ, গুলির শব্দ, মানুষের মরণচিৎকার, কান্না…
তাজউদ্দীনদের মাথার ওপর দিয়ে টিনের বেড়া ফুটো করে গুলি বেরিয়ে যেতে লাগল। স্বাধীনতা বড় বেশি দাম চাইছে। কত মৃত্যু, কত রক্ত, কত লাশ মুক্তির সোপানতলে উৎসর্গিত হলে তবে আসবে স্বাধীনতা? তাজউদ্দীন ভাবছেন।
একটু পর গোলাগুলির শব্দ কমে এল। কমে এল আগুনের আঁচ।
আমীর বললেন, এই বাড়িটার মধ্যে থাকলে যেকোনো সময় গুলি লাগবে। আমি পাশের বাড়ির ভেতরে ঢুকব।
আতাউল হক বললেন, পাশের বাড়ির চাবি কিন্তু আমার কাছে আছে! যাবেন? বাড়ির পেছনের দেয়াল টপকালেই হবে।
আমীর বললেন, যাব।
তাজউদ্দীন বললেন, আপনি যেতে পারেন। আমি আর এখান থেকে নড়ছি না।
একটু পরে অনেকটাই নীরবতা নেমে এল। আতাউল হক সাহেবের রেডিওতে ঘোষণা এল, কারফিউ বিকেল ৪টা পর্যন্ত শিথিল।
আমীর-উল ইসলাম এই বাড়িতে ফিরে এলেন। তাজউদ্দীন বললেন, চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক।
তাঁরা বের হলেন। তাজউদ্দীন রাইফেলটা আর সঙ্গে নিলেন না। রিভলবার নিলেন পাঞ্জাবির ভেতরের লুকানো পকেটে। মাথায় টুপি, পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে বাজারের থলে। বের হয়ে প্রথম কাজ হবে সাতমসজিদ রোডটা পার হওয়া। এই রাস্তা দিয়ে মিলিটারি জিপ, ট্রাক যাতায়াত করছে। সেসব যানের সামনে মেশিনগান বসানো।
তাঁরা বের হয়ে এগোচ্ছেন। বড় রাস্তায় আর্মির ট্রাক দেখা গেল। একটা মসজিদে ঢুকে পড়লেন তারা। তবু নিজেকে নিরাপদ মনে হলো না। মনে হলো, মসজিদে অবাঙালি লোক বেশি।
