বেলাল বললেন, আমাদের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ভবনটা অরক্ষিত পড়ে আছে। এটা পাহারা দেওয়া দরকার। যে কেউ ঢুকে পড়ে ক্ষতি করতে পারে। অ্যাটাক হতে পারে যেকোনো সময়। মেজর সাহেবের কাছে একটু হেল্প চাইতাম।
আচ্ছা আপনারা একটু বসেন। আমি ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসে জানাচ্ছি।
ওসি সাহেব তার রুম ছেড়ে থানার ভেতরের দিকে ঢুকলেন। একটু পরে এসে বললেন, চলেন আপনারা। দুজন আসেন।
বেলাল মোহাম্মদ আর মাহমুদ হোসেন ভেতরে গেলেন। একটা মাঝারি আকারের রুমে এক পাশে চেয়ার-টেবিলের পাশে বসে আছেন মেজর জিয়া। ইউনিফর্ম পরনে। বোঝাই যাচ্ছে, ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই। চোখেমুখে বিশ্রামহীনতার চিহ্ন।
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করবে :
জিয়াউর রহমানের বয়স তখন ৩৫। বগুড়ার গাবতলী থানার একটা গ্রামে জন্ম। তার বাবা কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কাজ করতেন কেমিস্ট হিসেবে। জিয়া পড়েছেন বগুড়ার গ্রামে, বগুড়া জিলা স্কুলে, ১০ বছর বয়সের পর কলকাতায়। ১৯৪৬-৪৭ দুই বছর কলকাতার স্কুলে পড়ার পর ভারত পাকিস্তান ভাগ হলো। তারা পাকিস্তানে চলে এলেন। তার বাবা মনসুর রহমানের পোস্টিং হলো করাচিতে। জিয়াও ১১ বছর বয়সে ক্লাস সিক্সে। করাচির স্কুলে ভর্তি হলেন। স্কুল-কলেজ সেরে যোগ দিলেন সেনাবাহিনীতে। ১৯৫৫ সালে ১৯ বছর বয়সে কমিশনপ্রাপ্ত হন। কাবুলে মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন, ট্রেনিংয়ে জার্মানিতে গেছেন। ১৯৭০ সাল থেকে চট্টগ্রামের ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কাজ করছেন।
২৫ মার্চ রাতে তার ডিউটি পড়েছিল সোয়াত জাহাজের অস্ত্র খালাসে সাহায্য করার। তাঁর কমান্ডিং অফিসার পশ্চিম পাকিস্তানি লে. কর্নেল জানজুয়া তাঁকে ট্রাকে উঠিয়ে দিয়েছেন, রওনা করিয়ে দিয়েছেন বন্দরের দিকে। তাঁর। ড্রাইভার পাকিস্তানি। সঙ্গে আছে আরেক পাকিস্তানি অফিসার। জিয়া বন্দরে পৌঁছাতে পারছিলেন না, কারণ পথে পথে ছিল ছাত্র-জনতার দেওয়া। ব্যারিকেড। আর বন্দরে তার জন্য অপেক্ষা করছেন পশ্চিমা ব্রিগেডিয়ার আনসারি। জিয়ার মনে শঙ্কা, এই ব্রিগেডিয়ার হয়তো তাকে পরপারে পাঠানোর জন্যই অপেক্ষা করছেন। বন্দরে যাওয়ার পথে ব্যারিকেডে থামতে হলো, জিয়া ট্রাকের সামনের আসন থেকে অন্ধকার রাস্তায় নামলেন। বাঙালি জনতা ব্যারিকেড মজবুত করছে, তাদের হাতে লাঠিসোটা, চোখেমুখে। রোষানল, কণ্ঠে স্লোগান–জয় বাংলা। এই ব্যারিকেড অপসারণ করতে গেলে বাঙালি হয়ে বাঙালির বুকে গুলি চালাতে হবে।
একটা গাড়ি এসে থামল সেখানে। গাড়ি থেকে কে নামলেন ওটা? মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তিনি দৌড়ে আসছেন জিয়ার দিকে। কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, একটু কথা আছে।
তারা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে সরে গেলেন। খালেক বললেন, ক্যাপ্টেন। অলি আহমদের কাছ থেকে মেসেজ এসেছে। ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানিরা হামলা করেছে। বহু বাঙালিকে হত্যা করেছে।
জিয়া শুনলেন। এই শঙ্কাই তাঁরা করছিলেন। অলি আহমদসহ অন্য অফিসারদের সঙ্গে এর আগে গোপনে মিটিংও করে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ। মুজিবুর রহমান তো বলেই দিয়েছেন, আর যদি একটা গুলি চলে, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। শেখ মুজিব ৭ মার্চেই গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে রেখেছেন। কাজেই বিদ্রোহ করার এখনই সময়।
জিয়া বললেন, তাহলে আমি আর জাহাজে যাচ্ছি না। আমাদের এখনই বিদ্রোহ করতে হবে। তিনি ট্রাকে ফিরে এসে পাকিস্তানি ড্রাইভারকে বললেন, গাড়ি ঘোরাও। বন্দরে যেতে হবে না। ড্রাইভার আদেশ পালন করল। সঙ্গের পশ্চিমা অফিসারও কিছু আপত্তি করল না। ট্রাক চলল ষোলশহরের ক্যান্টনমেন্টের দিকে। ষোলশহর বাজারে বাঙালি সৈন্যরা জড়ো হয়েছে। এখানে পৌঁছানোমাত্র মেজর জিয়া লাফ দিয়ে ট্রাক থেকে নামলেন। বাঙালি। অফিসার ও জওয়ানরা এগিয়ে এল। জিয়া রাইফেল হাতে নিয়ে পাকিস্তানি অফিসারের বুক বরাবর তুলে বললেন, তোমাকে অ্যারেস্ট করা হলো। জিয়া ও বাঙালি অফিসাররা নৌবাহিনীর পাকিস্তানি ৮ জওয়ানকে নিরস্ত্র করলেন, কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। পরে লে. কর্নেল জানজুয়াকে জিয়ার সৈন্যরা হত্যা করে।
এই সময় জিয়া চেষ্টা করেন কমান্ডার রফিকের সঙ্গে যোগাযোগের। জিয়া। পরে লিখেছেন, তারা যোগাযোগ করতে পারেননি। আর রফিক লিখেছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা জিয়াকে রফিকের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। রফিক চেয়েছিলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ইবিআরসিতে ছুটে চলে যাক, তাদের পাশে দাঁড়াক, ২০ বালুচ রেজিমেন্টকে আক্রমণ করে ঘুমন্ত বাঙালি জওয়ান ও তাদের পরিবারকে বাঁচাক। তাঁদের তরুণ অফিসাররাও তা-ই করতে চেয়েছিলেন। সিনিয়র অফিসাররা ভারী অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া বালুচ রেজিমেন্টকে আক্রমণ করতে যাওয়া আত্মঘাতী হবে বলে সিদ্ধান্ত নেন এবং পটিয়ার দিকে সরে যান।
.
এখন জিয়াউর রহমান পটিয়া থানায় অবস্থান করছেন। বেলাল মোহাম্মদ আর রেডিওর লোকেরা তাঁর সামনে।
বেলাল মোহাম্মদ বললেন, আমরা একটা বেতার চালাচ্ছি। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র।
জিয়া বললেন, হ্যাঁ। কাল রাতে আমি আপনাদের রেডিও শুনেছি। বাংলাটাও শুনেছি। রাত ১০টার দিকে ইংলিশ প্রোগ্রামটাও শুনেছি। হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?
