রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে শেষবারের মতো সারসন রোডের বাড়ি ছাড়লেন ক্যাপ্টেন রফিক। তার মনে প্রশ্ন :
আমি তো যাচ্ছি দেশের জন্য যুদ্ধ করতে। কিন্তু আমার সঙ্গে অন্যান্য বাঙালি সৈন্য যোগ দেবে তো?
শেখ সাহেব ঢাকায় নিজেকে বাঁচাতে পারবেন তো?
এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে? যদি হেরে যাই মৃত্যু। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবে তো! আমার প্রাণের বিনিময়ে যদি দেশ স্বাধীন করে যেতে পারি, তার চেয়ে বড় কাজ আর কী হতে পারে!
রফিক গাড়িতে উঠলেন। পাশে ড্রাইভার কালাম। সঙ্গে দুজন রক্ষী। রফিকের হাতে স্টেনগান। তিনি ম্যাগাজিনে গুলি লোড করে নিয়েছেন। সমুদ্রের ধার দিয়ে গাড়ি চলছে। বঙ্গোপসাগর শীতল বাতাস পাঠিয়ে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে রফিকদের দেহমনে। ভেতরে-ভেতরে সবাই উত্তেজিত। সবার আগে যেতে হবে ওয়্যারলেস কলোনির দিকে। রাতের অন্ধকার চিরেও দেখা যাচ্ছে ওয়্যারলেসের অ্যানটেনা। এইখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি।
তবু ওয়্যারলেস দখল করতে না পারলে যোগাযোগ করা যাবে না। পাকিস্তানিরা জেনে যাবে তাদের পরিকল্পনা।
ওয়্যারলেস কলোনির গেটে পাহারা দিচ্ছে বাঙালি সেন্ট্রি। সে রফিকদের গাড়ি ঢুকতে দিল। মেসে রফিক সাবধানে পা ফেলে গেলেন হায়াতের রুমে। নক করলেন। হ্যালো হায়াত ঘুমিয়েছ?
না স্যার। কেবল একটু শুয়েছি। সে আলো জ্বালাল। বালিশের নিচ থেকে রিভলবার বের করে নিয়ে তার পোশাকের ভেতরে রাখল।
সব ঠিকঠাক আছে তো।
জি স্যার বলে হায়াত দরজা খুলতেই তার বুক বরাবর রফিকের স্টেনগান নল বাড়িয়ে দিল : দুঃখিত হায়াত। তোমাকে গ্রেপ্তার করতে হলো।
হায়াত রিভলবারে হাত দেওয়ার চেষ্টা করতেই তার মাথায় বাড়ি মারলেন। রফিক। বাড়ি মারল ড্রাইভার কালামও। তারপর তার হাত বাঁধা হলো। মুখ বাধা হলো। টেলিফোনের লাইন কেটে দিয়ে পরের অবাঙালি সুবেদারকে গ্রেপ্তার করার অ্যাকশন শুরু হলো।
রফিকের নির্দেশ পেয়ে বিভিন্ন পোস্টের বাঙালি ইপিআর নিজ নিজ এলাকার অবাঙালি অফিসার সোলজারদের নিউট্রালাইজ করা শুরু করে দিল।
রফিকের সিগন্যাল পেয়ে ইপিআর সদস্যরা তাদের অ্যাকশন সুচারুভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছে।
ডা. জাফর, আতাউর রহমান কায়সারদের সঙ্গে এই সব নিয়েই কথা বলছিলেন রফিক।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, আর রফিক আফসোস করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে বাঙালি সৈনিক ও তাগো পরিবারের হাজারো মানুষকে ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা যে নির্মমভাবে হত্যা করল, সেই ঘটনা লইয়া।
ব্যাঙ্গমি বলে, রফিকুল ইসলাম, পরে যিনি বীর উত্তম খেতাব পান, তাঁর বই লক্ষ প্রাণের বিনিময়েতে আফসোস করবেন, দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করবেন :
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে কিন্তু অন্য ঘটনা ঘটে গেল। রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা তাদের ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে ইবিআরসির বাঙালি সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। প্রথমেই তারা অস্ত্রাগার দখল করে নেয় এবং সেখানে গার্ড ডিউটিতে থাকা বাঙালি সবাইকে হত্যা করে ফেলে। অন্য বাঙালি সৈন্যরা সে সময় ঘুমিয়ে ছিল। অস্ত্রাগার দখলের পর ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা হত্যার পর বীভৎস উন্মাদনায় মেতে উঠল। সেই রাতে তারা ১০০০-এর বেশি বাঙালি সৈন্যকে। হত্যা করে। তারপর তারা বাঙালি সৈন্যদের ফ্যামিলি কোয়ার্টার এলাকায় চলে যায় এবং সেখানে নাগালে পাওয়া সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করে।
এই হত্যাযজ্ঞ থেকে যেসব বাঙালি সৈন্য বাঁচতে পেরেছিল, তারা রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে চলে যায়। এদের কয়েকজন আমার হেডকোয়ার্টারে এসে এই লোমহর্ষ ঘটনার সবকিছু বর্ণনা করে। অন্যরা চলে যায় ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এই রেজিমেন্টের অনেক অফিসার এবং সৈন্যের সবাই ছিল বাঙালি।
১৫
২৭ মার্চ ১৯৭১। স্থান পটিয়া থানা। পুলিশ স্টেশন। বেলাল মোহাম্মদ তাঁর তিন সঙ্গী নিয়ে এসেছেন থানায়। বারান্দা পেরিয়ে ওসির রুমে ঢোকা কঠিন। বাইরে পুলিশের পাশাপাশি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ানরাও সঙিন হাতে প্রহরারত।
দরজা পেরিয়ে টেবিলের ওপারের মুখটির দিকে তাকালেন বেলাল। ওসির চেয়ারে ইনি কে?
তার মুখের হাসি চওড়া হচ্ছে।
বেলাল বলে উঠলেন, আরে আপনি! বেগম মুশতারী শফীর আপনি মামা হন না!
জি। মুশতারী আমার ভাগনি।
আপনার নাম তো মানিক মিয়া?
জি। আপনারা কী মনে করে?
এখানে বাঙালি মিলিটারির লোকজন এসেছেন। ওনাদের সিনিয়র অফিসার কে আছেন?
মেজর জিয়াউর রহমান।
আছেন উনি?
কেন বলুন তো!
ওনার সঙ্গে একটু দেখা করা দরকার।
আছেন। দেখা করতে চান কেন?
আমরা তো স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার করেছি।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি শুনেছি। ভালোই হচ্ছে আপনাদের অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অনুষ্ঠানটার রেকর্ড নেই আপনাদের কাছে? সেটা বাজান। কাল রাতে তো শুনলাম আবার ১০টার দিকে ইংরেজিতেও একটা আপিল হলো।
অ্যাপিল টু দ্য ম্যানকাইন্ড। বললেন বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে আসা মাহমুদ হোসেন। তিনি হাসছেন। কারণ, গতকাল ২৬ মার্চ রাত ১০টায় তিনিও রেডিও ট্রান্সমিটার দখল করেছিলেন। রিভলবার নিয়ে গিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ারদের বাড়িতে। দুই-দুজন ইঞ্জিনিয়ারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে চলে এসেছিলেন কালুরঘাটে। তারপর নিজেই ৫ মিনিটের একটা ইংরেজি আবেদন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি পাঠ করে শোনান, হে পৃথিবীর মানুষ, তোমরা শোনো। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। মাহমুদ হোসেন লোকটা বেশ রহস্যময়। দেড়-দুই মাস হলো এসে উঠেছেন আগ্রাবাদ হোটেলে। ফ্রান্সে গানের রেকর্ড বের করেন। হরে কৃষ্ণ নামের একটা লং প্লে রেকর্ড নাকি লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। বাংলা গানের রেকর্ডও বের করেন। চট্টগ্রামে এসেছেন কারখানা গড়বেন বলে। মালামাল আসছে। রেডিওতে প্রায়ই যেতেন। বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে রেডিওর ক্যানটিনে দুপুরে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতেন। অসহযোগ শুরু হলে তিনি বললেন, বেলাল ভাই, একটা গীতিনকশা লেখেন। মঞ্চে আনি। বেলাল মোহাম্মদ লিখেছিলেন গীতিনাট্য : জয় বাংলা। সেটার রিহার্সাল হলো কয়েক দিন। তার স্ত্রীর নাম নাকি ভাস্করপ্রভা। লন্ডনে পরিচয়। লন্ডনেই বিয়ে। তাঁদের দুটো নাকি সন্তানও আছে। ভাস্করপ্রভার কাকা হলেন ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মোরারজি দেশাই। মাহমুদ হোসেনও চেয়েছেন বিদ্রোহী সেনাদের কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তার সাহায্য নিয়ে বর্ডার পার হয়ে ভারত চলে যেতে চান। ভারতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে ভারত সরকারের সাহায্য চাইবেন। ভারতের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করে উঠতে পারবেন বলেই তার বিশ্বাস। এই মাহমুদ হোসেনের কাছে বেলাল মোহাম্মদ গাড়ি চেয়েছিলেন পটিয়া থানা পর্যন্ত আসা-যাওয়ার জন্য। মাহমুদ হোসেনই ২৭ মার্চ সকাল সকাল ট্যাক্সি ভাড়া করে মুশতারী লজ থেকে বেলাল মোহাম্মদকে তুলে নিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে লোক ছিল দুজন। বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গেও। ট্যাক্সিতে তাই বড় ঠাসাঠাসি করে আসতে হয়েছে।
