বেলাল বললেন, দুইটা সাহায্য আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশা করি। এক. আমাদের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনটায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ফোর্স দিতে হবে। দুই, আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। আপনিও আমাদের বেতারকেন্দ্রে কথা বলুন। আপনার মুখ থেকে কথা শুনলে সেটার একটা আলাদা গুরুত্ব থাকবে। লোকে বুঝবে যে বাঙালি মিলিটারিরা স্বাধীনতার সংগ্রামে যোগ দিয়েছে।
জিয়াউর রহমান একটুক্ষণ ভাবলেন। বললেন, আপনারা দুপুরে খেয়েছেন?
না। খাইনি।
আগে খেয়ে নেন।
আমাদের সঙ্গে আরও মানুষ আছে।
ওনাদের ভেতরে আনেন। খাবার নিতে বলেন।
কক্ষটা বড়সড়ই বলতে হবে। এক পাশে একটা টেবিল। টেবিলের ওপরে নানা রকমের খাবার। পাউরুটি, রুটি, পোলাও, ভাজা মাছ, মুরগির রোস্ট, ডাল। এলাকাবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইরত সৈনিকদের জন্য যে যা পেরেছে, খাবার দিয়ে যাচ্ছে। একটু পর সৈনিকেরা এই ঘরে আসা যাওয়া করছে। বিভিন্ন জিনিস রেখেও যাচ্ছে।
টেবিল থেকে প্লেটে করে খাবার তুলে নিয়ে দাঁড়িয়েই খেয়ে নিলেন। সবাই। মাহমুদ হোসেন তাঁর কথাটা পাড়লেন জিয়ার কাছে, আমি বর্ডার পার হতে চাই। মোরারজি দেশাই আমার কাকাশ্বশুর। ইন্ডিয়াতে গেলে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করতে পারব। আর্ম অ্যামুনিশেন পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারব।
জিয়া চিন্তিত মুখে বললেন, আর্মস অ্যামুনিশেন আমাদের খুব দরকার।
মাহমুদ বললেন, আপনি আমাকে একটা চিঠি দিয়ে দেন, যাতে রাস্তায় বাঙালি পুলিশ, ইপিআর আমাকে না আটকায়।
জিয়া বললেন, আমার কাছে তো প্যাড নেই, সিল নেই।
মাহমুদ বললেন, আপনি শুধু সাদা কাগজে একটু লিখে দেন। এ আমাদের লোক। একে সাহায্য করো। তারপর আপনার সই। যথেষ্ট হবে।
.
খাওয়ার পর কালুরঘাটের দিকে যাত্রারম্ভ।
সামনে তিন ট্রাক জওয়ান। একটার পর একটা ট্রাক ছাড়ল। একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে।
তারপর জিয়া উঠলেন একটা জিপে। বসলেন ড্রাইভারের পাশের আসনে। ওই গাড়িতে আরও উঠলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। পেছনে সেন্ট্রিরা। তার পেছনে ট্যাক্সিতে উঠলেন বেলাল মোহাম্মদ, মাহমুদ হোসেন এবং তাদের দলবল।
গাড়িগুলো চলেছে পটিয়া থেকে কালুরঘাটের দিকে। রাস্তায় মানুষজন চলছে বিপরীত মুখে। শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। নিরাপত্তার সন্ধানে ছুটছে গ্রামের দিকে। কেউবা রিকশায়, কেউবা গরুর গাড়িতে, কেউবা হেঁটে। মাথায় বোঝা, কাঁধে পোটলা, হাতে বড় বড় ব্যাগ, কোলে-কাখে শিশুসন্তান। একটা বছর ছয়েকের ছেলে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে খাঁচায় ভরা পোষা পাখি, একজন। বৃদ্ধা পিঠে নিয়েছে ছাগলছানা।
জিয়াউর রহমান মানুষের জটলা দেখলেই গাড়ি থামাচ্ছেন। মানুষের উদ্দেশে বলছেন, আপনারা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন কেন? আমরা শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করে দেব। ভয়ের কিছু নেই। দুই দিন লাগবে ওদের বিতাড়িত করতে।
কালুরঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে গেল বিকেল ৫টা।
তাঁরা ছোট্ট স্টুডিওতে বসেছেন। জিয়াউর রহমান একটা বক্তব্য লিখলেন : আই, মেজর জিয়া, হেয়ারবাই ডিক্লেয়ার দ্য ইনডিপেনডেনস অব বাংলাদেশ।
বেলাল বললেন, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথাটা যোগ করা দরকার।
জিয়া বললেন, নিশ্চয়ই। তাই তো করতে হবে। এবার জিনিসটা দাঁড়াল, আই, মেজর জিয়া, হেয়ারবাই ডু ডিক্লেয়ার দ্য ইনডিপেনডেনস অব। বাংলাদেশ অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জয় বাংলা।
তার এই ঘোষণায় পাকিস্তানিদের হাতে থাকা কতগুলো অস্ত্রশস্ত্রের নাম আছে। নামগুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিয়া ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে ডেকে নিলেন স্টুডিওর ভেতরে।
বেলাল মোহাম্মদের মনে হলো, এই বক্তব্যটার বাংলা অনুবাদ হওয়া দরকার। অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন আহমদ তখন ট্রান্সমিশন ভবনে। তাঁকে বলা হলো, অনুবাদ করে দিতে। তিনি অনুবাদ করে দিলেন।
জিয়াউর রহমান পাঠ করলেন বিবৃতিটি।
বাংলা অনুবাদও পাঠ করে শোনানো হলো। খবরের সময় বলা হলো, মেজর জিয়া একটি বিবৃতি পাঠ করেছেন। সেই বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, মহান জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলো। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই শত্রুকে পরাজিত করা যাবে। দেশ-বিদেশের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র সাহায্য প্রয়োজন। ইত্যাদি…
মাহমুদ হোসেন মেজর জিয়ার কাছ থেকে একটা স্বাক্ষর করা চিরকুট নিলেন। পরিচিতিপত্র ধরনের চিরকুট।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, সেই পরিচয়পত্র কোনো কাজে লাগে নাই। কয় দিন পর সীমান্তের দিকে তিনি যাত্রা করেন। সিআইএর চর সন্দেহে জনতা তারে মাইরা ফালায়। জিয়াউর রহমানের সই তখন তার কোনো কাজে লাগে নাই।
জিয়াউর রহমান এরপর আরও দুই দিন রেডিওতে বিবৃতি দিতে আসেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, বেলাল মোহাম্মদ পরে একটা বই লেখেন, সেই বই অনুসারে মেজর জিয়ার প্রথম ঘোষণা গ্রেট ন্যাশনাল লিডার শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। তবে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এ আর মল্লিকের স্মৃতিকথা থাইকা মনে হয়, মেজর জিয়া প্রথম সুযোগেই নিজেরে বাংলাদেশের প্রভিশনাল হেড বা অস্থায়ী প্রধান ঘোষণা করছিলেন। যা-ই হোক, প্রথমে হোক, দ্বিতীয়বারে হোক, জিয়া একবার নিজেরে স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী প্রধান হিসেবে যে ডিক্লেয়ার করছিলেন, এটা সত্য।
