২৬ মার্চ সকালে ডা. জাফর আর আতাউর রহমান কায়সারের সঙ্গে নাশতা খেতে খেতে রফিক মাথার চুল ধরে টানতে থাকেন।
২৪ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে বাঙালি সৈনিকেরা আগে আক্রমণ করলে যুদ্ধ অনেক সহজ হতো। এমনকি ২৫ মার্চ যদি কর্নেল এম আর চৌধুরী আর মেজর জিয়া তার পরামর্শমতো অ্যাকশনে যেতেন, তাহলে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে হাজারো বাঙালি সৈনিককে এক রাতেই শহীদ হতে হতো না।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, ২৪-২৫ মার্চ হেলিকপ্টারে কইরা ক্যান্টনমেন্ট থাইকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি মেজর জেনারেল ইফতেখার জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠঠা খান, মেজর জেনারেল খাদেম হুসেন রাজা একটা কইরা মুখবন্ধ খাম লইয়া যান। প্রতিটা ক্যান্টনমেন্টে তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং সেনাবাহিনী প্রধান হামিদের অর্ডার পৌঁছাইয়া দেন যে আজকের রাইতটাই সেই রাত। আজকার রাইতেই অপারেশন সার্চলাইট পরিচালিত হইব।
ব্যাঙ্গমি বলল, রাইত আটটার সময় নয়ীম গহর গেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। ভিড় ঠেইলা ঢুকছিলেন ভিতরে। শেখ সাহেবের বডিগার্ড মহিউদ্দীন তাঁরে ভিতরে নিয়া গেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তারে দেইখা কইছিলেন, আমি তোমার লাইগা ওয়েট করতেছিলাম। আলোচনা ফেইল করছে। ইয়াহিয়া উইড়া চইলা গেছে। রাস্তায় ট্যাংক বাইরাইতাছে। অরা যদি অ্যাটাক করে, আমরাও অ্যাটাক করব। চট্টগ্রামকে বলো, ডোন্ট সারেন্ডার। লিবারেট চিটাগাং অ্যান্ড প্রসিড টুয়ার্ডস কুমিল্লা।
ব্যাঙ্গমা বলল, হ। সেইটা তো আগেই কইছি। নয়ীম গহর গেলেন বঙ্গবন্ধুর পাশের বাড়ি মোশাররফ সাহেবের বাড়িতে। মোশাররফ আবার চিটাগাংয়ের এম আর সিদ্দিকীর ভায়রা। সেইখান থাইকা নয়ীম ফোন করলেন এম আর সিদ্দিকীরে। বঙ্গবন্ধুর হুকুম। ডোন্ট সারেন্ডার…।
.
২৫ মার্চ ১৯৭১। ক্যাপ্টেন রফিকের বাসায় এলেন ডা. জাফর। তখন বিকেল। সূর্যের আলো গাছের চূড়ায় চূড়ায়। আমের মুকুলগুলো বিকেলের হলুদ আলোয় সোনাঝুরির মতো লাগছে। রফিক আর জাফর পুরো পরিস্থিতি আলোচনা করলেন। পাকিস্তানিরা সব বাঙালি সৈন্যকে বলছে, অস্ত্র গোলাবারুদ জমা দিয়ে দিতে। তারা সিগন্যাল পোস্টগুলোতে শুধু অবাঙালিদের বসাচ্ছে। লক্ষণ খুব খারাপ। যেকোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করতে পারে।
ডা. জাফর সব শুনলেন। এখানে-ওখানে ফোন করলেন। সন্ধ্যার দিকে জাফর বললেন, রফিক সাহেব। আমি একটু আওয়ামী লীগ অফিস ঘুরে আসি। কোনো খবর এসেছে কি না নিজে চেক করে আসি।
তিনি পার্টি অফিসে গেলে রাত আটটার দিকে এম আর সিদ্দিকীর বাড়ি থেকে ফোন এল, জরুরি খবর আছে। বাসায় চলে আসেন।
জাফরসহ নেতারা ছুটলেন এম আর সিদ্দিকীর বাসায়।
সিদ্দিকী সাহেব দরজা বন্ধ করলেন। বললেন, এইমাত্র নয়ীম গহর ফোন করেছিল মোশাররফ হোসেনের ফোন থেকে। আলোচনা ভেঙে গেছে। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক আসছে। ইয়াহিয়া খান পালিয়ে গেছে। মুজিব ভাই বলে দিয়েছেন, আমাদের আর্মি, পুলিশ, ইপিআরদের তার হুকুম, ডোন্ট সারেন্ডার। অকুপাই চিটাগাং। প্রসিড টুয়ার্ডস কুমিল্লা।
এইটা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ? জাফর জিজ্ঞেস করলেন।
ইয়েস। অ্যাজ আই হার্ড ফ্রম দ্য মাউথ অব নয়ীম গহর।
তাহলে আমাকে এখুনি যেতে হবে। জাফর বেরিয়ে পড়লেন।
.
জাফর চলে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেন রফিক খেতে বসলেন। আর্লি ডিনার। সঙ্গে আরেক ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দীন। খাওয়া কেবল শুরু করেছেন তিনি। ভাতের মধ্যে একটা মুরগির মাংস নিয়ে ঝোল তোলার জন্য চামচ ডুবিয়েছেন। বাটিতে। অমনি রুমে ঢুকে গেলেন জাফর। সঙ্গে আরেকজন কর্মী।
তাঁরা দুজনেই ভয়াবহ উত্তেজিত। তাদের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। গাড়ি করে আসা সত্ত্বেও জাফর হাঁপাচ্ছেন।
কী হয়েছে বলেন। বসেন। হাত ধোন। ভাত খান।
না রফিক সাহেব। ভাত খাওয়ার সময় এটা নয়। আলোচনা ফেইল করেছে। ইয়াহিয়া খান পিন্ডি চলে গেছে। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক বের হয়ে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু অর্ডার দিয়েছেন, চট্টগ্রাম দখল করতে। আপনাদের সারেন্ডার করতে নিষেধ করেছেন। চট্টগ্রাম দখল করে কুমিল্লার দিকে এগোতে বলেছেন। অর্ডারটা হচ্ছে ওরা যদি অ্যাটাক করে, আমরাও অ্যাটাক করব।
রফিক ভাতের থালা ফেলে উঠলেন। পাঁচক আহমদ জিজ্ঞেস করলেন, স্যার ভাত খাইলেন না যে। পাক কি ভালো হয় নাই? ক্যাপ্টেন রফিকের চোখের সামনে একমুহূর্তে তার সমস্তটা জীবন, ২৮ বছরের জীবন, তার ছাত্রজীবন, তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন, তার ৬১-এর রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া, তার ১৯৬৯-এর বিদ্রোহের চেষ্টা যেন ঝলসে উঠল। ঝলসে উঠল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না। যদি আমাদের খতম করবার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেশুনে কাজ করবেন। আর যদি একটা গুলি চলে…
রফিক বললেন, জাফর সাহেব, আমি যদি বাঁচতে চাই, আর আমার সৈনিকদের বাঁচাতে চাই, আর যদি আমাদের জনগণকে বাঁচাতে চাই, একটাই পথ আছে। আমি আমার ইপিআর সেনাদের তৈরি করে রেখেছি। আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি। আপনারা একটা কাজ করুন। আপনারা একটু ষোলশহরে যান। আর ক্যান্টনমেন্টে যান। বাঙালি সৈন্যদের বলুন আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে। তাদের সঙ্গে কথা বলে এসে আমার সঙ্গে রেলওয়ে হিলে আমার সদর দপ্তরে এসে দেখা করেন।
