জিয়া বললেন, না না। আমাদের দিক থেকে মিলিটারি অ্যাকশনে যেতে হবে, এইটা আমার মনে হয় না। পলিটিক্যালি সবকিছু সেটেল হবে।
লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী বললেন, শোনেন। তেমন কিছু যদি ঘটেই, আমরা দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। আমরা অবশ্যই বের হয়ে এসে জনতার কাতারে যোগ দেব।
২৩ মার্চ রফিক গেলেন এম আর সিদ্দিকী সাহেবের কাছে। সঙ্গে ডা. জাফর। এম আর সিদ্দিকীকে বললেন, আপনি শেখ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা যান। তাকে বলেন, চট্টগ্রাম হবে তার কেন্দ্রীয় দপ্তর। এখানে তিনি চলে আসুন। আমরা চট্টগ্রামকে মুক্ত রাখতে পারব। এখান থেকে তিনি সারা দেশের মুক্তির অভিযানে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
এম আর সিদ্দিকী বিষণ্ণ হাসি হাসলেন। বললেন, মুজিব ভাই সাড়ে সাত। কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা। পাকিস্তানের জনগণের একমাত্র মেজরিটি পার্টির ইলেকটেড লিডার। তিনি কেন ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে এসে নেতৃত্ব দেবেন। এটা হয় না। তবে পরিস্থিতি বোঝাতে আমি অবশ্যই তার সঙ্গে কথা বলব। তাকে যেমন বোঝাব, তেমনি তাঁর নির্দেশও আমাদের লাগবে। তাঁর নির্দেশ আমি আপনাকে অবশ্যই জানাব।
রফিক ২৪ মার্চ ভীষণ উত্তেজিত। কারণ, এমভি সোয়াতে এসেছে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ। জনতা বন্দরের রাস্তা ঘেরাও করে রেখেছে। ব্যারিকেড দিয়েছে। এই অস্ত্র কিছুতেই নামাতে দেবে না। শ্রমিকেরা অস্ত্র নামাবে না। তারা ধর্মঘট করল। রাস্তা উত্তাল মিছিলে মিছিলে।
অস্ত্র খালাসের দায়িত্ব ছিল বাঙালি ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের ওপরে। তিনি নিজে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন সামরিক বিদ্রোহের জন্য। আগে আক্রমণ করার জন্য। জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না।
ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার আসে। তাতে অবতীর্ণ হন পশ্চিমা মেজর জেনারেল আবুবকর ওসমান মিঠঠা। আরও কয়েকজন অফিসার তার সঙ্গে। তারা ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে হেলিকপ্টারে তোলে। প্রথমে তারা অবতরণ করে চট্টগ্রাম বন্দরে। সেখানে মজুমদারকে মিঠঠা বলেন, মজুমদার, সোয়াতের অস্ত্র আনলোড করো।
ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বলেন, আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। শ্রমিকেরা ধর্মঘট করেছে। রাস্তা জনতার দখলে। ব্যারিকেড সব বড় বড়। আমি এখানে অস্ত্র নামানো শুরু করলেই আগুন জ্বলে যাবে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুরা বন্দর জ্বালিয়ে দেবে। জাহাজে জাহাজে আগুন জ্বলবে।
মিঠঠা বলেন, যদি পুরোটা দেশ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যদি পুরো
কর্ণফুলী নদী রক্তে ভেসে যায়, তাহলেও অস্ত্র খালাস করতেই হবে।
ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বন্দর থেকে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত দিতে দেরি হচ্ছিল। বাঙালি সৈনিক ও অফিসাররা তখনই বিদ্রোহ করার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে মিথ্যা কথা বলে, অন্য ডিউটি আছে বলে, ঢাকায় নেওয়া হয়।
মজুমদারের বদলে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে নিয়োগ দেওয়া হলো সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে। শ্রমিকেরা কাজ করছে না, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে আসা পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের লাগিয়ে দেওয়া হলো জাহাজ থেকে বাক্স নামানোর কাজে। বাঙালি জনতা উত্তাল হয়ে উঠল। তারা পথে পথে ব্যারিকেড বসাতে শুরু করল। চলল গুলি। গুলিতে যে কতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো, রফিক তার হিসাব কষে কুলিয়ে উঠতে পারেন না।
২৪ মার্চ কেন এত তাড়াহুড়া করে অস্ত্রগুলো নামানো হচ্ছিল, ২৬ মার্চ সকালে রফিক খানিকটা বোঝার চেষ্টা করেন। কারণ, ২৫ মার্চ রাত থেকেই হাজার হাজার বাঙালিকে মারার জন্য হাজার হাজার বুলেট দরকার ছিল।
কিন্তু রফিক ২৪ মার্চেই অবস্থান নিলেন তাঁর পরিকল্পিত সদর দপ্তর রেলওয়ে হিলে। রেলের হক সাহেবের ফোন থেকে তিনি তার জওয়ানদের জানিয়ে দিলেন দুটো সংকেত। তার বার্তা ঠিকভাবে পৌঁছেছে তো। ২৪ মার্চ রাতে রফিক যখন অস্থিরচিত্তে অপেক্ষা করছিলেন, তখন একটা বড় গাছের নিচে মাটিতে বসে তিনি একটা কঞ্চি দিয়ে মাটিতে হিজিবিজি আঁকছিলেন। সেই সময় দেখা গেল একটা লাইট জ্বালিয়ে একটা যন্ত্রযান আসছে। কাছে এলে ভটভট আওয়াজে বোঝা গেল এটা একটা বেবিট্যাক্সি। রাস্তার এক পাশে কর্ণফুলী নদীর স্রোতকল্লোল সেই বেবিট্যাক্সির ভটভট আওয়াজে খানিকটা বাধাপ্রাপ্ত হলো। বেবিট্যাক্সি থেকে নামলেন লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী আর মেজর জিয়াউর রহমান। তাদের পেছনে দেখা যাচ্ছে আগ্রাবাদের ভবনগুলোর আলো। বন্দরের বাতিগুলো রাতের নদীর ধারে অমরাবতীর মতো জ্বলছে।
রফিক তাদের স্যালুট করলেন।
তারপর বললেন, স্যার। ওরা মারাত্মক গণহত্যার পরিকল্পনা করছে। আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। বাঁচার একটাই উপায়, বিদ্রোহ করা। আমরা আগে ওদের নিরস্ত্র করব। তা না হলে ওরা আমাদের স্রেফ গুলি করে মেরে ফেলবে।
এম আর চৌধুরী বললেন, ঢাকার সঙ্গে কথা হয়েছে। চরম আঘাত হানার কোনো পরিকল্পনা আর্মির নেই।
জিয়া বললেন, আর্মির চেইন অব কমান্ড ভাঙা ঠিক হবে না। ঢাকা থেকে আমাদের কাছে বিশেষভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, রফিক যেন পাগলামো না করে। ওর পাগলামোর কারণে অন্য সবার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
