আপনি একটা মিটিং অ্যারেঞ্জ করে দেন।
ঠিক আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
৫ মার্চ সন্ধ্যা। চোখ দেখানোর কথা বলে রফিক গেলেন ডাক্তার জাফরের চেম্বারে। সেখানে গাড়ি রেখে বেবিট্যাক্সি নিয়ে তারা গেলেন এম আর সিদ্দিকীর বাসায়। আওয়ামী লীগ সভাপতির বাড়ির বৈঠকখানার দেয়ালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পোস্টার। পিতলের তৈরি নৌকা। আর বঙ্গবন্ধুর ছবিওয়ালা বড় পোস্টার। গেট ঠেলে যখন তারা দুজন ঢুকছিলেন বাড়ির ভেতরে, রাতের বেলা কোকিল ডেকে উঠেছিল। বারুদে তাতানো শহরেও কোকিল ডাকে, বসন্ত বাতাসের একটা পশলা গায়ে মেখে রফিক ভেবেছিলেন।
লিডার। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসছে। ওরা আমাদের আক্রমণ করবে। যেভাবে মানুষ মারছে, তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশ স্বাধীন করা ছাড়া উপায় নেই। আর তা করতে হলে আমাদের সামরিক প্ল্যান লাগবে। রফিক বললেন।
আপনার কথা ঠিক। স্বাধীনতা ছাড়া উপায় নেই। দেখা যাক বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ কী বলেন। আর্মির মনের ইচ্ছাটা কী, সেটাও বোঝা দরকার। এম আর সিদ্দিকী বললেন ধীরে ধীরে।
আচ্ছা। আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। আপনি আপনার লিডারকে বলেন, আমরা প্রস্তুত। অন্তত আমি রফিক আর আমার ১৫০০ ইপিআর জওয়ান রেডি। বললেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত আছি।
আচ্ছা। আমি আপনাকে অবশ্যই জানাব।
রফিক ঘটনাপঞ্জি অনুসরণ করতে লাগলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে তিনি টুকে নিলেন প্রয়োজনীয় নির্দেশটুকু, যদি আমাদের খতম করবার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেশুনে কাজ করবেন, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমার এ দেশের মানুষের অধিকার চাই, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমরা সবকিছু বন্ধ করে দেবে, আর যদি একটা গুলি চলে, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ৮ মার্চ রেডিওর সামনে বসে রফিক কথাগুলো লিখে নিলেন ঠিকঠাক।
বাতাস উষ্ণ। বাতাস গরম। বাতাসে স্বাধীনতার গন্ধ। প্রতিটা গাছের পাতা যেন ফিসফিস করে বলছে : স্বাধীনতা, স্বাধীনতা।
রফিক ১৫ মার্চের দৈনিক পাকিস্তান-এর শিরোনাম পড়লেন : শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, বাঙালিদের স্বাধীনতার উদ্দীপনা কেউ দমাতে পারবে না। তার মনের মধ্যে সেই কথাটা যেন বারবার করে বেজে উঠল, কেউ দমাতে পারবে না, কেউ দমাতে পারবে না।
.
১৭ মার্চ সন্ধ্যা। গাড়ি ছুটে চলেছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে। হেডলাইটের আলো দুপাশের গাছের ওপরে পড়ে পড়ে সরে সরে যাচ্ছে। রাতের আঁকাবাকা রাস্তার সমস্যা হলো, হেডলাইটের আলো রাস্তায় পড়ে না, পড়ে আশপাশে। রফিকের মনে হলো, তাদের পথটা এই রকমই। পথ আছে। তাতে আলো পড়ছে না। আলো পড়ছে রেইনট্রি সেগুন শালগাছে। কিন্তু পথ আছে। সামনে এগিয়ে যাওয়াই হলো আসল কথা। গাড়িতে আরও আছেন ডা. জাফর, আতাউর রহমান কায়সার। আরও একটা গাড়ি আছে পেছনে পেছনে। তাতে আছেন ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন হারুন, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মবিন। ছোট্ট ভক্সওয়াগনটি হারুনের, এই গুরুত্বপূর্ণ অফিসারদের নিয়ে পেছন পেছনে একটা অলৌকিক ব্যাঙের মতো এগিয়ে চলেছে।
তাঁরা গেলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। লাইব্রেরিয়ান আলমের বাসায়।
পশ্চিমারা তো শক্তি বৃদ্ধি করছে।
হ্যাঁ। সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
আসলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান তারা চায় না। তারা আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাইট।
তারা পূর্ণশক্তি সমবেত করার আগেই আমাদেরই উচিত আক্রমণ করা।
তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়।
রফিক বললেন, আমার ১৫০০ ইপিআর আছে। আমি আক্রমণ চালাব। আমি আপনাদের সিগন্যাল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনারাও আক্রমণ চালাবেন। আর এসে আমার সঙ্গে জয়েন করবেন। তাহলে ওরা আর আমাদের সঙ্গে অন্তত চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামে পেরে উঠবে না।
ঠিক আছে।
সমন্বয় করবেন ডাক্তার জাফর। তাঁর কাছে চোখ দেখাতে গেলে কেউ কিছু মনে করবে না।
ঠিক আছে। রাতের অন্ধকারে ডাক্তার সাহেবের গাড়িতে করে নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন রফিক। কিন্তু ঘুম আসে না। বিদ্রোহ করবেন, দেশ স্বাধীন করবেন, এই চিন্তা যার মাথায়, তার ঘুম আসবে কী করে।
পরের দিন গেলেন মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে। লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীও আছেন সেখানে।
জিয়াউর রহমান ৮ ইস্ট বেঙ্গলের সবচেয়ে বড় অফিসার। তাঁর কমান্ডে আছে ৩০০ জন বাঙালি সৈন্য। এম আর চৌধুরী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সবচেয়ে বড় বাঙালি অফিসার। তার ওখানে আছে ৩ হাজার বাঙালি সৈন্য। অন্য দিকে ২০ বালুচ রেজিমেন্টে আছে আনুমানিক ৩০০ বালুচ সেনা। তাদের পরাজিত করা সহজেই সম্ভব। দরকার হলে ইপিআর। থেকেও একটা কোম্পানি দেওয়া যাবে।
রফিক দুই অফিসারকে বললেন সেই সম্ভাবনার কথা। ধরা যাক, যুদ্ধ লেগেই গেল, আপনারা কী করবেন। আমরা তো সহজেই বালুচ সেনাদের নিউট্রালাইজ করে ফেলতে পারব। আমি এক্সচেঞ্জ, বেতার, পোর্ট, বিমানবন্দর, নৌবন্দর, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর দখল করে ফেলতে পারব। আপনারা শুধু ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিয়ে বালুচগুলাকে শাটডাউন করবেন।
