ডা. এ কে জাফর, আতাউর রহমান কায়সারের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে বসলেন ক্যাপ্টেন রফিক।
সকালের আলো ফুটছে। যদিও আকাশটা মেঘলা মেঘলা। পাহাড়ের ওপরে গাছগাছড়ায় ঢাকা এই জায়গায় পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ডা. জাফর আর আতাউর রহমান কায়সারের মতো আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ক্যাপ্টেন রফিকের যোগাযোগটা তো আজকের নয়। সেটা তো শুধু রফিকের চোখ দেখানোর জন্য নয়।
.
৩ মার্চ চট্টগ্রামে মিছিল বেরিয়েছে। সেই মিছিল যেন ছিল উত্তাল বাঁধভাঙা নদী। সমস্ত রাজপথ প্রকম্পিত ছিল স্লোগানে স্লোগানে : এক দফা এক দাবি বাংলার স্বাধীনতা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। ওয়্যারলেস কলোনিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বাস। সেখান থেকে গুলি হলো। রক্তে ভেসে গেল মিছিল। দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে গেল।
আশ্চর্য যে সেখানে ডিউটি দিচ্ছে ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা।
ক্যাপ্টেন রফিক গেলেন ঘটনাস্থলে। দেখা পেলেন পুলিশ সুপার শামসুল হক সাহেবের।
রফিক বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে আর্মি কেন? এদের কে ডেকেছে?
পুলিশ সুপার অসহায় কণ্ঠে বললেন, কেউ না।
এইখানে অবাঙালি কলোনিতে যে অনেক বালুচ সৈন্য সিভিল পোশাকে আছে, আপনি আশা করি জানেন। রফিক বললেন।
জানি।
কোনো বেসামরিক লোকের কাছে এখন রাইফেল থাকার কথা নয়, তা-ও আপনি জানেন।
জানি।
বিনা উসকানিতে মিছিলে গুলি করেছে বালুচ সৈন্যরা। বুঝতে পারছেন।
পারছি। বহু মানুষ মারা গেছে।
যারা মারা গেছে, তারা সবাই বাঙালি?
হ্যাঁ। যারা মারা গেছে, তারা সবাই বাঙালি।
আমরা কি কাউকে অ্যারেস্ট করেছি। ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিকের ভ্র কুঁচকে গেছে। তিনি বুকের মধ্যে একটা কষ্ট অনুভব করছেন।
না। আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করিনি। বালুচ সৈন্যরা একশ জন নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে গেছে। আটক সবাই বাঙালি।
সামনে দিয়ে একজন বালুচ মেজর হেঁটে যাচ্ছেন। একবার তিনি তাকালেন রফিক আর এসপি সাহেবের দিকে। তাঁর চোখেমুখে জাতিবিদ্বেষ। ঘৃণার আগুন তার মুখটাকে বিকৃত করে রেখেছে।
রফিকের মনের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল। কিছু একটা করতে হবে। করতেই হবে। কী করা যায়? ডা. জাফর বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া সামরিক বিদ্রোহ দিয়ে হবে না। কথা তিনিও মানেন বটে। তবে এ কথার সঙ্গে তিনি এটাও যুক্ত করতে চান, তিনি পাকিস্তানি মিলিটারিদের মনোভাবটা জানেন। এদের মতো নিষ্ঠুর-নৃশংস গোষ্ঠী পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা নেই। একটা মার্শাল সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াইটা চলছে। এই লড়াইয়ে জিততে হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামরিক পদক্ষেপও লাগবে। ঠিক সময়ে সঠিকতম পদক্ষেপ। রফিকের দুই কান দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। তিনি ফিরে এলেন তার সারসন রোডের বাসায়। ডায়াল ঘোরাতে লাগলেন। এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কল করতে হয়। এক্সচেঞ্জকে জানালেন ডা. জাফরের বাসায় ফোনটা দিতে।
হ্যালো…ডা. জাফর আছেন…
জি আছেন।
আমি রফিক। ওনাকে একটু ফোনটা দেবেন?
জি।
জাফর ভাই, ভালো মাছ একটা রান্না হয়েছে। আপনি কি একটু সারসন রোডের বাসায় আসবেন। আমার বাবুর্চি আপনার প্রশংসা শুনতে খুব ভালোবাসে।
কী মাছ?
বড় মাছ জাফর ভাই। অনেক বড় মাছ।
ডা. এ কে জাফর এই কোড ভাষাটা বুঝতে পারলেন। পরিস্থিতি নিশ্চয়ই খুবই জটিল। আলোচনা করতে হবে ব্যাপারটা।
তিনি বললেন, ওকে। আমি আসছি। আপনি তরকারি বাড়তে বলেন। মাছ ঠান্ডা খাওয়া যাবে। তবে ভাতটা গরম চাই।
.
ডা. জাফর এলেন ক্যাপ্টেন রফিকের বাসায়। ৩ মার্চ ১৯৭১ রাতের বেলা।
তাঁরা দুজন পাশাপাশি বেতের সোফায় বসলেন।
দুজনে গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছেন। তারা জানেন, যেসব কথা হবে, সেসব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিপজ্জনক। বিপদ শুধু নিজেদের নয়, দেশের মানুষের। যা করতে হবে, বিপদ মাথায় নিয়েই করতে হবে বটে, তবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করতে হবে, যাতে লক্ষ্য হাসিল হয়।
জাফর ভাই। বালুচ সৈন্যদের দিয়ে আজকে এতগুলো মানুষ মারল। আমার কাছে খবর আছে। ২২ বালুচ রেজিমেন্টের একটা রেজিমেন্ট ঢাকায় আনা হয়েছে। ওরা তো সৈন্য আনছে। অস্ত্র আনছে। আমাদের একটা কিছু করা উচিত।
ডা. জাফর ঝিম মেরে গেলেন। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। রফিকের মুখের দিকে। যেন রফিকের মুখের মধ্যে আছে রুটম্যাপ, সেই রুটম্যাপ পাঠ করে এগোতে হবে সামনের দিকে…আজকে ওয়্যারলেস কলোনিতে যা ঘটল, সেটা আমাদের আগের ভাবনাকেই রিকনফার্ম করে। রফিক সাহেব, আমরা আর পাঞ্জাবিদের সঙ্গে থাকতে পারব না। আমাদের আলাদা হতে হবে।
ইয়েস জাফর ভাই। আমাদের স্বাধীন হতে হবে।
ঢাকায় স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের পতাকা বানানো হয়েছে। আমরা স্বাধীনতার দিকেই এগোচ্ছি।
আসেন জাফর ভাই, আমরা একসঙ্গে কাজ করি। আমি জানি না ডিফেন্সে আর যারা বাঙালি সৈন্য অফিসার আছেন, তারা আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন কি না। কিন্তু আমার আন্ডারে আছে দেড় হাজার ইপিআর। তাদের দিয়ে আমি চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম এক মাস মুক্ত করে রাখতে পারব। এই এক মাসের মধ্যে আপনার দলকে বলেন বন্ধুরাষ্ট্রগুলো থেকে আমাদের জন্য সাপোর্ট আনানোর ব্যাকআপ রাখতে।
ওয়েল। আমি আপনার পয়েন্টটা বুঝতে পারছি। অনেক সেনসিটিভ এবং ভেরি ভেরি ইম্পরট্যান্ট ইস্যু। আমি একটু এম আর সিদ্দিকী ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলি।
