এই ভবনটিতে রেলের কর্মকর্তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করেন। রেলওয়ে হিলে ক্যাপ্টেন রফিক তার জওয়ানদের নিয়ে যখন আসেন, ২৫ মার্চ বেশি রাতে, তখন এই পরিবারগুলো–নারী-পুরুষ-শিশুরা–তাঁদের হাততালি দিয়ে শুধু অভিনন্দন জানাননি, তাদের খাবার দিয়ে, পানি দিয়ে সাহায্য করেছেন। এমনকি ট্রেঞ্চ খুঁড়তে নিজেরা কোদাল ধরেছেন। গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিজেরা নামিয়ে দিয়েছেন। নতুন টেলিফোন লাইন লাগিয়ে দিয়েছেন রেলের কর্মচারীরা। খাবার তৈরি করতে হাত লাগিয়েছেন।
সৈনিকেরা ট্রেঞ্চে পজিশন নিয়ে আছে। সম্ভাব্য আক্রমণের যেন জবাব দেওয়া যায়। ক্যাপ্টেন রফিক ঘুরে ঘুরে দেখেছেন ট্রেঞ্চের পজিশন। ৩ ইঞ্চি মর্টার বসানো হয়েছে।
রফিক আশ্চর্য হয়ে একটা কথা ভাবছেন। পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ করলে যাতে অসামরিক লোকেরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য তিনি সবাইকে বলেছেন, এই এলাকা ছেড়ে তারা যেন নিরাপদ জায়গায় চলে যান। নারী শিশুরা অনেকেই রাতে আবাসিক এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। পুরুষেরা, তরুণেরা, এমনকি কিশোরেরা যায়নি। তারা বলেছে, আমরা থাকব। আপনাদের পাশে থাকব। সাহায্য করব। যুদ্ধ করব। রফিক আশ্বস্ত বোধ করেছেন। এই দেশ স্বাধীন হবেই। এই যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হবই।
দেশের মানুষ সবাই একদেহ একমন হয়ে উঠেছে। এই জাতিকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটা মনে পড়ে রফিকের। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।
.
একটা গাড়ি ওপরে উঠছে। সব গাড়ির ওপরে ওঠার কথা নয়। কে এল?
২৬ মার্চ সকালবেলা রেলওয়ে হিলে একটা চেয়ারে বসে তন্দ্রাজড়িত চোখে রফিক গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গাড়ি থেকে নামছেন ডা. জাফর।
রফিক মার্চ মাসের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। বাঙালি মিলিটারি অফিসারদের সঙ্গেও কথা বলছেন। চট্টগ্রামে আছে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সেখানে বাঙালি সৈন্য বেশি। পুলিশ ইপিআর আর্মি একসঙ্গে অপারেশন শুরু করলে পুরো চট্টগ্রাম এলাকাই বাঙালিরা মুক্ত রাখতে পারবে, এই ছিল রফিকের মত এবং পরিকল্পনা। সেটা নিয়ে তিনি অনেকবারই কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে, মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে, লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীর সঙ্গে। শেষের দুজন তার কথার সঙ্গে একমত হননি। তাদের মত ছিল, আর্মির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা যাবে না, আর বড় ধরনের গণহত্যায় পাকিস্তান আর্মি যাবে না।
রফিকের সঙ্গে সংগ্রাম পরিষদের অনেক নেতারই যোগাযোগ। সবচেয়ে বেশি খাতির ডা. জাফরের সঙ্গে। চোখের ডাক্তার এ কে জাফর। আওয়ামী। লীগের নেতা। ছয় দফার নামে পাগল ছিলেন। এখন উন্মত্ত এক দফা নিয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। তবে তিনি ঠান্ডা মাথার লোক। ক্যাপ্টেন রফিকের চোখ দেখানোর দরকার পড়ত। তাই তিনি যেতেন ডা. জাফরের কাছে। তার চেম্বারের দেয়ালে চোখের রেটিনার ছবির পাশে বঙ্গবন্ধুর ক্যালেন্ডার। হাত উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধু। পাশে লেখা ৬ দফা।
চোখ পরীক্ষা করতে করতে জাফর বলতেন, কী মনে করেন, ইয়াহিয়া খান কি ক্ষমতা দেবে?
রফিক আস্তে আস্তে নিজের হৃদয়টাকে উন্মোচিত করতে শুরু করেন ডা. জাফরের সামনে। চোখের মধ্যে টর্চ ধরে ডা. জাফর বলতেন, ওপরের দিকে তাকান? কী? জয় বাংলা দেখতে পান?
চোখ দেখে কি মন পড়ে ফেলা যায় নাকি।
ক্যাপ্টেন রফিক বলতেন, ডাক্তার সাহেব, আমার পরনে উর্দি থাকে। কিন্তু মনটা থাকে কাঁটাতারের বাইরে।
আচ্ছা বাম চোখটা একটু মেলুন। চোখে এক ফোঁটা ওষুধ দিতে দিতে ডা. জাফর বলতেন, সেটা কী রকম?
আমি তো ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিকসে পড়তাম। মোতাহার হোসেন সাহেব আমার টিচার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালন। থেকে শুরু করে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে আমি যুক্ত ছিলাম।
আপনার চোখে সেসব লেখা আছে। আমি পড়ে ফেলছি। ডাক্তার জাফর প্রসন্ন একটা হাসি দিলেন। রফিকের চোখ থেকে জল ঝরছে তখন।
চোখ কিন্তু মনের কথা বলে। আমি আপনার মন পড়ে ফেলছি, রফিক সাহেব।
তাহলে সর্বনাশ। আমি যে যশোের থাকার সময় ১৯৬৯-এ বিদ্রোহ করার চেষ্টা করছিলাম, সেটা আবার আপনি পড়ে ফেলছেন না তো! যশোর ক্যান্টনমেন্টে আমি তখন রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট।
সেটা না করে ভালো করেছেন। বঙ্গবন্ধু ইলেকশনটা করেছেনই জনগণের ম্যান্ডেট পৃথিবীবাসীকে দেখানোর জন্য। তিনি জানতেন একবার নির্বাচন হলে জনগণ কী চায় সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া সামরিক বিদ্রোহ দিয়ে তো পৃথিবীর কোনো দেশ স্বাধীন হতে পারেনি। বায়াফ্রার উদাহরণ তো আমাদের সামনে আছেই।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু আলোচনা করে কোনো ফল পাবেন বলে মনে হয় না।
সেটা বঙ্গবন্ধু জানেন বলেই মনে হয়।
.
ডা. জাফর গাড়ি থেকে নেমে এলেন। তার দুই হাতে সসপ্যান। সঙ্গে আরও আছেন আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান কায়সার। আরও দুজন নেতাকে নামতে দেখা গেল। সবাই হাতে করে গামলা-সসপ্যান আনছেন। রফিক উঠলেন। সালাম জানালেন।
ডা. জাফর বললেন, আপনাদের জন্য সকালের নাশতা এনেছি।
ফ্লাস্কে করে তাঁরা চা-ও এনেছেন। ক্যাপ্টেন রফিক তাঁর তদারককারীকে ডেকে বললেন, জওয়ানদের মধ্যে নাশতা ডিস্ট্রিবিউট করে দাও।
