আচ্ছা। তুমি যখন বলছ।
এর মধ্যে সুলতানুল ইসলাম এসে গেছেন। তিনি নিয়মিত ঘোষক। দুপুরে রেডিওতে এম এ হান্নান সাহেবের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের পর তার বন্ধুরা বলতে লাগল, তুমি বসে আছ কেন, যাও রেডিওতে। তিনি একটা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চলে এসেছেন কালুরঘাটে। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করতে চান।
সন্দ্বীপ বেলালকে বললেন, বেলাল ভাই, সুলতানকে দিয়ে তো আপনি বিপ্লবী কথাটা বলাতে পারবেন না।
কেন?
ও তো কনজারভেটিভ। বিপ্লব জিনিসটা ও মানতে পারবে না।
আরে আমি যা লিখব তা-ই পড়বে।
না, আগে আপনি বা আমি রেডিওর নাম ঘোষণা করে দিই। তারপর সুলতানকে দেন।
তাহলে তুমি আরম্ভ করো।
এর মধ্যে ফোন এসে গেল। ফোন করেছেন চট্টগ্রাম রেডিওর নিউজ এডিটর। তার নাম সুলতান আলী। তিনি ফিসফিস করে বললেন, এই আপনারা দেরি করছেন কেন। রাত পৌনে আটটায় বিবিসি। সবাই বিবিসি। শুনবে। এখনই শুরু করে দেন। এরই মধ্যে সাড়ে সাতটা পার হয়ে গেছে। আর দেরি করা যায় না।
১৯৭১ সাল। ২৬ মার্চ। সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, পাঠ করতে শুরু করলেন, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি।
ডা. আলীর সঙ্গে তার ভাতিজি হোসনে আরা। তিনি নিয়মিত ঘোষক। বেলাল বললেন, হোসনে আরা, আপনি কিছু মনে করবেন না, আপনাকে কথা বলতে দেওয়া যাবে না। কারণ, এটা তো গোপন বিপ্লবী বেতার। আপনার কণ্ঠ শুনলে লোকে ধরে ফেলতে পারবে আমরা কোথায় আছি। আপনি কাইন্ডলি কিছু মনে করবেন না।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কাগজটা বারবার করে পড়া হলো। কবি আবদুস সালামের কথিকাটা কবি নিজে পড়লেন। এতে কোরআন শরিফ থেকে উদ্ধৃতি আছে, মুক্তির যুদ্ধ যে ইসলাম ধর্মের আলোয় ন্যায়সংগত সে সম্পর্কে যুক্তি আছে। তিনি পড়ছিলেন :
নাহমাদুহু ওয়ানু সাল্লিহি আলা রাসুলিহিল করিম।…আসোলামু আলায়কুম। প্রিয় বাংলার বীর জননীর বিপ্লবী সন্তানেরা। স্বাধীনতাহীন জীবনকে ইসলাম ধিক্কার দিয়েছে। আমরা আজ শোষক প্রভুত্বলোভীদের সাথে সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। এই গৌরবোজ্জ্বল স্বাধিকার আদায়ের যুদ্ধে, আমাদের ভবিষ্যৎ জাতির মুক্তিযুদ্ধে মরণকে বরণ করে যে জানমাল আমরা কোরবানি দিচ্ছি, কোরআনে করিমের ভাষায় তারা মৃত নহে, অমর। দেশবাসী ভাইবোনেরা আজ আমরা বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রাম করছি।…নাসরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব। জয় বাংলা।
আবদুল্লাহ ফারুক, সুলতানুল ইসলামের কণ্ঠেও বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত জরুরি ঘোষণা পঠিত হলো বারবার।
একটু পর স্টুডিওর গেটে নক। ইশারায় ডাক। ডাকছেন ডাক্তার আবু জাফর। বেলাল বাইরে গেলেন। দেখলেন, আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেসেজটা পড়ব।
আসুন ভেতরে আসুন। আপনি তো দুপুরে পড়েছেন। এখন আবার পড়বেন। তবে একটা শর্ত। আপনার নাম বলা যাবে না।
কেন?
এটা গোপন বেতার। অবস্থান জানাতে চাই না। পাকিস্তানিরা এয়ার অ্যাটাক করতে পারে। আপনি পড়েন। চট্টগ্রামের সবাই আপনার গলা চেনে।
হান্নান বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তিনি আবারও বঙ্গবন্ধুর নামে আসা। সাইক্লোস্টাইল ঘোষণাটা পাঠ করলেন।
প্রায় আধঘণ্টা অধিবেশন চলল।
তারও আগে ডা. আলী ভাতিজিকে নিয়ে গাড়িতে চলে গেছেন।
আগামীকাল সকাল ৭টায় আবার অধিবেশন বসবে। ঘোষণা দিয়ে সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে বাইরে এলেন সন্দ্বীপ, সুলতান, বেলাল। এসে দেখেন, কোথাও কেউ নেই।
ইঞ্জিনিয়াররা নেই। ইপিআর জওয়ানেরা নেই।
শুধু হান্নান সাহেবের জিপ স্টার্ট দিচ্ছে।
বেলাল মোহাম্মদেরা গেলেন জিপের কাছে। আমরা শহরে যাব। আমাদের নিয়ে যান।
জিপে তো তিনজনের জায়গা হবে না। হান্নান সাহেবের জিপ অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
অন্ধকার।
জোনাকি জ্বলছে।
তিনজন হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতেই তাঁরা ফিরলেন মুশতারী লজে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, বেলাল মোহাম্মদ ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের দৈনিক স্বাধীন পত্রিকায় একটা কবিতা লিখছিলেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, হ লিখছিলেন তো। কবিতাটা কও তো শুনি। ব্যাঙ্গমা কবিতাটা মুখস্থ বলে :
এই দিনটি আমার দিন
হান্নানের দিন
সালামের দিন
কাসেমের দিন, ফারুকের দিন–
এই দিনটিতে কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে
একটি ছিন্নপত্রে আমি
লিখেছিলাম একটি নাম :
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র–
মাইকের সামনে কাসেমকে সেটা পড়তে দিয়েছিলাম।
হান্নান ঘোষণা করেছিলেন।
সালাম ভাষণ দিয়েছিলেন।
১৯৭১-এর এই দিনটির পর পটিয়া থেকে
আমি ডেকে এনেছিলাম ট্রান্সমিটারে
মেজর জিয়াকে–তারপর এসেছিল
একে একে আমাদের হাবিবুদ্দীন,
আমিন, রাশেদ, শারফুজ্জামান,
শাকের, মুস্তফা, রেজাউল।
কিন্তু আল্লার কসম, সেদিন
মি জানতাম না, এ দিনটি
হবে একটা দেশের স্বাধীনতা দিবস (১৮.৩.৭৩)।
ব্যাঙ্গমা বলে, বেলাল মোহাম্মদ এই কবিতা প্রকাশ করছেন ১৯৭৩। সালে। তখন বঙ্গবন্ধুও বাঁইচা, জিয়াউর রহমানও বাইচা।
১৪
সারা রাত নির্ঘম কাটিয়ে ভোরের দিকে একটুখানি তন্দ্রামতো এল ক্যাপ্টেন রফিকের। চট্টগ্রাম সিআরবি হিলে এসে উঠেছেন তারা।
লাল রঙের রেল ভবন ব্রিটিশ স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর ঔপনিবেশিকতার চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা আবাসিক ভবনের নিচতলায় তাঁর অস্থায়ী সদর দপ্তর। সেখানেই একটা চেয়ারে বসে আছেন তিনি। শুয়ে ঘুমানোর প্রশ্নই আসে না।
