ভাই, আর্মি এসে তো আমাদের স্রেফ গুলি করে মেরে ফেলবে।
তা হবে না। কমান্ডার রফিকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা বেতার ভবন পাহারা দেওয়ার জন্য বাঙালি সৈন্য পাচ্ছি।
ভাই আমাকে ক্ষমা করেন। আমার বউ-বাচ্চা আছে। আমি তো অর্ডার দেওয়ার লোক না। অর্ডার দিতে পারেন আঞ্চলিক পরিচালক। তাঁকে বলুন। তিনি বললেই হবে। আমি বললে হবে না।
ওনাকে যে ফোন করব, ওনার নতুন কোয়ার্টারে এখনো ফোন লাগেনি।
উনি এআরডি ওয়ানের বাসায়। আমার সঙ্গে এখনই ফোনে কথা। হয়েছে। আপনি ফোন করুন। পাবেন।
এর মধ্যে সন্দ্বীপ ও ফারুকও এসে হাজির কন্ট্রোল রুমে।
বেলাল মোহাম্মদ সাদা রঙের ফোনটার পেটের নম্বর ঘোরাতে লাগলেন। এআরডি ওয়ান কাহার সাহেব। পরিচালক নাজমুল আলম সাহেব। দুজনেই ওই বাড়িতে আছেন। ফোন ধরলেন কাহার।
রিসিভার এ পাশে দেওয়া হয়েছে সন্দ্বীপের হাতে।
কাহার জিজ্ঞেস করলেন, কে আছে ওখানে?
সন্দ্বীপ বললেন, বেলাল সাহেব আছেন।
বেলাল সাহেবকে দিন।
হ্যালো-বেলাল মোহাম্মদ বললেন।
শোনেন, বেলাল সাহেব-কাহার সাহেব বললেন-আপনারা সম্প্রচার করতে চান করুন। শুধু একটা বুদ্ধি দিই। আগ্রাবাদ থেকে করতে যাওয়ার দরকার নেই। কারণ, এখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট কাছে। নৌবাহিনীর বেস কাছে। আর্মি অ্যাটাক করলে মারা পড়বেন। আপনারা কালুরঘাট যান। কালুরঘাটে স্টুডিও আছে একটা। কোনো অসুবিধা হবে না।
আপনি কালুরঘাটের ইঞ্জিনিয়ারদের ফোন করে এখনই বলে দেন যে আমরা যাচ্ছি। আমাদের যেন সহযোগিতা করে।
আচ্ছা। বলে দিচ্ছি।
যাক। অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। বেলাল মোহাম্মদ, ফারুক, সন্দ্বীপ উঠলেন।
দীর্ঘ করিডর। তাঁদের পায়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে নিজেদেরই কানে। তাঁরা চমকে চমকে উঠছেন।
কিন্তু আরও চমকে উঠলেন নারীকণ্ঠ শুনে। তাকিয়ে দেখতে পেলেন। অনুষ্ঠান ঘোষিকা হোসনে আরাকে। তার সঙ্গে আরেকজন ভদ্রলোক। হোসনে আরা বললেন, উনি আমার চাচা। ওনার নাম ডা. আনোয়ার আলী। আওয়ামী লীগের কর্মী।
আনোয়ার আলী বললেন, আপনারা বেতার চালু করবেন। প্রচার করবেন কী? এই নিন।
তিনি এগিয়ে দিলে একটা সাইক্লোস্টাইল করা কাগজ। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বর্বর পাকিস্তানি আর্মি অকস্মাৎ পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ করেছে…স্বাক্ষর শেখ মুজিবুর রহমান…
.
কাগজটা পেয়ে বেলাল মোহাম্মদ পড়তে লাগলেন। তাঁর শরীরে আগুনের পরশমণির ছোঁয়া লাগল যেন। থ্যাংক ইউ ডাক্তার সাহেব। এটাই হবে আমাদের প্রথম ঘোষণা।
মাহবুব হাসান বললেন, চলেন ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায় যাই। লিখিত অর্ডারটা নিয়ে আসি।
তাঁরা গেলেন মির্জা নাসিরের কাছে। তিনি ফোন করে অর্ডার দিলেন কালুরঘাটকে। হ্যালো, ট্রান্সমিটার চালু করেন…বেলাল মোহাম্মদ সাহেবরা যাচ্ছেন…
ফোন রেখে তিনি বললেন, আপনারা ইপিআর জওয়ান নিয়ে যান। এমন ভাব করবেন যেন ভবিষ্যতে ওরা বলতে পারে বন্দুকের মুখে ওদের কাজটা করতে হয়েছিল। ভবিষ্যতে কী হবে কেউ কি বলতে পারে বলেন…।
.
ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এসে দেখেন জিপ নেই। এখন উপায়?
এগিয়ে এলেন ডাক্তার আলী। বললেন, আমার সঙ্গে পিকআপ আছে। সেটা নিয়ে যাই চলেন।
ডাক্তার আনোয়ার আলী গাড়িটা পেয়েছেন ওয়াপদার ইঞ্জিনিয়ার আশিকুল ইসলামের কাছ থেকে। গাড়ির নম্বর চট্টগ্রাম ট ৯৬১৫। বিদ্রোহী ইপিআর সদস্য আর সেনাদের জন্য খাবার রসদ সরবরাহ আর আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সকাল থেকেই চট্টগ্রামের আপামর জনগণ তৎপর হয়ে উঠেছে। সকালবেলা জনতার ভিড়ের মধ্যেই হকার টেলিগ্রাম বিলি করছিল, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা, বাংলাদেশ স্বাধীন…তিনি গাড়ি থামিয়ে সেই টেলিগ্রামের একটা সঙ্গে নিয়েছিলেন।
গাড়ি নিয়ে তারা ছুটছেন কালুরঘাটের দিকে। পথে গাড়ি আটকালেন একজন। তার মাথার চুল এলোমেলো। পাঞ্জাবি ময়লা। বয়স্ক এই মানুষটাকে চট্টগ্রামের সবাই চেনে। কবি আবদুস সালাম। তিনি বলতে লাগলেন, নাতি, আমি একটা কথিকা লিখছি। এইটা প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারবা?
পারব। আপনি ওঠেন গাড়িতে।
.
দুই ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খান আর দেলোয়ার একটা রিকশায়, তারা ট্রান্সমিশন অফিস ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ব্রেক ব্রেক। টায়ারে শব্দ তুলে জিপ থামল। বেলাল। মোহাম্মদ লাফ দিয়ে নেমে রিকশার সামনে দাঁড়ালেন। কই যান?
ভাই আমাদের মাফ করে দেন। আমরা পারব না।
পারবেন না মানে। আপনাদের না আরই ফোন করলেন?
তিনি আবার ফোন করেছেন। বলেছেন, যদি বেতার চালু করতে চাও, নিজ দায়িত্বে করো। আমি দায়িত্ব নিতে পারব না।
আপনাদের তো যাওয়া চলবে না। আপনাদের আমরা জোর করে আটকে রাখব।
ডা. আলী বললেন, আপনারা দাঁড়ান। আমি ব্যবস্থা করছি।
তিনি গাড়ি ঘোরালেন। গাড়ি ছোটালেন রেলওয়ে পাহাড়ের দিকে। ক্যাপ্টেন রফিককে লাগবে। এখনই কয়েকজন জওয়ান নিয়ে আসতে হবে। তিনি নিজের গাড়িতে করে কয়েকজন ইপিআর সদস্যকে নিয়ে এলেন। এরপর দুই ইঞ্জিনিয়ার গেলেন ট্রান্সমিটার ভবনে।
ট্রান্সমিটার ভবনের অফিসকক্ষে বসলেন বেলাল মোহাম্মদরা। কাগজ কলম নিলেন। বেলাল মোহাম্মদ লিখলেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
সন্দ্বীপ বললেন, বেলাল ভাই, বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র দেন। বিপ্লবটা থাকুক।
