.
ব্যাঙ্গমা বলল, ক্যাপ্টেন রফিক লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বা আ টেল অব মিলিয়নস বইতে ২৫ মার্চ রাতে তাঁর বিদ্রোহের এবং ওই রাতের চট্টগ্রাম ঘটনার বিবরণ লেইখা রাখছেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, হ লেখা আছে তার বইয়ে। সেই কথায় আমরা পরে যাই। ওইটা আগের রাইতের ঘটনা। অহন আমরা ২৬ মার্চ রেলওয়ে পাহাড়ে রফিকের লগে মমতাজউদ্দীন, বেলাল মোহাম্মদ, ফারুক আর সন্দ্বীপের বাতচিতে আছি।
.
মমতাজউদ্দীন বললেন, ক্যাপ্টেন সাহেব। আসল লোক এসে গেছেন।
ক্যাপ্টেন রফিকের পাতলা ঠোঁট, পাতলা নাক, ছোট করে ছাঁটা চুল মাকড়সার হালকা জালের মতো রেশম কোমল, তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোয়ালে দৃঢ়তা, চোখে আশা আর প্রতিজ্ঞার ঝিলিক। তিনি বললেন, আসল লোক মানে?
মমতাজউদ্দীন দিগন্তবিস্তারী হাসি ফুটিয়ে বললেন, রেডিওর লোক। রেডিও সেন্টার চালাবে। জয় বাংলা রেডিও।
ক্যাপ্টেন রফিক বললেন, রাইট স্যার। রেডিও, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করার জন্য আমি আমার সৈন্যদের অলরেডি রাতের বেলাতেই পাঠিয়ে দিয়েছি।
বেলাল মোহাম্মদ বললেন, শুধু আগ্রাবাদ পাহারা দিলে হবে না। কালুরঘাটে ট্রান্সমিটার। সেখানেও পাহারা লাগবে।
রফিক বললেন, ২০ জন জওয়ান থাকবে আগ্রাবাদে, ১৫ জন। কালুরঘাটে। আপনারা যান। আমি এক ঘণ্টার মধ্যে সব ব্যবস্থা করছি।
মমতাজউদ্দীন বললেন, শাবাশ ক্যাপ্টেন। আপনি আমাদের স্বাধীনতার বীর সৈনিক। আপনার অবদান আমাদের ইতিহাসে সোনার আখরে লেখা থাকবে। বেলাল ভাই, চলুন যাওয়া যাক পরের অভিযানে। ফরোয়ার্ড মার্চ।
বেলাল মোহাম্মদ, মমতাজউদ্দীন, ফারুক, সন্দ্বীপ উঠে বসলেন জিপে। জিপ চলছে। চুল উড়ছে। পাঞ্জাবির প্রান্ত উড়ছে। কিন্তু বেলাল মোহাম্মদ জানেন, আসল কাজটা প্রকৌশলীদের। টেকনিক্যাল কাজ। ইঞ্জিনিয়ারদের সহযোগিতা না পেলে চলবে না।
ইঞ্জিনিয়ারদের কারও বাড়ির ঠিকানা বেলালের জানা নেই। একজন আছেন, মাহবুব হাসান, চুক্তিভিত্তিক কর্মী, কারিগরি কাজ নিজে নিজে শিখে নিয়েছেন, তাঁর কাছে যাওয়া যায়। তার মাধ্যমে অন্য ইঞ্জিনিয়ারদের খোঁজও মিলে যেতে পারে।
গাড়ি গিয়ে মাহবুবের বাড়িতে থামে। রাবেয়া খাতুন লেনে গাড়ি রেখে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই দেখা গেল মাহবুব বা হাতে দরজা খুলছেন, ডান হাতে তার ভাত, আসেন বেলাল ভাই, ভাত খান।
সঙ্গে ছিলেন মমতাজউদ্দীন, তিনি বললেন, খেলে তো ভায়া বেলাল একা খাবে না, মমতাজউদ্দীনও অনাহারী, দুপুরে ভাত খেতে অপছন্দ করে না।
ভাত ঝটপট খেয়ে নিলেন তিনজনই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তারপর গাড়ি যেতে লাগল একেকজন প্রকৌশলীর বাসায়।
দুজন প্রকৌশলী মোসলেম খান আর দেলওয়ার হোসেনকে জিপে তুলে তারা ছুটলেন কালুরঘাটের দিকে। কালুরঘাট ট্রান্সমিটার অন করা হলো। ইঞ্জিনিয়ার দুজনকে রেখে মাহবুব হাসান, মমতাজউদ্দীন আহমদ, বেলাল এবার ছুটলেন আগ্রাবাদের দিকে। পথে মমতাজউদ্দীন নেমে গেলেন–সারা রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে একে তো তিনি ধ্বস্ত, তার মধ্যে তাঁর মাথায় এসেছে একটা স্ক্রিপ্টের প্লট। রেডিও খুললেই তো হবে না। তাতে প্রচারের জন্য ম্যাটেরিয়াল দিতে হবে।
গাড়ি ছুটছে। বাতাসে রোদের গন্ধ। বাতাসে লাশের গন্ধ। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে হাজারের বেশি বাঙালি সৈন্য এবং তাদের পরিবার পরিজনকে হত্যা করেছে ২০ বালুচ বেঙ্গলের সৈন্যরা।
আগ্রাবাদে পথে পথে ব্যারিকেড। পাকিস্তানি অস্ত্রসমেত জাহাজ এসেছে বন্দরে। সোয়াত। খবর পেয়ে বন্দর অভিমুখী সড়কে বাঙালিরা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। অস্ত্র খালাস করতে দেবে না তারা। পিচের ড্রাম এনে রাখা হয়েছে, ইট, কাঠ, পাথর, পানির ট্যাংক, গাছের গুঁড়ি–ব্যারিকেডের স্তূপগুলো বৈচিত্র্যপূর্ণ। পিচের ড্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে, পিচপোড়া গন্ধ, ধোয়া, আগুনে রাস্তা দিয়ে চলাও মুশকিল।
বাদামতলী ব্যারিকেডে গাড়ি রেখে দৌড়ে আগ্রাবাদ বেতারকেন্দ্রে গেলেন বেলাল আর মাহবুব। বেতার ভবনের গেটে কোনো প্রহরা নেই…পুরো এলাকাটা পোড়োবাড়ির মতো নির্জন। তারা সেই ভুতুড়ে বাতি না জ্বালানো ভবনে ঢুকে খুঁজে পেতে সুইচ অন করে বাতি জ্বালালেন। প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষের দরজা খুললেন।
ফোন বেজে উঠল। কালুরঘাট থেকে ফোন। দুই ইঞ্জিনিয়ার চলে যেতে চান। আঞ্চলিক পরিচালক, আঞ্চলিক প্রকৌশলী অর্ডার না দিলে তারা ট্রান্সমিটার অন করতে পারেন না।
বেলাল মোহাম্মদ বললেন, ওয়েট। আপনারা দশ মিনিটের মধ্যে অর্ডার পেয়ে যাবেন ওনাদের কাছ থেকে।
ভাই মৌখিক অনুমতিতে হবে না। লিখিত অর্ডার লাগবে।
আচ্ছা তা-ই আনছি।
বললেন বটে, কিন্তু আঞ্চলিক পরিচালকই-বা কোথায় আর ইঞ্জিনিয়ারই বা কোথায়। ফোন করলেন আঞ্চলিক প্রকৌশলী মির্জা নাসিরউদ্দীনকে।
হ্যালো আমি বেলাল মোহাম্মদ বলছি। আপনার কাছে আসছি। আপনি লিখিত অর্ডার দেবেন। বেতার চালু করতে হবে।
ভাই আমাকে কেন বিপদে ফেলছেন। দুপুরে এম এ হান্নান সাহেব জোর করে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ট্রান্সমিটার চালু করেছেন। শেখ সাহেবের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে শোনালেন। এরপর তিনি তো চলে গেছেন। আমাদের চাকরি কি আর থাকবে? চাকরি যেমন-তেমন, বালবাচ্চাসহ নিজেরা বাঁচব তো!
কী বলেন। দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের প্রমোশন হবে।
