বেগম মুশতারী শফী শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে এই ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন।
বেলাল মোহাম্মদ বললেন, রেডিও বন্ধ। এটা কি ঠিক হচ্ছে?
ফারুক বললেন, আপনি যাননি, আমি যাইনি, খুলবে কে?
মুশতারী বললেন, খুললে কিন্তু ভালো হতো। আমরা সাতই মার্চের ভাষণ প্রচার করতে পারতাম। উদ্দীপনামূলক কথিকা পড়ে শোনাতে পারতাম।
সন্দ্বীপ বললেন, ঠিক বেলাল ভাই। চলেন সংগ্রাম পরিষদ অফিসে যাই।
তাই তো বেরিয়ে পড়া সংগ্রাম পরিষদ অফিসের দিকে।
রেস্টহাউসের গেটে পাহারা তো রাখতেই হবে। শত্রুরা তো হামলা করতেই পারে। তাই বলে এই তিনজন জয় বাংলার লোককে ঢুকতে দেবে না, এ-ও কি হয়।
অনেক দেনদরবারের পর শুধু বেলাল মোহাম্মদ ঢুকতে পারলেন রেস্টহাউসের ভেতরে। বারান্দায় লোকে গিজগিজ করছে। একজন একটা সাইক্লোস্টাইল কাগজ থেকে ইংরেজিতে পড়ে শোনালেন বঙ্গবন্ধুর বার্তা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলেন বেলাল। তার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল।
একজন সেটা আবার বাংলা অনুবাদ করে পড়ে শোনাচ্ছেন। তাঁর গলার রগ ফুলে ফুলে উঠছে।
বেলাল এই উত্তেজিত সদা ব্যস্ত নেতা-কর্মীদের কাউকে যে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে নিজের মনের কথাটা পাড়বেন, সে উপায় নেই! প্রত্যেকেই ব্যস্ত। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, রাস্তা দখল রাখতে হবে, আর্মিকে ক্যান্টনমেন্টে আটকে রাখতে হবে, কাজ কি কম!
সামনে পাওয়া গেল অ্যাডভোকেট রফিককে।
রফিক ভাই, বেলাল মোহাম্মদ বললেন।
জি বলেন।
একটা খুব জরুরি কথা আছে।
জি বলেন।
আমাকে কয়েকজন লড়াকু কর্মী দেন। হাতে লাঠিসোটা আর যা যা। আছে, তা-ই নিয়ে তারা চলুক আমার সঙ্গে। আমরা বেতার দখল করব। আগ্রাবাদ বেতার ভবন আর কালুরঘাট ট্রান্সমিটার দখল করে রাখতে হবে। আমরা বেতারে আমাদের প্রোগ্রাম প্রচার করতে পারব। বঙ্গবন্ধুর মেসেজটা তো রেডিওতে প্রচার করা দরকার।
অ্যাডভোকেট রফিক একে ডাকলেন, ওকে ডাকলেন। কেউ কোনো কথা শুনতে চাইছে না। সবাই দেশ স্বাধীন করবে। সবার অনেক কাজ।
বেলাল মোহাম্মদের চোখেমুখে হতাশা। বারান্দায় হঠাৎ করে চৈতালি বাতাস বইল, তার কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম শুকিয়ে নিয়ে আরামের স্পর্শ দিল, তিনি বারান্দার ভিড় ঠেলে নিচে নামছেন, এই সময় বসন্তের বাতাসের মতোই দমক দিয়ে সামনে দাঁড়ালেন মমতাজউদ্দীন আহমদ। শিক্ষক এবং আন্দোলনরত বুদ্ধিজীবী। দিন দশেক আগে লালদীঘি ময়দানে তিনি নাটক মঞ্চস্থ করেছেন–এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
আরে বেলাল ভাই।
মমতাজ ভাই। শোনেন। একটা কাজের কাজ করার আছে। কাউকে পাচ্ছি না যাকে বলব। হেল্প পাব। চট্টগ্রাম রেডিও বন্ধ আছে। আমরা সেটা। দখল করে আমাদের প্রোগ্রাম চালু করতে পারি।
তাই তো। আমি তো আমাদের বেতারের জন্য প্রোগ্রাম লিখতে পারি। কথিকা পড়তে পারি। টক দিতে পারি। দারুণ আইডিয়া।
কিন্তু একটা সমস্যা আছে। আমরা প্রোগ্রাম করা শুরু করামাত্রই আর্মি অ্যাটাক হতে পারে। এটা আমাদের পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। লাঠি হাতে গোটা কুড়ি কর্মী যদি পাওয়া যেত।
মমতাজউদ্দীন হাসতে লাগলেন। চন্দ্রাহত মানুষের হাসি। তার চোখ এই জগতে নেই, তার দৃষ্টি ওই দূরে মেঘলা আকাশের মেঘের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। তাঁর চোখ গনগনে লাল, বোঝাই যাচ্ছে তিনি সারা রাত ঘুমাননি। তিনি বললেন, লাঠি দিয়ে তো বেতারকেন্দ্র পাহারা দেওয়া যাবে না। অস্ত্র লাগবে। সৈন্য লাগবে! সশস্ত্র সৈনিক!
বেলাল বললেন, কিন্তু আমরা সশস্ত্র সৈনিক কোথায় পাব?
হা হা হা। মমতাজউদ্দীন আবার হাসলেন, ঘটনা ঘটে গেছে। লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন রফিক, বেলাল ভাই, ক্যাপ্টেন রফিক। ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক মুভ করেছেন। পাঞ্জাবিদের সব বন্দী করেছেন। ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। আপনি কোনো খবরই রাখেন না। উই হ্যাভ আওয়ার আর্মি নাউ। উইথ আর্মস। রফিক ইজ দ্য ম্যান। এখন ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি সৈন্য অফিসাররাও বিদ্রোহ করছে। আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছে। চলুন, বেলাল ভাই, আমরা ক্যাপ্টেন রফিকের কাছে যাই। রেলওয়ে পাহাড়ে আছেন তিনি।
যাব তো বটেই। কিন্তু যাব কীভাবে? সময় নষ্ট করা যাবে না।
আবারও হাসলেন মমতাজউদ্দীন। হালকা-পাতলা মানুষ, টিপিক্যাল বাঙালি চেহারা, নাকের নিচে চার্লি চাপলিন গোঁফ, চোখ দুটো বুদ্ধির দীপ্তিতে জ্বলজ্বলে। তিনি বললেন, আমার নাম মমতাজউদ্দীন, যেখানে উপায় নেই, সেখানেই গোলাম হোসেনকে দিয়ে আমি উপায় বের করে থাকি। বাইরে একটা জিপ দেখা যাচ্ছে। ওই জিপটা ওই যে সাদা-পাকা সাহেব, ওঁর। সাদা-পাকা সাহেব, কাম হিয়ার প্লিজ। আমাদের রক্ত দিন, আমি আপনাদের স্বাধীনতা দিব। কে বলেছেন? নেতাজি সুভাষ বসু। সাদা-পাকা সাহেব, আপনি এবার আপনার জিপটা দিন, আমি আপনাদেরকে স্বাধীনতার রেডিও দেব। বুঝলেন তো। কুইক। ড্রাইভারকে ডাকুন। বলুন, জিপটা আমাদের কথামতো তেজি ঘোড়ার মতো চলবে।
জিপ জোগাড় হলো। চার আরোহী–মমতাজ, বেলাল, ফারুক, সন্দ্বীপ ছুটে চলেছেন ক্যাপ্টেন রফিকের উদ্দেশে, রেলওয়ে পাহাড়ে।
ক্যাপ্টেন রফিককে পাওয়া গেল। ভীষণ ব্যস্ত তিনি। নিজে তো বিদ্রোহ করেছেনই, সেনাবাহিনীর ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের বাঙালি সৈন্য ও অফিসারদের সঙ্গে সমন্বয় করা, তাদের সঠিক তথ্য দেওয়া, তাদের বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করা আর বালুচ রেজিমেন্টের আক্রমণ থেকে বাঙালি সৈন্যদের বাঁচানোর চেষ্টা করার কঠিন কঠিন সব কাজে তাকে ব্যস্ততার অধিক ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
