.
ব্যাঙ্গমা বলে, এম এ হান্নান আছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
ব্যাঙ্গমি বলে, তিনি আলফা ইনস্যুরেন্সের ম্যানেজারও আছিলেন। কাজেই শেখ সাহেবের লগে যে তার খাতির খুবই আছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ব্যাঙ্গমা বলে, ২৫ মার্চ রাতে, সাড়ে ১১টার দিকে, চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর বাড়ির ফোন বাইজা উঠে। ক্রিং ক্রিং। ফোন ধরলেন ডা. নুরুন্নাহার জহুর। জহুর সাহেবের ওয়াইফ। মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী।
ব্যাঙ্গমি বলে, নুরুন্নাহার ফোন ধরলে উল্টা পাশ থাইকা কয়, একটা মেসেজ আছে। লেইখা নেন। নুরুন্নাহার ছেলেরে কন, কাগজ-কলম দ্যাও তো। ছেলে কাগজ-কলম আগায়া দেয়। ডাক্তারের বাড়িতে ওষুধ কোম্পানির দেওয়া কাগজ আর একটা পেটে কালি ভরা ঝরনা কলম তৈরিই আছিল।
নুরুন্নাহার কাগজ-কলম লইয়া লেখতে থাকেন : মেসেজ টু দ্য পিপল অব দ্য বাংলাদেশ অ্যান্ড পিপল অব দ্য ওয়ার্ল্ড। পাক আর্মি সাডেনলি অ্যাটাকড…
ব্যাঙ্গমি বলে, ২৬ তারিখ সকালবেলা আন্দরকিল্লায় আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ভিড়। গোলাগুলির আওয়াজ রাত থাইকাই আসতাছে। জনতা রাস্তা ছাড়তাছে না। সেই ভিড়ের মধ্যে হকার চিল্লাইতাছে, টেলিগ্রাম টেলিগ্রাম টেলিগ্রাম, ঢাকা শহরত এক লাখ লোক মারি ফেলিয়ে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করি দিয়ে…
ব্যাঙ্গমা বলে, দুপুরে এম এ হান্নান সংগ্রাম পরিষদের লোকজনরে লইয়া গেলেন চট্টগ্রাম রেডিওর রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ার মির্জা নাসিরউদ্দীনের বাসায়। তারা মির্জারে কইলেন, চলেন, রেডিও ট্রান্সমিটার অন করতে হইব। মির্জা কয়, মাথা খারাপ। আমি তো রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ার। ট্রান্সমিশন অন করতে হইলে রিজিওনাল ডাইরেক্টরের অর্ডার লাগব।
তারে আমরা পামু কই। চলেন।
তিনি বলেন, আমারে বিপদে ফেলবেন না ভাই।
জনতার ভিড় হইয়া গেছে মির্জা সাহেবের বাড়ির সামনে। নেতারা তারে ধমক দিলেন। ওই মিয়া আপনে উঠবেন না আমরা অ্যাকশনে যামু? মির্জার বউ-বাচ্চারা কানতে লাগল। একরকম জোর কইরাই তারে ধইরা তোলা হইল গাড়িতে। নেওয়া হইল রেডিও স্টেশনে। সম্প্রচার যন্ত্র চালু কইরা আবদুল। হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা পইড়া শুনাইলেন। রেডিওতে প্রচার হইল। চট্টগ্রাম আর তার আশপাশের এলাকার মানুষজন শুনতে পাইল।
পরের দিন সারা দুনিয়ার কাগজে বাইর হইল, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হইল : শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে সিভিল ওয়ার শুরু হইয়া গেছে।
১৩
২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম স্টেশন রোডের রেস্টহাউসের বাইরে লাঠিধারী কড়া প্রহরা, তিনজন রেডিও কর্মীকে তাঁরা কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে দেবেন না। সংগ্রাম পরিষদের অফিস। ভেতরে আছেন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী। আগের রাতে তার বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর বার্তা। এসেছে, রাতেই তা সাইক্লোস্টাইল করে বিলি করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ভেতরে রেস্টহাউসের বারান্দায় গিজগিজ করছে মানুষ, খবর এসেছে, ইপিআর বিদ্রোহ করেছে; বাঙালি সৈন্যরা বিদ্রোহ করছে চারদিকে, দেশের এখানে-ওখানে, বীর চট্টগ্রামবাসী লাঠি, সড়কি, বন্দুক, পিস্তল–যা হাতের কাছে পাচ্ছে, তা-ই নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরোনোর পথ রুদ্ধ করে মানবদুর্গ রচনা করে বসে আছে। এই সময়ে তিনজন লোক এসেছেন–একজন বেলাল মোহাম্মদ-লম্বা, হালকা, পাঞ্জাবি পরা, পায়ে হাওয়াই চপ্পল, মানে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। কবিতা লেখেন, ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, উদাসীনতা তাঁর ঝাঁকড়া চুলে বসন্ত বাতাসে উড়ছে, পাঞ্জাবির বুকপকেটে কলমের কালির অসাবধান দাগ। তিনি কাজ করেন চট্টগ্রাম বেতারে, স্টাফ রাইটার। চুক্তিভিত্তিক চাকরি যদিও। আছেন আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি কলেজের সহ-অধ্যক্ষ। আছেন সদা তৎপর ভঙ্গি নিয়ে বেতারের নতুন প্রযোজক আবদুল্লাহ আল ফারুক। তার হাওয়াই শার্টের হাতা গোটানো। তিনি যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারেন, এমনকি দেশ স্বাধীন করতে বললে তিনি জিজ্ঞেস করবেন, এখনই করে ফেলব? জাস্ট কোত্থেকে শুরু করব, বলুন। সন্দ্বীপ দুই বছর ছিলেন বেলাল মোহাম্মদের বাসাতেই, ফটিকছড়ির চাকরির ফাঁকে প্রায়ই আসেন চট্টগ্রামে, থাকেন বেলাল মোহাম্মদের বাসায়। একজোড়া ঝোলানো ওড়ানো গোঁফ তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার মতো উড়িয়ে দিয়েছেন ঠোঁটের দুই পাশে। বেলাল মোহাম্মদ অসহযোগের দিনগুলোয় নিজের বাসায় তালা দিয়ে উঠেছেন ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর বাসা মুশতারী লজে। আগ্রাবাদের সরকারি কলোনির বাসা ফাঁকা, দারাপুত্ৰপরিবার। গ্রামের বাড়িতে কাটাচ্ছে অসহযোগের দিনগুলো। বেগম মুশতারী শফী মহিলাদের মাসিক পত্রিকা বান্ধবী সম্পাদনা করেন, জয় বাংলা বলে স্লোগান। দেন রাস্তায়, এক দফা এক দাবি বাংলার স্বাধীনতা বলে ছড়া লেখেন, আর সব অ্যাকটিভিস্টের জন্য নিজের বাড়ির মেঝেতে তোশক বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করেন, আবার হাঁড়ি ভরে ভাত রান্না করে রাখেন। সন্দ্বীপও সেই গণরুমের বাসিন্দা ও ফ্রি হোটেলের আহারী। ২৬ মার্চ সকালে সেই মেঝেতে বসে বেলাল রেডিওর নব ঘোরাচ্ছিলেন, আর ঢাকা কেন্দ্র থেকে শুনছিলেন উর্দুমিশ্রিত ফরমান, কিন্তু চট্টগ্রাম রেডিও সাড়াশব্দহীন। দরজায় বেল বাজল, কে এসেছে, দেখার জন্য বেলাল পা বাড়াতেই ঘরে ঢুকলেন আবদুল্লাহ ফারুক। বললেন, রেডিওতে যাচ্ছিলাম, রাস্তায় মিছিল, লোকজন সব লাঠিসোটা হাতে ক্যান্টনমেন্ট পাহারা দিয়ে রাখতে যাচ্ছে; ভাবলাম রেডিওতে না গিয়ে আপনার কাছেই আসি।
