আচ্ছা। ভালো করে ওয়াচ করেন। বাইনোকুলার কাজ করছে তো?
জি স্যার। স্যার আমরা কি আক্রমণ করব স্যার। আমরা বের হয়ে গিয়ে ওই বাড়ি উড়ায়া দিয়া আসতে পারি।
না না। তার প্রয়োজন দেখছি না।
.
এ আর মল্লিক সাহেব আর উপাচার্য থাকলেন না, সেই মুহূর্তে সেনা কমান্ডারের স্থান অধিকার কইরা লইলেন। কোথায় আক্রমণ করতে হইব, কোথায় প্রতিরক্ষা, সে নির্দেশও তিনি দিতে লাগলেন-ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি টিপ্পনী কাটল।
.
ভিসি বললেন, তোমরা বাড়ি থেকে বের হবে না।
স্যার গুলিতে সামনের রাস্তার ইলেকট্রিক লাইনের তার ছিঁড়ে গেল স্যার।
একটু পরে ওই বাড়ির সঙ্গে টেলিফোন লাইনও কেটে গেল।
আনিসুজ্জামান বেরিয়ে গেলেন উপাচার্যের কক্ষ থেকে। তাকে বাজারে যেতে হবে। বাসায় শিশু আছে। দুধ অন্তত কেনা দরকার।
তিনি গাড়ি নিয়ে গেলেন হাটহাজারী বাজারে। বাজারে বেশ ভিড়। সবাই কেনাকাটা নিয়েই ব্যস্ত। সবারই চোখেমুখে একটা অজানা শঙ্কার ছাপ যেন দেখা যাচ্ছে। কী হয় না হয়, অনিশ্চয়তার ছায়া। তবে যাকে বলে প্যানিক বায়িং, তা হচ্ছে না। কারণ, আজ মাসের মোটে ২৬, লোকের হাতে টাকাপয়সা তেমন নেই। শুক্রবার। ব্যাংক বন্ধ। শুধু গাড়িতে তেল ভর্তি করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, পেট্রল কম কম করে দেওয়া হচ্ছে।
বাজারে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন। খাকি ইউনিফর্ম পরা। আনিসুজ্জামানকে দেখে তারা সালাম দিলেন।
আনিসুজ্জামান বললেন, ঢাকার খবর শুনেছেন কিছু?
জি স্যার। কিছু কিছু শুনেছি।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হামলা করেছে, শুনেছেন?
জি স্যার শুনেছি। খুব চিন্তা হচ্ছে স্যার।
.
ভিসি চট্টগ্রাম শহর সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
এম এ হান্নান সাহেব ফোনে বললেন, ভিসি সাহেব, বঙ্গবন্ধুর মেসেজ আমরা পেয়েছি। এটা প্রচার করছি। এইখানে ডাকবাংলোতে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষকে মাইকে পড়ে শোনালাম।
ভিসি বললেন, মেসেজটা কী?
হান্নান সাহেব পড়তে লাগলেন :
Today Bangladesh is a sovereign and independent country. On Thursday night [March 25, 1971], West Pakistan armed forces suddenly attacked the police barracks at Razarbagh and the EPR headquarters at Pilkhana in Dhaka. Many innocent and unarmed have been killed in Dhaka city and other places of Bangladesh. Violent clashes between EPR and police on the one hand and the armed forces of Pakistan on the other are going on. The Bangalees are fighting the enemy with great courage for an independent Bangladesh. May Allah aid us in our fight for freedom. Joy Bangla.
ভিসি মন দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বার্তাটা শুনলেন।
.
আনিসুজ্জামান তাঁর বাসায় বাজার-সদাই নিয়ে ফিরলেন। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ঘুমে চোখ বুজে আসছে। কাল মোটামুটি সারা রাত নিঘুম গেছে। খেতে বসে পাঞ্জাবিতে ঝোল লেগে গেছে। বেবি সাবান-পানি এনে বললেন, একটু ভিজিয়ে দিই। তা না হলে হলুদের দাগ যাবে না।
আনিসুজ্জামান পাঞ্জাবি খুলে দিয়ে বললেন, ওই জায়গাটাই শুধু ভেজাও।
শরীরটা এলিয়ে পড়ছে। একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নেবেন নাকি, আনিসুজ্জামান ভাবছেন।
তোমাকে খুব টায়ার্ড দেখাচ্ছে। একটু শুয়ে রেস্ট নাও।
হুম।
বঙ্গবন্ধুর কোনো খবর জানতে পারলে?
না।
আমার কিন্তু খুব ভয় হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি করার সাহস তো ওদের হওয়ার কথা না।
আচ্ছা তুমি একটু শুয়ে চোখ বন্ধ করো।
আনিসুজ্জামান চোখ বন্ধ করলেন। মুহূর্তে ঘুম এসে তাকে নিয়ে গেল। স্বপ্নের জগতে। রুচি বলছে, শেখ মুজিব এসেছে, আসাদ আসে নাই?
ক্রিং ক্রিং। ফোন বেজে চলেছে। রুচিই ফোন ধরল, হ্যালো।
ড. আনিসুজ্জামান নেই?
আছেন।
একটু ডেকে দেওয়া যাবে।
আপনি কে বলছেন?
আমার নাম রফিকুল আনোয়ার।
ফোনের শব্দে আনিসুজ্জামানের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি উঠলেন। মেয়ে। বলছে, বাবা, তোমার ফোন।
কে?
রফিকুল আনোয়ার।
আনিসুজ্জামান তাকে চিনতে পারলেন সহজেই। ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, এখন সংগ্রাম পরিষদের নেতা।
হ্যালো।
স্যার সালাম আলায়কুম। স্যার একটা জরুরি মেসেজ আছে। কাগজ কলম নিয়ে লিখে নিন।
কিসের জরুরি মেসেজ।
বঙ্গবন্ধুর মেসেজ।
আচ্ছা। আমি লিখে নিচ্ছি। তুমি বলো।
ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর বার্তা পড়ে শোনালেন আনোয়ার। তারপর বললেন, স্যার, আপনি একটু যদি এটা তাড়াতাড়ি করে বাংলায় অনুবাদ করে দেন।
তারপর ক্যাম্পাসে বিলি করার ব্যবস্থা করেন।
আচ্ছা আমি করছি।
আনিসুজ্জামান কাগজ-কলম নিয়ে বার্তাটা অনুবাদ করলেন। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
পাঞ্জাবিটার একটা জায়গা ভেজা। সেইটাই পরে নিয়ে তিনি বের হলেন ঘর থেকে। তিনি তার অফিসে গেলেন।
এইটা সাইক্লোস্টাইল করা দরকার।
টাইপিস্ট ওখানেই ছিলেন। তিনি কাগজটা নিয়ে টাইপ করতে আরম্ভ করলেন।
তার অফিস সহকারীরা বলতে লাগল, এম এ হান্নান চট্টগ্রাম রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সি থেকে বঙ্গবন্ধুর এই মেসেজটা বাংলাতেই পড়েছেন। মাঝেমধ্যে এই ঘোষণা রেডিও থেকে শোনা যাচ্ছে। এটার নাম দিয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
আনিসুজ্জামান সহজে আবেগাপ্লুত হন না। কিন্তু তার শরীরে রোমাঞ্চ জাগছে। স্বাধীন বাংলা বেতার হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা পড়া হচ্ছে। তখন অপরাহু। সূর্যের আলো হেলে পড়ছে। মাঠে ঘূর্ণিবায়ুতে চৈত্রের ঝরাপাতা পাক খেতে খেতে আকাশে উড়ছে। এই বাংলাদেশ স্বাধীন হতে চলেছে। সংগ্রাম চলছে। সংগ্রাম ক্রমশ যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।
