এরই মধ্যে এল এই ফোন।
স্যার, আমি খোকন বলছি স্যার। আবদুল আলী খোকন?
হ্যাঁ। খোকন! বলো, কোনো খবর আছে?
জি স্যার। আছে স্যার। বলো। তুমি কোথায়?
স্যার। আমি সিআরবি পাহাড়ে স্যার।
হ্যাঁ। কী অবস্থা ওখানে!
অবস্থা স্যার ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন স্যার। কাল রাত থেকেই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে স্যার।
বলো কী?
স্যার। ক্যাপ্টেন রফিক সাহেব আমার সামনে আছেন। আপনি কথা বলেন স্যার। আমি দিচ্ছি স্যার।
আচ্ছা দাও।
ফোনে শোনা গেল ক্যাপ্টেন রফিকের কণ্ঠ, স্যার। সালাম আলায়কুম স্যার।
ওয়ালাইকুম আসোলাম।
স্যার আমি ক্যাপ্টেন রফিক স্যার।
জি। আনিসুজ্জামান বলছি।
স্যার আমরা ইপিআর গত রাত থেকেই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি স্যার। হালিশহরে পাকিস্তানি সবাইকে বন্দী করা হয়েছে। ইপিআরের নিয়ন্ত্রণ আমরা নিয়ে নিয়েছি। যুদ্ধ চলছে। আপনাকে ফোন করেছি এই কথা বলার জন্য, সবাইকে জানিয়ে দেন, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। মরব, কিন্তু লড়াই থামাব না। আমাদের লড়াই বিজয় অর্জিত না হওয়া। পর্যন্ত চলবে।
মুহূর্তে আনিসুজ্জামানের রক্ত যেন উষ্ণ হয়ে উঠল।
স্যার। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যান্টনমেন্টের ওপরে নজর রাখুন। কোনো কিছু দেখলে আমাদের জানাবেন। আলীকে জানালেই স্যার আমরা খবর পেয়ে যাব।
আচ্ছা। আমি অবশ্যই জানাব।
স্যার। আমি অনেক ব্যস্ত। এখন রাখি স্যার?
ঠিক আছে।
বেবি ঘুম থেকে উঠেছেন। আজিজও। তাঁরা আনিসুজ্জামানের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু নয়নে তাকিয়ে আছেন।
কী খবর? আজিজ জানতে চাইলেন।
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
বেবি তাড়াতাড়ি টেবিলে নাশতা সাজাতে লাগলেন। পাউরুটি, মাখন, ডিম, চা।
আজিজের মেয়েটা উঠে পড়েছে। রুবা তাকে নিয়ে আরেক ঘরে ব্যস্ত। বাচ্চাটা একবার কেঁদে উঠল।
আজিজ বললেন, দরকারি জিনিস কিন্তু কিনে রাখতে হবে। বিশেষ করে বাচ্চাদের দুধ। পরে আর কেনার সুযোগ না-ও পাওয়া যেতে পারে।
আনিসুজ্জামান রেডিওর নব ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, হ্যাঁ। দেখি একবার বাজারে যেতে হবে।
রেডিওতে সামরিক ফরমান শোনানো হচ্ছে। উর্দুঘেঁষা কণ্ঠের পাঠ। ফরমান এক। ফরমান দো। পরিস্থিতি যে ভয়াবহ, বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আবারও টেলিফোন এল। এবার উপাচার্যের অফিস থেকে। স্যার, ভিসি স্যার সালাম দিয়েছেন।
আচ্ছা আমি আসছি।
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আনিসুজ্জামান তাঁর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
বেবি বললেন, বঙ্গবন্ধু কেমন আছেন? কিছু জানতে পারলে?
না বেবি। নানা গুজব। আসলে কী ঘটছে, কে বলতে পারে?
.
গাড়ি পার্ক করে আনিসুজ্জামান ভিসির অফিস কক্ষে ঢুকলেন। বিশাল কক্ষ। বড় টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে অধ্যাপক করিম, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বসে আছেন। সালাম দিয়ে আনিসুজ্জামানও একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। ক্যাপ্টেন রফিকের খবরটা জানানো দরকার।
এরই মধ্যে অধ্যাপক আর আই চৌধুরী, মোহাম্মদ আলীও এসে গেছেন।
উপাচার্য এ আর মল্লিক বললেন, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এম এ হান্নান, এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সন্ধ্যার সময় এম আর সিদ্দিকীর কাছে বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন নির্দেশ এসেছে। তিনি বলেছেন, আলোচনা ফেইল করেছে। পাকিস্তানি আর্মি অ্যাটাক করছে। আস্ক বেঙ্গলি আর্মি, ইপিআর, পুলিশ নট টু সারেন্ডার অ্যান্ড গিভ আ কল টু পিপল টু গিভ রেজিস্ট্যান্স।
আনিসুজ্জামান বললেন, ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। সিআরবি পাহাড়ে আছেন তারা।
এ আর মল্লিক বললেন, হ্যাঁ। এম আর সিদ্দিকী সাহেব জানালেন। চট্টগ্রাম ডাকবাংলো, চট্টগ্রাম রেলওয়ে রেস্টহাউস সংগ্রাম পরিষদের হাতে।
আনিসুজ্জামান বললেন, ক্যাপ্টেন রফিক ক্যান্টনমেন্টের ওপর নজর রাখতে বলেছেন। কোনো মুভমেন্ট হলে তাঁকে জানাতে বলেছেন।
এ আর মল্লিক বললেন, আমাদের সিএসআইআরের কাছে। বাইনোকুলার আছে না?
থাকা উচিত। একজন বললেন। সায়েন্টিফিক রিসার্চ সেন্টার বলে কথা।
ক্রিং ক্রিং। উপাচার্যের ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোন ধরলেন।
ফোন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার সিদ্দিকী সাহেব, স্যার, আমার বাসায় ইপিআরের কয়েকজন সোলজার এসেছেন। সঙ্গে আরও কিছু সংগ্রাম কমিটির লোকজন।
কেন?
তারা বলছে, এই বাসা থেকে ক্যান্টনমেন্টের ওপরে নজর রাখতে সুবিধা হবে। আমাকে বাসা ছেড়ে দিতে বলে। কী করব?
বাঙালি?
জি। বাঙালি।
হাতে অস্ত্রশস্ত্র আছে?
জি আছে।
ইপিআরের ইউনিফর্ম আছে?
জি আছে।
আচ্ছা, তাহলে বাসা ছেড়ে দেন। আমরা বাইনোকুলার দিচ্ছি রিসার্চ সেন্টার থেকে।
স্যার, বাসা ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু ওদের খাওয়াদাওয়ার তো ব্যবস্থা করতে হবে।
আচ্ছা আমি দেখছি।
.
ভিসির কার্যালয় এই এলাকার সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটু পরে গোলাগুলির শব্দ। অধ্যাপকেরা সচকিত হলেন। ভিসি ফোন করলেন ট্রেজারার সিদ্দিকীর বাসার নম্বরে। ফোনে ওদের একজনকে পাওয়া গেল।
গোলাগুলির শব্দ কোত্থেকে আসছে?
আমাদের দিকেই বাইরে থেকে গুলি আসছে স্যার।
বাইরে মানে কোন দিক থেকে?
উল্টা দিকে কতগুলো পশ্চিম পাকিস্তানির বাড়ি আছে। কোনো একটা বাড়ি থেকে হবে স্যার।
