স্যার। আমি মুজিবুল হক স্যার। ফারুক খানের পিএসের কণ্ঠস্বর।
হ্যাঁ, মুজিব বলো!
স্যার। চট্টগ্রাম থেকে এইমাত্র ফোন এসেছে স্যার। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ঢাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
কে এই খবর দিয়েছে?
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি হান্নান সাহেব স্যার।
ইপিআরের ক্যাপ্টেন হারুনকে খবরটা দিয়েছ?
খবর নিয়ে লোক গেছে স্যার। একজন বাঙালি সুবেদারকে পাঠানো হয়েছে।
আচ্ছা।
আমরা কী করব স্যার?
তুমি আগের মতোই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ মনিটর করো। এরপর কিছু করতে হলে আমি বলব।
ফারুক খান ফোন রেখে দিলেন। এরপর কী করতে হবে, তিনি যদি জানতেন!
তাঁর স্ত্রী এরই মধ্যে বিছানায় উঠে বসেছেন। আরেকটা খাটে তার দুই সন্তান ঘুমুচ্ছে।
স্ত্রী বললেন, কার ফোন? কী বলল?
মুজিবুল ফোন করেছিল। শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
ঘড়ির কাঁটা তখন ১২টা পার হয়ে গেছে। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে গেছে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মতে। রেডিয়ামজ্বলা হাতঘড়ি তুলে নিয়ে দেখলেন ফারুক খান।
তাঁর স্ত্রী আর্তনাদ করে উঠলেন। তারপর আলো জ্বালিয়ে কোরআন শরিফ নিয়ে পড়তে শুরু করে দিলেন।
ফোনের শব্দ শুনে ফারুক খানের চাচাশ্বশুরও জেগে গেছেন। তিনিও জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর?
শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ঢাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
তাঁর কাছে টুপি ছিল না। তিনি অজু করে মাথায় একটা রুমাল বেঁধে নামাজে বসে গেলেন।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন গৃহপরিচারিকা। তিনি বুঝতে পারলেন মারাত্মক কিছু একটা ঘটে গেছে। তাঁর রোদন করা উচিত। তিনি সশব্দে কান্না জুড়ে দিলেন।
বাদশা মিয়া বলল, স্যার, আঁই কী করতাম?
তা বটে। এটা একটা প্রশ্ন বটে। এই বালক এখন কী করবে? ফারুক আজিজ খান বললেন, তুমি এক কাজ করো। জানালা দিয়ে ইপিআর ক্যাম্পটার দিকে নজর রাখো। মাথা অল্প তুলবে। যা দেখছ, আমাকে বলো।
.
ক্যাপ্টেন হারুনের কাছে খবর গেল। এম এ হান্নানের কল এসেছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এই এলাকার ইপিআরের তিনি সেকেন্ড ইন কমান্ড। প্রধান কমান্ডিং অফিসার মেজর পীর মোহাম্মদ একজন পাকিস্তানি। হারুন দ্রুত অ্যাকশনে গেলেন। বাঙালি জওয়ানদের নিয়ে পীর মোহাম্মদকে সবার আগে অ্যারেস্ট করে ফেললেন। এরপর আর যারা পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য ছিল, তাদের নিরস্ত্র করে বেঁধে একটা হলঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হলো।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, ঢাকা থাইকা অনেক দূরে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের খবর হইল এই।
ব্যাঙ্গমি বলে, সারা দেশের অনেক জায়গাতেই এই রকমের ঘটনা ঘটতে থাকে। থানায়, পোস্ট অফিসে, ইপিআরের ওয়্যারলেসে আসতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ। প্রতিরোধ করো। আজ থাইকা বাংলাদেশ স্বাধীন। বাঙালি সৈন্যরা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বিদ্রোহ করতে থাকে। বাঙালি ডিসি, এসপি, পুলিশ, আর্মি, ইপিআর, আনসার একযোগে নানান জেলায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন কায়েম করতে থাকে। তাগো নেতৃত্বে থাকে সংগ্রাম পরিষদ। লগে লাঠিসোটা, বল্লম, বন্দুক হাতে যোগ দেয় ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধুর মেসেজ ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় পৌঁছায়, বহু জায়গায় পৌঁছায় নাই। রাজারবাগে হামলা হইছে, পিলখানায় হামলা হইছে, অথবা স্থানীয় ক্যান্টনমেন্টে পশ্চিমারা বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতাছে, নানাভাবে খবর পাইয়া ২৫ মার্চ রাত থাইকাই বিভিন্ন জায়গায় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ, লড়াই, প্রতিরোধ শুরু হইয়া যায়। বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি ইপিআর, বাঙালি সৈন্য, বাঙালি পুলিশ, বাঙালি আনসার, বাঙালি অফিসাররা বিদ্রোহ কইরা প্রতিরোধযুদ্ধে শামিল হন।
একজন আরেকজনরে জানায়া দেয় ওয়্যারলেসে, আমরা বিদ্রোহ করতাছি। তোমরাও করো। আর অন্যদিকে পাকিস্তানি অফিসার সৈন্যরা বাঙালি অফিসার সৈন্যদের নিরস্ত্র কইরা গুলি কইরা মারতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হইয়া যায়। একটা অহিংস স্বাধীনতাসংগ্রাম বারুদের স্কুপে অগ্নিসংযোগ হওয়ামাত্র বিস্ফোরিত হইয়া মুক্তিযুদ্ধে উত্তীর্ণ হইয়া যায়।
১২
আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক। ৩৪-৩৫ বছর। বয়স। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরবেলা। তাঁর বাড়ির ফোন বেজে উঠল।
হ্যালো। তন্দ্রাজড়িত কণ্ঠে ফোন ধরলেন তিনি। রাতে দেরি করে ফিরেছেন। উপাচার্যের কার্যালয়ে ছিলেন প্রায় ভোররাত তিনটা-চারটা পর্যন্ত। ঢাকা থেকে নানা ধরনের খবর আসছে। ঢাকায় ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে। ঠিক কী ঘটেছে, তা জানার জন্য ঢাকার বিভিন্ন নম্বরে ফোন করেছেন তাঁরা। সব ফোনই প্রায় ছিল ব্যস্ত। কোনো লাইন পাওয়া যাচ্ছিল না। ইত্তেফাক অফিস, পূর্বদেশ অফিস পাওয়া গেল। জানা গেল, রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক বেরিয়েছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ১২টার পর টেলিফোন সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তারা তবু উপাচার্যের কক্ষে বসে রইলেন। যদি কিছু জানা যায়। আনিসুজ্জামান বাড়ি ফিরলেন ম্যালা রাতে।
বাড়িতে তাঁর স্ত্রী বেবি তো আছেনই, আছে দুই কন্যা সাড়ে ছয় বছরের রুচি আর দেড় বছরের শুচি। বেবির ভাই আজিজুল ওয়াহাব, তাঁর স্ত্রী রুবা, তাদের ছোট্ট একটা মেয়েও এসেছে মেহমান হিসেবে। সবার চোখেমুখেই উদ্বেগের ছায়া।
