খোকা বললেন, মগবাজারের গলিতে সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আলী সাহেবের ফ্ল্যাটবাড়ি। ওই সব ফ্ল্যাটে সব আমাদের লোকেরাই থাকে। ওইখানে ঢুকে পড়ি।
তা-ই করা হলো। ওই ফ্ল্যাটে থাকেন চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবীর, অভিনেতা আলী আহসান সিডনি–এই রকম বিখ্যাত মানুষেরা। ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়ার পর দেখা গেল মোরশেদ মাহমুদও পরিবার নিয়ে এখানেই উঠেছেন। উঠেছেন অভিনেতা আবুল খায়ের, যিনি ৭ মার্চের ভাষণ ধারণ ও প্রচার করেছিলেন। ৩২ নম্বরে তার আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত।
বেগম মুজিব এসেছেন, সবাই ভিড় করে এল দেখতে। ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, কে কার চেয়ে বেশি আদর-আপ্যায়ন করতে পারবেন।
একটা রেডিও চলে এল। এতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী রেডিও শোনা যাচ্ছে। চট্টগ্রামের নেতা হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধুর বার্তা পড়ে পড়ে শোনাচ্ছেন। ভালো করে শোনাও যায় না। শুধু বোঝা যায়, জয় বাংলা।
জয় বাংলা রেডিওর ঘোষণার উত্তেজনা, চট্টগ্রাম এখনো শত্রুমুক্ত, এসব খবরের মধ্যে আসতে লাগল মারাত্মক সব সংবাদ।
মোরশেদ মাহমুদের ভাই মাহমুদুর রহমান বেনু এলেন। ঘরের মধ্যে অনেক মানুষ। বেগম মুজিব আছেন, খোকা আছেন, মোরশেদ আছেন, আলমগীর কবীর আছেন। এক কোণে রেহানা, জামালও আছেন।
বেনু বললেন, মিলিটারিরা শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে লিখে রেখেছে, মসজিদ।
একজন বললেন, কী সর্বনাশ।
আলমগীর কবীর বললেন, প্রফেসর গোবিন্দচন্দ্র দেব নাকি জগন্নাথ হলের সামনে ছুটে গিয়েছিলেন। মিলিটারিদের বলছিলেন, এদের মেরো না। এরা সবাই হিন্দু। উনি হয়তো ভেবেছিলেন, মাইনরিটির কথা শুনলে মিলিটারিরা আর ছাত্রদের মারবে না। মাইনরিটিকে রক্ষা করা তো মেজরিটির পবিত্র কর্তব্য। কিন্তু তাতে কোনো কিছুই রক্ষা করা যায়নি। জি সি দেবকেও ওরা মেরে ফেলেছে। জগন্নাথ হলের ছাত্রদের বের করে মাঠে নিয়ে গিয়ে লাইন করে গুলি করে হত্যা করেছে।
বেনু বললেন, আগরতলা মামলার আসামি কমান্ডার মোয়াজ্জেমকে বাড়ি গিয়ে হত্যা করেছে। তাকে বলেছিল, বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা জিন্দাবাদ, এক দফা জিন্দাবাদ।
আরেকজন জানালেন, ইকবাল হলের ছাত্রদের তো মেরেছেই, কর্মচারীদেরও মেরেছে। ইকবাল হলের দারোয়ান মশারির নিচে স্ত্রীসহ মরে পড়ে আছে।
মধুদাকে মেরেছে। মধুদার বাড়ির সবাইকে গুলি করেছে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির আরও আরও টিচারকে মেরে ফেলেছে।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার অচেতন শরীর স্ট্যাটিসটিকসের প্রফেসর মনিরুজ্জামান আর ছেলেদের গুলিবিদ্ধ লাশের নিচে পড়ে ছিল। দুই রাত বাড়িতে রেখে তার ফ্যামিলি নাকি তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠাতে পেরেছে। মনে হয়, তিনিও বাঁচবেন না।
জগন্নাথের সহকারী টিউটর অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকেও মেরেছে।
১০ জনের মতো শিক্ষক, তাঁদের পরিবার-পরিজন, বহু কর্মচারী আর অসংখ্য ছাত্রকে মেরে ফেলেছে মিলিটারিরা। হামলা করেছে রোকেয়া হলেও।
.
আরও আরও হত্যা, মৃত্যু, আগুন, ধ্বংসের খবর উচ্চারিত হতে হতে একসময় সবাই চুপ হয়ে যায়।
পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে আসে। পুরো চরাচর যেন স্তব্ধ। কবরের নীরবতা নেমে এসেছে এই পৃথিবীতে আজ।
১১
৪১ বছর বয়সী ফারুক আজিজ খান মনোমুগ্ধকর পাহাড়-ঝরনা সরোবরশোভিত ছোট্ট শহর কাপ্তাইয়ের একটা চমৎকার কাঠের বাংলোয় ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। রাত এগারোটা। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে, পাহাড়ি গাছগাছড়ায় জোনাকির মেলা বসেছে, কুকুর এবং শিয়ালের ডাকও শোনা যাচ্ছে–এসবের সঙ্গে ফারুক খান আজ আড়াই বছর ধরেই অভ্যস্ত। ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারিয়েটের সহকারী বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টার পদ থেকে তাঁকে ১৯৬৮ সালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে, সুইডিশ-পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পরিচালক করে। দুই শিশুপুত্র আর স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ক্যাম্পাসের ভেতরে তাঁর ছবির মতো বাংলোটিতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এই বাড়িতে আরও আছে। বারো বছর বয়সের বাদশা মিয়া, ছোটখাটো কাজের তদারকি করে থাকে সে। আছেন ফারুক খানের চাচাশ্বশুর, এসেছেন পর্যটন এলাকায় বেড়াতে।
সবাই বিছানায় শুয়ে আছেন, যার যার মতো করে। আর আছেন একজন বয়স্ক গৃহপরিচারিকা।
ফারুক খান জানেন, যেকোনো সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করতে শুরু করে দেবে। গোটা মার্চই তো আগুনঝরানো। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এই শহরেও সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়েছে। রাজপথগুলো দিনের বেলা থাকে মানুষের মিছিলের পদভারে কম্পিত। মানুষের হাতে হাতে লাঠিসোটাসমেত নানা ধরনের প্রাগৈতিহাসিক অস্ত্র। ছাদে ছাদে বাংলাদেশের লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা। মিলিটারি শহরের বন্দুকের দোকানগুলো থেকে অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদ জব্দ করেছে।
যদি যুদ্ধ শুরুই হয়ে যায়, এই কাঠের তৈরি বাংলো, তাতে আবার কাঁচের অনেক জানালা, সেখানে কি আদৌ বেঁচে থাকা যাবে? ফারুক আজিজ খান ভাবছিলেন, আর তাঁর চোখের ঘুম উবে যাচ্ছিল।
ক্রিং ক্রিং। তীব্র শব্দে বেজে উঠল টেলিফোন।
তাঁর স্ত্রী মাথা তুললেন সবার আগে। কী হয়েছে? এত রাতে ফোন কেন?
ফারুক ফোনের রিসিভার তুললেন, বললেন, হ্যালো।
