হাসিনা মাদুরে বসতে পারছেন না। তাকে একটা টুল দেওয়া হয়েছে। হারিকেনের আলোয় তার মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। তিনি বললেন, আব্বা। ওয়্যারলেসে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী এবং এম আর সিদ্দিকীকে মেসেজ পাঠানোর ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
ওয়াজেদ মিয়া বললেন, হ্যাঁ। কামাল হোসেন সাহেবরা একটা ইংরেজি মেসেজ রেডি করছিলেন, আর সিরাজুল আলম খানদের সঙ্গেও উনি একটা বার্তা রেডি করে রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ওরাও বোধ হয় একটা ড্রাফট ওনাকে দিয়েছিলেন।
হাসিনা বললেন, একটা আশ্চর্য ঘটনা আছে জানো! আমরা একবার চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আজ থেকে বছর দশেক আগে হবে। ওখানকার আওয়ামী লীগ নেতা আজিজ সাহেব তো আব্বার খুব বন্ধু ছিলেন। আজিজ কাকার ছেলে মঞ্জু, মেয়ে বিলকিস, আমি, কামাল–আমরা খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা খুব বেড়াতাম জানো। প্রথমবার চট্টগ্রামে গেছি। পাহাড় দেখছি। পাহাড়ে উঠতাম। আমরা প্লেইন ল্যান্ডের মানুষ। পাহাড় আমাদের খুব টানে। পাহাড় দেখে আশ্চর্য হই। কীভাবে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। কীভাবে ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের ওপরে রাস্তা উঠে গেছে! আবার চট্টগ্রাম সম্পর্কে কত কাহিনি বইয়ে পড়েছি। কত কথা শুনেছি। কত ইতিহাস। এই চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন বিপ্লব করেছিলেন। প্রীতিলতা জীবন দিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের কাহিনি কত পড়েছি লুকিয়ে লুকিয়ে। এই সব বই পড়া তো নিষিদ্ধ। আজিজ কাকা আমাদের টাইগার পাস দেখাতে নিয়ে গেলেন। বললেন, দেখো মা, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ এখান থেকেই শুরু হবে। তারপর তিনি নিয়ে গেলেন কালুর ঘাট বেতার দেখাতে। চারদিক ফাঁকা। কেবল একটা বিল্ডিং। আজিজ কাকু বললেন, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা আমরা প্রচার করব এই বেতার থেকে।
ওয়াজেদ মিয়া বললেন, আজিজ সাহেব তো মারা গেছেন?
হ্যাঁ। ১৯৬৯-এ মারা গেছেন।
আশ্চর্য তো। তিনি কী করে এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারলেন?
পৃথিবীতে কত আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, চট্টগ্রামের পাহাড় থাইকাই আসলে স্বাধীনতার যুদ্ধ এক অর্থে শুরু হইছিল।
ব্যাঙ্গমি বলবে, ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক ২৪ মার্চেই রেলওয়ে বিল্ডিংয়ের পাহাড়ে তাঁর সদর দপ্তর স্থাপন করছিলেন।
.
ওয়াজেদ মিয়ার মনের মধ্যে দুই বিপরীত চিন্তা একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করল। শ্বশুর সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। বিশ্ববাসী সে খবর জেনে গেছে। এই ঘোষণা বাংলার মানুষকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে প্রেরণা জোগাবে। কিন্তু শ্বশুরসাহেবকে তো ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারিরা। তার বিচার করা হবে, ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আর ফিরবেন কি না, কে জানে? স্বাধীনতার মূল্য না জানি কত বেশি দিতে হয়!
