যারা মরে আছেন এই জলাভূমিতে, তাঁদের নামের তালিকা পাওয়া গেল রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে। হাতের লেখা রাও ফরমান আলীরই।
যারা মরে আছেন এই জলাভূমিতে, তাঁদের নামের তালিকা পাওয়া গেল রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে। হাতের লেখা রাও ফরমান আলীরই।
ইয়াহিয়া মদকন্দ্র কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, পূর্ব সেক্টরে যুদ্ধবিরতি হয়েছে বটে। তবে পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ চলবে।
ভারত একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে পশ্চিম সীমান্তে। ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীকে দেখাতে চান, তারা আগ্রাসন চালাননি, একটি জাতির ন্যায়সংগত সংগ্রামে পাশে থেকেছেন মাত্র।
শরণ সিং জাতিসংঘে বললেন, যেহেতু ঢাকা এখন স্বাধীন দেশের স্বাধীন রাজধানী, কাজেই আর যুদ্ধ করার কোনো মানে আমরা দেখছি না। আমরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলাম।
এক দিন পর ইয়াহিয়া বললেন, আমরা পশ্চিম সেক্টরেও যুদ্ধবিরতি মেনে নিচ্ছি।
.
আমেরিকায় কিসিঞ্জার ফোন করলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে।
হ্যালো।
হেনরি বলছি। কংগ্রাচুলেশনস, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনি পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করেছেন।
নিক্সন বললেন, আসলেই। তবে এই ক্রেডিট কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীকে। দেওয়া যাবে না। সে তো আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তারপর ফায়ার ব্রিগেডে খবর দিয়েছে।
কিসিঞ্জার বিজয় উদ্যাপন করছেন। ক্যাচ ধরার পর ক্রিকেটের ফিল্ডার যেমন করে, গোল দেওয়ার পর ফুটবলাররা যেমন করে দৌড় দেয়, দৌড়ে ফার্স্ট হয়ে দৌড়বিদ যেমন করে ভি চিহ্ন দেখায়, কিসিঞ্জার সারা দিন তা-ই করলেন। খবরের কাগজে ফোন করে করে বললেন, আমরা জিতে গেছি। আমাদের ঠিকভাবে ক্রেডিট দিয়ো। সহকর্মীদের মধ্যে যারা যারা তাঁকে সহায়তা করেছেন, তাঁদের ধন্যবাদ দিতে লাগলেন তিনি, তোমাকে ধন্যবাদ, এই বিজয়ে তোমার অবদান অনেক বেশি।
কিসিঞ্জার বাথরুমে গেলেন। তার ভয়ানক পেশাব পেয়েছে। আরাম করে জলবিয়োগ করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, ঠিক আরাম হচ্ছে না। পুরো পেশাব বেরোচ্ছে না।
ঢাকার পতনটা কি তাহলে পুরোপুরি আমেরিকার বিজয় হিসেবে গণ্য হবে? আমি বলতে চাইছি, ঢাকার পতনটা না হোক, অন্তত রাওয়ালপিন্ডিকে রক্ষা? আমরা না থাকলে ভারত এতক্ষণে পিন্ডিতে পতাকা ওড়াত আর আজাদ কাশ্মীর পুরোটাই দখল করে নিত।
তিনি পেশাবের শেষ সঞ্চয়টুকু ঢেলে দেবার কোশেশ করলেন। কিন্তু সফল হলেন না।
ঢাকা পতনের দুদিন পরের কথা। ইয়াহিয়া ঠিক করলেন, তিনি আইয়ুব মিলনায়তনে ভাষণ দেবেন সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে।
জুতার মালা নিয়ে অফিসাররা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
তবে জুতা মারলে কম মারা হবে। তাঁকে ছিঁড়েই ফেলবেন অফিসাররা।
ইয়াহিয়া আর গেলেন না সেনাকর্তাদের সামনে। গেলেন সেনাপ্রধান আবদুল হামিদ। অফিসাররা শিস দিলেন, দুয়ো দিলেন। টিটকারি করে, গালিগালাজ করে মিলনায়তন থেকে বের করে দিলেন তাঁকে।
ইয়াহিয়াকে আশ্রয় দেওয়া হলো মাংলা ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে যুদ্ধবন্দী সৈনিকদের স্ত্রীরা ঝাড়ু হাতে ঘিরে ধরল তার ঘর। সেখান থেকে চুপটি করে সরিয়ে তাঁকে রাখা হলো খারিয়ানের কাছে বান্নি বাংলা নামের এক জায়গায়।
রাতের বেলা সেখানে নেকড়ে ডাকে।
তার দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত এক পুলিশকর্তাকে তিনি বললেন, এ কোথায় এনে রাখলে আমাকে? রাতে তো নেকড়েরা ঘোরাফেরা করে।
পুলিশকর্তা বললেন, নেকড়েরাও একই কথা বলে। কাকে এনে রেখেছ এখানে। এ তো নেকড়ের চেয়েও ভয়ংকর এক লোক।
২০ ডিসেম্বর ভুট্টো হয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করা হয়েছে। ইয়াহিয়াকে মাঝেমধ্যেই নিয়ে যাওয়া হয় কমিশনের সামনে জবানবন্দি দিতে।
হেলিকপ্টারে যান তিনি।
তিনি তাঁর নিরাপত্তা কর্মকর্তা সরদার চৌধুরীকে বললেন, আমি হেলিকপ্টারে যাব না। আমাকে গাড়িতে নিয়ে যাও।
তা সম্ভব নয়।
কেন?
কারণ, রাস্তায় মানুষ আপনাকে দেখলে ছিঁড়ে ফেলবে। মেরে ফেলবে।
কেন? আমি কী করেছি?
কারণ, ঢাকার পতন। আমাদের সৈন্যরা ভারতে যুদ্ধবন্দী অবস্থায় আছে।
এ জন্য আমি দায়ী নই। এ জন্য দায়ী রাজনীতিবিদেরা।
জনগণ তা বোঝে না। ওরা মূর্খ।
আমি কি এখন গ্রেপ্তার অবস্থায় আছি?
না। আপনি নিরাপত্তা হেফাজতে আছেন।
তাহলে আমার নিরাপত্তার কথা আমাকে ভাবতে দাও। আমাকে নিয়ে চলো সড়কপথে। আমি রাওয়ালপিন্ডিতে আমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাব।
স্যার, আমি আপনাকে জনগণের রোষ থেকে রক্ষা করতে চাই।
কেন। আমি কি নিচু জাতের লোক? আমি কি কারও মাগির পাছায় খামচি দিয়েছি?
পুলিশকর্তা রেগে গেলেন। আচ্ছা চলুন, আপনাকে সড়কপথেই নিয়ে যাই।
গাড়ি চলছে। একটা লেভেল ক্রসিংয়ে রেলগাড়ি যাচ্ছে বলে গাড়ি থামল।
তখনই জনতা দেখে ফেলল যে গাড়িতে ইয়াহিয়া।
তারা ঢিল ছুঁড়তে লাগল। ঢিল এসে পড়ছে গাড়ির উইন্ডশিল্ডে। এখন কী হবে?
রেলগাড়ি চলে গেল। লেভেল ক্রসিংয়ের গেট খোলা হলো। গাড়ি জোরে চালিয়ে তারা সামনে যেতে লাগলেন। কিন্তু চারদিক থেকে জনতা এসে তাঁদের সামনে যা পেল তা-ই দিয়ে ঢিল ছুঁড়তে লাগল। কাঁচ গেল ভেঙে।
ইয়াহিয়া থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলেন।
তিনি প্যান্টের ভেতরে পেশাব করে দিলেন ভয়ে।
ভেজা প্যান্টের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, আমাকে কি একবার ফাঁকরার কাছে নিয়ে যাওয়া যায়? এই নারীটিকে আমি সারা জীবন শুধু কষ্টই দিয়েছি।
শেখ মুজিবের কাছে দিন আর রাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সোমবার আর মঙ্গলবার তিনি আলাদা করতে পারেন না। সপ্তাহ যাচ্ছে নাকি মাস, তিনি জানেন না। বাইরের জগতের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। গ্রীষ্মের দাবদাহ নেই, রাতে তীব্র শীত, তিনি শুধু এতটুকুনই বোঝেন। আর বোঝেন যে তার বাবুর্চি বাঙালি, সে তাকে ভাত বেঁধে দেয়, কখনো দেয় মুরগির ঝোল, কখনোবা মাছ। এই ভালো খাওয়ানোর কারণও স্পষ্ট। তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তার সেলের উল্টো দিকে একটা দড়িতে ফাসের চিহ্ন বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved