শেখ মুজিব মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।
হঠাৎই এক রাতে পাশের ছাদ থেকে ঢিল এবং গালিগালাজ বর্ষিত হতে লাগল। তিনি সেলের ভেতরেই রইলেন। বুঝলেন না ব্যাপার কী।
একটু পরে গুলির শব্দ। বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি হলো।
এরপর ছয়জন সশস্ত্র প্রহরী এসে দাঁড়াল তার সেলের আঙিনায়। তারা অস্ত্র উঁচিয়ে রইল।
তিনি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেন। সারাটা জীবন জেলে জেলে কাটিয়েছেন, জেলের ব্যাপার তিনি কিছু বোঝেন। তার সেলের সামনে আবার গর্ত খোঁড়া হয়েছে। আগে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর। পেতেন, যুদ্ধ বেধে গেছে। বিমান আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ট্রেঞ্চ। সাইরেন বাজত, বিমান আসত, আশপাশের ওয়ার্ডে, তার সেলের প্রহরীরাও ট্রেঞ্চে গিয়ে ঢুকত।
কিন্তু ইদানীং তিনি বুঝতে পারেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। এখন আর বিমানের শব্দ কিংবা সাইরেনের শব্দ শোনা যায় না। তাহলে কেন এই গর্ত?
এরা কয়েদিদের লেলিয়ে দিতে চাইছে তার বিরুদ্ধে। তারপর গুলি করে মেরে বলবে, জেলখানার ভেতরে বন্দিবিদ্রোহে মুজিব মারা গেছে। এদের তাকে ফাঁসিতে ঝোলাবার সাহসও কি নেই।
হইচই থেমে গেল। পাশের ওয়ার্ডের ছাদে সমবেত বন্দীরা বোধ করি চলে গেছে। খানিকটা নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যে একটা তক্ষক কোথাও ডেকে চলেছে।
মুজিব নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। বিছানায় একমাত্র কম্বলটার নিচে হাত-পা সেঁধিয়ে তিনি ঘুমানোর চেষ্টা করছেন।
গভীর রাতে দরজায় শব্দ হলো।
কে?
বাতি জ্বালালেন তিনি। দেখতে পেলেন, জেলের গভর্নর হাবিব আলীকে।
তাঁর ছোটখাটো শরীর, গোলাকার মুখ, চ্যাপ্টা নাক।
তিনি বললেন, আমি জেল গভর্নর হাবিব।
এত রাতে?
আমি আপনাকে নিতে এসেছি। আপনি আমাকে সহযোগিতা করুন।
কোথায় নেবে? আজ রাতেই কি আমার ফাঁসি হচ্ছে? হলে হবে। মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আজ রাতেই কি আমার ফাঁসি হচ্ছে তাহলে?
না।
দেখুন, আজ রাতে যদি আমার ফাঁসি হয়, তাহলে তা জানার অধিকার আমার আছে। আমি গোসল করব। অজু করব। একটুখানি কোরান শরিফ থেকে পড়ব।
না। ফাঁসি নয়। জেলের মধ্যে কয়েদিরা বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। তারা আপনার ওপরে ক্ষিপ্ত।
কেন?
কারণ পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ইন্ডিয়ানদের কাছে সারেন্ডার করেছে।
মুজিব হিসাব-নিকাশ কিছু বুঝছেন না। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
হাবিব বললেন, কথা বলার সময় এখন নেই। আপনাকে জেলের মধ্যে খুন করে ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে। আমি আপনাকে বাঁচাতে চাই। আমি আপনাকে জেলের বাইরে লুকিয়ে রাখব।
কোথায়?
আমার বাড়িতে। আপনি চুপ করে নিজেকে কম্বলে মুড়ে বেরিয়ে আসুন। আমরা একটা ট্রাকে উঠব।
মুজিব বুঝতে পারছেন না যে হাবিব আলী সত্য বলছে, নাকি তাঁকে কিছু লুকাচ্ছে। তিনি তার তামাক, পাইপ, ব্যক্তিগত জিনিসগুলো গোছাতে লাগলেন।
হাবিব বলল, টুথব্রাশ-রেজর এগুলো নিতে হবে না। বেঁচে থাকলে পরেও জোগাড় করা যাবে। আপনি চলুন।
তিনি হাবিবের কথায় আস্থা রাখলেন।
সশস্ত্র প্রহরীরা বন্দুক উঁচিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে চলল। তাঁকে জেলগেটের বাইরে আনা হলো। মুক্ত আকাশের নিচে এলেন মুজিব। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে তিনি জানেন না। তার মনের মধ্যে ঝড়। তার মনের মধ্যে তরঙ্গ। পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে ইন্ডিয়ান সৈন্যদের। কাছে? ঘটনা কী? কেন? আসল ব্যাপারটা কী?
সামনে একটা ট্রাক। হাবিব বললেন, এর পেছনে উঠে পড়ুন। আমিও উঠছি।
ট্রাকের মধ্যে অনেক খড়। সেই খড়ে হাবিব নিজে শুয়ে পড়লেন আর বললেন, দয়া করুন। আপনিও শুয়ে পড়ুন।
মুজিব খড়ের গাদায় শুয়ে পড়লেন। ট্রাক চলতে লাগল।
রাত অনেক। শীতের বাতাস এসে লাগছে গায়ে। ভাগ্যিস কম্বলটা এনেছিলেন। তা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখলেন মুজিব।
ঘন বনের ভেতর দিয়ে তারা যাচ্ছেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারে বোঝার চেষ্টা করলেন মুজিব। একসময় ট্রাক থামল। হাবিব বললেন, শেখ সাহেব, আমরা এখানে নামব। এরপর খানিকটা হাঁটতে হবে। ১০ মিনিটের মতো লাগবে।
মুজিব ট্রাকের পেছন থেকে নামলেন। হাবিবও নামলেন।
তারা হাঁটতে লাগলেন। সঙ্গে একজনমাত্র স্টেনগানধারী প্রহরী। বাকি। প্রহরীরা ফিরে গেল।
ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে।
বাংলোটা সুন্দর। সবচেয়ে বড় কথা, এটা একটা সরকারি কোয়ার্টার। এর বিছানা সুন্দর। বাথরুম সুন্দর। টেবিল-চেয়ার আসবাব সুন্দর।
মুজিবকে তাঁর ঘর দেখিয়ে হাবিব বললেন, আপনি এখানে আরাম করে ঘুমান।
মুজিব চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর জীবনে কী ঘটছে, তিনি কিছুই বুঝছেন না।
সকালবেলা তিনি বেগম হাবিব, তাঁর সন্তানদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে নাশতা করলেন।
হাবিব তাঁকে জানালেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। পাকিস্তানি মিলিটারি ইস্টার্ন সেক্টরে সারেন্ডার করেছে। ইন্ডিয়ান আর্মি বাংলাদেশে আছে। আপনি রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আর তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রী। তবে আল্লাহর কসম আপনি এই কথা কাউকে বলবেন না। আপনি এখনো বন্দী। বন্দীর সঙ্গে আমি এত কথা বলেছি, তা প্রকাশিত হলে আমার চাকরি তো থাকবেই না। আমার জীবনও চলে যাবে। আমার স্ত্রী আর সন্তানদের আপনি দেখলেন। তারা অনাথ হোক, এটা নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন না।
