হ্যাঁ।
আমরাও সব অস্ত্রের নাম শিইখা ফেলছি। দ্যাশ স্বাধীন হয়া গেছে। আর কোনো চিন্তা করি না। এখন জিনিসপাতির দাম কমব। আমরা দুইটা খাইয়া পইরা শান্তিতে ঘুমাইতে পারুম। তাই না ভাইজান।
জি।
খালি একটাই ভাবনা ভাইজান, শেখ সাহেব না ফিরলে দেশটারে সামলাইব কেমনে? ওনার লাইগা রোজা রাখছি।
জি দোয়া করবেন যেন উনি দেশে সুস্থভাবে ফিরতে পারেন।
একতলা বাসার সামনে এসে থামল বেবিট্যাক্সি। জামাল দেখলেন, বাড়ির সামনে ইন্ডিয়ান সৈন্য।
আপনার ভাড়া কত হয়েছে?
আপনার কাছ থাইকা ভাড়া নিমু না ভাইজান।
ক্যান? ভাড়া নিবেন না ক্যান?
আপনে মুক্তিযোদ্ধা। আপনারা দ্যাশের লাইগা প্রাণ দিতে গেছলেন। আমরা ঢাকা থাইকা কী করছি? মাঝেমধ্যে মুক্তিবাহিনীর লাইগা দুই-দশ টাকা চান্দা পাঠাইছি গোপনে। আর কিছু করি নাই। খালি দ্যাশের বাড়ি রাজাকাররা পোড়ায়া দিছে। বাড়ির মানুষ পালায়া চরে গিয়া বাঁচছে। বাঁচছে তো। আপনের কাছে ভাড়া নিমু না ভাইজান।
আপনি ভাড়া নিন। আপনার বাড়ি পুড়ে গেছে। লাগবে। নিন। কুড়ি টাকা জোর করে বেবিওয়ালার বুকপকেটে ঢুকিয়ে দিলেন জামাল। বেবিট্যাক্সির সামনে একটা বাংলাদেশের পতাকা লাগানো। বেবি চলে গেল।
এই বাড়ির পতাকাস্ট্যান্ডেও দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের পতাকা।
তখন দুপুর। পতাকার ছায়া ছোট্ট হয়ে পতাকাস্ট্যান্ডের নিচে মাটিতে পড়ে আছে।
ইন্ডিয়ান গার্ড আটকে দিল।
জামাল বললেন, আমি শেখ সাহেবের ছেলে। শেখ মুজিবুর রহমান আমার পিতা।
তারা তবু সন্দেহ করছে। শেষে তিনি বিএলএফের দেওয়া আইডি কার্ড বের করলেন। শেখ জামাল। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তারা স্যালুট করল।
জামাল গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন।
আলো থেকে ভেতরে যাওয়ায় প্রথমে চোখে খানিকটা অন্ধকার দেখলেন।
তারপর দেখলেন ওই যে মা, হাতে একটা জগ নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছেন।
মা…
জামাল, এসেছিস…
এমন একটা চিৎকার দিলেন রেনু যে হাসিনা, রেহানা ছুটে এলেন ডাইনিং, ড্রয়িং চত্বরে..
জামালকে পেয়ে রেনু জড়িয়ে ধরলেন। আর ছাড়েন না।
ছাড়ো, জয়কে দেখে আসি… জামাল মায়ের চোখের পানিতে ভেজা গাল মুছতে মুছতে বললেন।
হাসিনা, রেহানা কী করবেন বুঝতে পারছেন না। জামাল জয়কে কোলে নিলেন। হাসিনা সেই অবস্থায় জামালকে জড়িয়ে ধরলেন। আহা রে আমার ছোট ভাইটা। যুদ্ধের মাঠ থেকে এসেছে। লম্বা চুল। নাকের নিচে, গালে সদ্য ওঠা গোঁফ আর পাতলা দাড়ির আভাস। গায়ে বুনো গন্ধ।
তারা একবার হাসছেন, একবার কাঁদছেন।
জামাল ভাব করছেন তিনি বড় হয়ে গেছেন।
রাসেল জামালের অস্ত্রটা হাতে নিতে চাইল। জামাল বললেন, নাও। কাঁধে নাও। রাসেল বলল, জয় বাংলা।
জামাল একবার রেহানার কাছে গেলেন। চুপি চুপি বললেন, থ্যাংক ইউ কুট্টি বুনডি। ছোট বোন, তোকে ধন্যবাদ।
রেহানা তার ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন। এবার তার মনপ্রাণ খুলে কাঁদবার পালা। চুপি চুপি, মাকে, আপাকে না জানিয়ে, রেহানা তার প্যান্টের ভেতরে। গোপন পকেট বানিয়ে দিয়েছিলেন, তারপর দুজনের গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জামালের যুদ্ধে যাওয়া, ১৪ বছরের রেহানা সেই গোপন খবরটা তো বুকের মধ্যে অনেক দিন গোপন করে রেখেছিলেন, আর তার কী যে কান্না পেত। ভাইটার আমার যদি যুদ্ধের গোলা, বোমা, মাইন গ্রেনেডের মধ্যে কিছু হয়ে যায়! সে যদি ধরা পড়ে! আমার সেই ভাইটা, আমার পিঠোপিঠি সেই ভাইটা ফিরে এসেছে।
কানতেছ কেন?
তুই ফিরে এসেছিস! তুই যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছিস! কান্না মুছে রেহানা বললেন, কামাল ভাই কই? কবে আসবে?
কামাল ভাই সিলেট গেছলেন কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে। তারপর আর খবর জানি না!
.
বাড়িতে স্রোতের মতো লোকজন আসতে শুরু করল। ক্যামেরা নিয়ে। সাংবাদিকেরা আসতে লাগলেন। হুলুস্থুল পড়ে গেল।
১৮ ডিসেম্বর এলেন কাদের সিদ্দিকী। তাকেও রেনু জড়িয়ে ধরলেন। কান্নাকাটির পর রেনু বললেন, এবার তোমাদের মুজিব ভাইকে তোমরা ফিরিয়ে আনো।
কাদের সিদ্দিকী একটা জনসভা করবেন। তিনি বললেন, ভাবি, জামালকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাই।
রেনু হাসলেন। বললেন, ও কি আমাকে বলে যুদ্ধে গেছে? ওকেই জিজ্ঞেস করো ও যাবে কি না।
কাদের সিদ্দিকী বললেন, জামাল, যাবে আমার সঙ্গে?
জামাল একবাক্যে রাজি। তিনি চলে গেলেন জনসভায়। স্বাধীন দেশে ঢাকার প্রথম জনসভায় কাদের সিদ্দিকীর পাশে মঞ্চে রইলেন শেখ জামাল। পল্টন ময়দানে তখন লাখ দেড়েক মানুষ।
১১৯
ঢাকার মানুষেরা আস্তে আস্তে জানতে পারল, গত কয়েক দিন কী ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গেছে। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে গেছে কাদালেপা মাইক্রোবাস, নিয়ে গেছে মুখোশ-পরা আলবদররা, তারা সবাই চোখবাধা, পিঠমোড়া করে হাত বাঁধা পড়ে আছেন মিরপুর, মোহাম্মদপুরের জলাজংলার ভেতরে। লাশ পচে গেছে। কাউকে চেনা যাচ্ছে না। উন্মাদের মতো কাঁদছেন কবীর চৌধুরী, ভাই মুনীর চৌধুরীকে হারিয়ে, পাগলিনীর মতো ছুটছেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, স্বামী ডাক্তার আলীম চৌধুরীকে হারিয়ে, এক বছরের শিশু কোলে মাথা চাপড়াচ্ছেন পান্না কায়সার, শহীদুল্লা কায়সারের খবর নাই, শাহীন, জাহীদ, ফাহিম, ছোট ছোট ছেলেগুলো কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে ফেলল, তাদের আব্বা সিরাজউদ্দীন হোসেন যে আর আসেন না…
