অশোক ভেতরে গেলেন। সত্যি বাড়িতে কোনো ফার্নিচার নেই। দুটো চৌকি আছে মাত্র।
তিনি মাদুরে বসলেন। রেনু চা বানাতে লেগে পড়লেন। শেখ সাহেবের বড় মেয়ে সন্তান কোলে এসে দাঁড়ালেন। ছোট ভাই রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে এলেন ছোট মেয়ে রেহানা।
অশোকতারার ওয়্যারলেসে মেসেজ এল। শেখ সাহেবের বাড়ির নিরাপত্তা এনশিয়োর করার দায়িত্ব তোমার।
অশোকতারা ওয়্যারলেসে ফোর্স পাঠাতে বললেন। ভারতীয় সৈন্যরা এসে বেগম ফজিলাতুন্নেছার পরিবার যে বাড়িতে আশ্রিত, সেই বাড়ির চারপাশে অবস্থান নিল।
.
লোকেরা আসছে। ওয়াজেদ এলেন। জয়কে কোলে নিলেন। হাজি মোরশেদ এলেন। তাঁর দাড়ি-গোঁফ অনেক বড়। তাঁকে চেনাই যাচ্ছে না। তিনি বললেন তাঁকে ক্যান্টনমেন্টে কী অমানুষিক নির্যাতনই না করা হয়েছে মাসের পর মাস।
রেনু খোকাকে ডাকলেন, ভাইডি। গাড়িটা বের কর। সুফিয়া আপার বাড়ি যাব। রেহানা, তুই যাবি? সুফিয়া ফুফুর বাড়ি?
রেহানা বলল, যাব। দেশ মুক্ত, একটু বাইরে না গেলে হয়। এখন তো আর আমরা পরাধীন না, তাই না! চলো মা।
রাসেল বলল, আমিও যাব। বাইরে গিয়ে জয় বাংলার মিছিল করব।
রেনু বললেন, হাসু, তুই একটুখানি থাক। আমি যাব আর আসব। দেরি করব না।
রেহানা আর রাসেলকে নিয়ে রেনু খোকার গাড়িতে উঠে পড়লেন। ৩২ নম্বর কাছেই। তিন মিনিট লাগল গাড়িতে যেতে। কবি সুফিয়া কামালের বাড়ি সাঁঝের মায়ায় ঢুকলেন রেনু। এই একজন, সুফিয়া আপা, সব সময় খোঁজ নিয়েছেন তাঁদের, হাসিনার বাচ্চা হওয়ার সময় পিজি হাসপাতালে গেছেন। সব সময় বলেন, মুজিবের জন্য দোয়া করি। আমার ছোট ভাই।
সুফিয়া কামাল পরে আছেন সাদা শাড়ি, কালো পাড়, চোখে চশমা, ধবধবে ফরসা মুখটা আরও ফরসা দেখাচ্ছে। ৬০ বছরের মার্জিত রুচির সুফিয়া কামালের চুল অনেকটাই পাকা, আজকে যেন আরও বেশি পাকা দেখাচ্ছে। তিনি শাড়ির ওপরে একটা কালো চাদর জড়িয়ে নিলেন।
রেনু গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন সুফিয়া কামালকে।
দুজনেই কাঁদতে লাগলেন। রেনু জানেন না, হাসুর আব্বা কোথায়, কামাল-জামাল কোথায়। সুফিয়া কামাল জানেন না, তার দুই মেয়ে টুলু, লুলু গেছে মুক্তিযুদ্ধে, মাঝেমধ্যে খবর পেয়েছেন যে তাঁরা আগরতলা বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেন!
এরই মধ্যে সুফিয়া কামাল খবর পেলেন, ডা. ডোরা মারা গেছে।
রেনু বললেন, হ্যাঁ। কালকে আমাদের চোখের সামনে তো ঘটল সব। গুলির শব্দ শুনে দৌড়ে বাইরে গেলাম। পাকিস্তানি মিলিটারিরা পাগল হয়ে গেছিল। ওদের অফিসার দুইজন চলে গেছে। বাকিরা কী করবে বোঝে না। জয় বাংলা স্লোগান শুনলেই গুলি।
সুফিয়া কামাল বললেন, আমি তাহলে হাতেম আলী সাহেবের বাসায় একটু যাই।
রেনু বললেন, সময় পেলে পরে আমিও যাব একবার। এখন ওয়াজেদ মিয়া এসেছে, হাজি মোরশেদ এসেছে, লোকজন আসছে, বাসায় থাকা দরকার।
রেনু, রাসেল, রেহানা, খোকা চলে এলেন ১৮ নম্বরের বাড়িতে।
সুফিয়া কামাল চললেন হায়দার আকবর খান রনোর বাড়িতে। একই রাস্তায় বাড়ি। ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়ক।
সুফিয়া কামাল রনোদের বাড়িতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। লাশ হাসপাতালের মর্গ থেকে এসেছে একটু আগে। গুলিতে চুল উড়ে পড়ে ছিল পাশে, সেই চুলও আনা হয়েছে।
ডোরা মেয়েটা ডাক্তার। ডাক্তার আয়েশা বেদোরা চৌধুরী। ৩৬ বছর বয়স। কলকাতায় জন্ম, ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ছিল, মেট্রিক ফার্স্ট ডিভিশন, আইএসসি ফার্স্ট ডিভিশন, মেডিকেলে ডাবল গোল্ড মেডেল। ওদের ড্রাইভার মনির, ডোরার খালু হাতেম আলী, নানি, ডোরার খালা মোহসিনা, হাতেম আলীর ছোট পুত্রবধূ চপল আর ডোরা গাড়িতে উঠেছিল, আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে জয় বাংলা বলতে বলতে, বিজয়ের উদ্যাপন দেখতে। তারা গাড়ির জানালা দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা নাড়ছিল। ১৮ নম্বরে বেগম মুজিবকে বন্দী করে রাখা বাড়ির কাছাকাছি যেতেই গুলি। মাথা বাঁচাতে ডোরা মাথা নামিয়ে হাঁটুর কাছে রাখল। গুলি এসে লাগল ডোরার মাথায়। ড্রাইভার মনিরও মারা গেল সঙ্গে সঙ্গে। গুলিবিদ্ধ হলেন মোহসিনা আর চপল। এখন হাসপাতাল থেকে ফিরেছে ডোরার লাশ। ফিরে এসেছে আহত চপল আর মোহসিনা। তাদের হাতে আর মাথায় ব্যান্ডেজ।
সুফিয়া কামাল দেখতে লাগলেন ডোরার মেয়ে দুটোকে। দুই বছরের মেয়ে মোনালিসা। এক বছরের মেয়ে বেলারোসা। ফুটফুটে দুই বাচ্চা। বড়টা মাকে খুঁজছে। মা মা বলে ডাকছে। নানি ওদের সামলানোর চেষ্টা করছেন।
সুফিয়া কামাল কোমরে আঁচল খুঁজলেন। ডোরাকে গোসল করাতে হবে। দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করবেন কী। করে? মৃত্যুর মিছিল তো থামছেই না!
ডোরার পোষা কুকুরটা ডোরার পাশে বসে আছে। সে কিছুতেই ডোরার পাশ ছাড়বে না।
১১৮
১৭ ডিসেম্বর দুপুরে ১৮ নম্বর সড়কের বাড়িতে এসে ঢুকলেন জামাল। তার পরনে যুদ্ধের পোশাক। কাঁধে মেশিনগান। তার মাথায় যুদ্ধক্যাপ। যশোর। থেকে হেলিপ্টারে উড়ে এসে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নেমেছেন তিনি। বের হয়ে একটা বেবিট্যাক্সি ভাড়া করেছেন। চলো ধানমন্ডি ১৮ নম্বর।
বেবিট্যাক্সিওয়ালার মুখে বিশাল হাসি। তিনি বললেন, ভাইজান, আপনে মুক্তিযোদ্ধা!
হ্যাঁ।
আপনার এই অস্ত্রটার নাম কী? মেশিনগান?
