মেজর অশোকতারা অস্ত্র রেখে দিলেন গাড়িতে। তার সৈন্যদের কাছে।
তাঁর জীবনের কঠিনতম অ্যাসাইনমেন্ট আজকে। তিনি শত্রুদের ওপর গুলি চালাতে জানেন। কীভাবে হামলা করতে হয়, কীভাবে রিট্রিট করতে হয়, এটা তার জানা। কিন্তু একটা বাড়িতে আছেন শেখ সাহেবের ফ্যামিলি, সেটার চারপাশে খেপা একদল পাকিস্তানি সৈন্য, যারা কাল থেকে পাগলের মতো গুলি করছে, তাদের তিনি নিবৃত্ত করবেন কীভাবে? গুলি করা যাবে না, কারণ বাড়িতে নারী-শিশুরা আছে। আবার ওদের কেউ একটা গুলি ছুড়লেই তিনি মারা যেতে পারেন।
তিনি নিজের সৈন্যদের বললেন, তোমরা এখানে থাকো। কেউ এগোবে না।
তারপর তিনি খালি হাতে একা একা গেটের কাছে এগোতে লাগলেন। বাড়ির সামনে বালুর বস্তা। বাড়ির ওপরে অনেক কজন পাকিস্তানি সেনা মেশিনগান বসিয়ে সদা প্রস্তুত ভঙ্গিমায় গুলি করার জন্য প্রস্তুত। মেজর অশোকতারা এগোচ্ছেন।
পাঞ্জাবিতে বললেন, কোই হ্যায়?
বালুর বস্তার আড়ালে পাকিস্তানি সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে। ছাদের ওপরে ওদের নড়াচড়া আর বন্দুকের নলে পড়া সূর্যের আলোর ঝলকানি চোখে পড়ছে। অশোকের।
তিনি বললেন, পাঞ্জাবি বোঝো না তোমরা?
ওরা বলল, এগোনোর চেষ্টা কোরো না। এগোলেই গুলি করব।
অশোক বললেন, আমি মেজর। ইন্ডিয়ান আর্মির মেজর। তোমাদের এখানে অফিসার কে?
অফিসার কেউ নেই। কাল চলে গেছে। সুবেদার আছে।
সুবেদারকে ডাকো।
সুবেদার সারা রাত গোলাগুলি করে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিলেন। তিনি এলেন।
অশোক বললেন, তোমাদের সঙ্গে কোনো অফিসার নেই। এই জন্য তোমরা গুলি করছ। তোমাদের সঙ্গে অফিসার থাকবে কী করে? সব অফিসার তো হেডকোয়ার্টারে। আমাদের কাছে সারেন্ডার করেছে। তোমার পুরো বাহিনী সারেন্ডার করেছে। তোমরা কেন এখনো অস্ত্র ধরে আছ? অস্ত্র নিকাল দো।
দুজন ১৮-১৯ বছরের সৈন্য বেয়নেট ধরে আছে অশোকের গলা বরাবর–আমরা আমাদের অফিসারদের হুকুম ছাড়া তো এটা করতে পারি না।
ওই দিকে দেখো মানুষের ভিড়। দুই পাশে দেখো কত মানুষ। আকাশে দেখো, ভটভট করে হেলিকপ্টার যাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছ ওটা ইন্ডিয়ান হেলিকপ্টার। আমি তোমাদের নিরাপত্তা দিতে আসছি। আমি মেজর। এখন তোমাদের আমার হুকুম শুনতে হবে। আমার কথা যদি না শোনো, মুক্তিরা আসবে। তারা তোমাদের হত্যা করবে। আর আমি তোমাদের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যেতে পারি নিরাপদে। তোমরা বেঁচে থাকবে। তোমাদের সোলজারের সম্মান দেওয়া হবে। তুমিও পাঞ্জাবি আমিও পাঞ্জাবি। তুমিও সোলজার। আমিও সোলজার। সোলজার সোলজারকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারে না। এটা খাঁটি ওয়াদা। বাড়িতে তোমাদের বাবা-মা আছে। স্ত্রী-সন্তান আছে। তোমরা আবার তাদের কাছে ফিরে যেতে পারবে। মুক্তিবাহিনীর হাতে পড়লে কিন্তু আর বাঁচবে না।
ওরা একটু একটু নরম হচ্ছে। একজন বলল, আমাদের অফিসারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও।
এখানে কোনো ফোন নেই। তার ওপর ওরা সবাই সারেন্ডার করেছে। ওরা তো আর কথা বলতে পারবে না। আমার কথাই তোমাদের শুনতে হবে।
তাহলে আমাদের দুই ঘণ্টা সময় দাও। ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে হাসিনা, রেহানা, বেগম মুজিব সব শুনছেন। রেহানা জানালা থেকে চিৎকার করলেন, সময় দেবেন না। সময় পেলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।
মেজর অশোক বললেন, আধঘণ্টা সময় দিলাম।
ওরা বলল, আমাদের অস্ত্রসমেত যেতে দিতে হবে।
অশোকের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে আছে যে দুজন, অশোক দেখলেন, তারা থরথর কাঁপছে। ভয়েই না তারা ট্রিগারে আঙুল বসিয়ে ফেলে।
তিনি ছেলে দুটোকে বললেন, এই অস্ত্র দুটো আমার দিক থেকে সরাও তো।
তারপর ওদের সুবেদারকে বললেন, ঠিক আছে। যাও। তবে আমার গাড়িতে সাদা পোশাক আছে। তোমরা সেসব পরে নাও। রাস্তায় জনতা গিজগিজ করছে। মুক্তিযোদ্ধারা খোলা অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে। পাকিস্তানি মিলিটারি দেখলে গুলি করে বসতে পারে।
অশোকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর ওয়্যারলেস ম্যান। তিনি বললেন, গাড়ি থেকে কাপড়চোপড়গুলো এনে এদের দাও।
আধঘণ্টায় পোশাক পাল্টে নিয়ে যার যার ব্যাগ রেডি করে পাকিস্তানি সৈন্যরা বেরিয়ে এল। অস্ত্রগুলো সব রাখল অশোকের পায়ের কাছে। অশোক দেখলেন, সবগুলোতে গুলিভরা। একটা অস্ত্রে ট্রিগার পড়লেই তিনি শেষ।
.
ওরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেহানা, হাসিনা দৌড়ে বারান্দায় এলেন।
দুজন নিচের ট্রেঞ্চে ঢুকে আছে। রেনু হুকুম করলেন, সারেন্ডার করো। পায়েন্দা খান। যাও। হাতিয়ার ডাল দো।
দুই সেপাই ট্রেঞ্চের ভেতর কাঁপছে। রেনুর অর্ডারে তারা বেরিয়ে এল আর এগিয়ে গিয়ে সারেন্ডার করল।
একটা মাইক্রোবাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা চলে গেল।
রেনু হুকুম দিলেন, আবদুল পাকিস্তানি পতাকা নামা। ওটা পোড়াতে হবে।
আবদুল চলে গেল বাইরে। পতাকাঁপোস্টে। পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে আবদুল দিল রেনুর হাতে। রেনু সেটায় আগুন ধরিয়ে দিলেন।
খোকা একটা বাংলাদেশের পতাকা আনলেন। সেটা তোলা হলো।
রেহানা-রাসেলের মুখে হাসি আর ধরে না। তাদের বাড়িতে উঠছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। তারা চিৎকার করে উঠল : জয় বাংলা।
রেনু ভারতীয় অফিসারকে বললেন, তোমার নাম কী?
অশোকতারা।
এসো ভেতরে এসো। আমাদের বাড়িতে কোনো ফার্নিচার নাই। তোমাকে বসতে দিতে পারব না। তবু তুমি আসো। তোমাকে এক কাপ চা খাওয়াই।
