রেনু মেঝেতে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন। জড়িয়ে ধরলেন কামালকে। বললেন, তোদের আব্বাকে তো আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ করতে পাঠাইছি, তোরা আমার বুকটা খালি করিস না।
ক্যাপ্টেন রহমান তার স্ত্রীকে বললেন, সবার জন্য নাশতার আয়োজন করো। এই জয়নাল, দ্যাখ তো দোকানপাট কিছু খুলছে নাকি। দুইটা রেজর কিনে আন। না পেলে ব্লেড আন। কামাল, খোকা, তোমরা তোমাদের গোঁফ শেভ করে ফ্যালো।
একটু পরে এলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা।
.
ওয়াজেদ মিয়ার চিন্তা হলো, কে কোথায় থাকবে। সবাই একসঙ্গে থাকা যাবে না।
খোকা বললেন, ভাবি রাসেল জামালকে নিয়ে আমি ওয়ারীতে যাই। শ্বশুরবাড়িতে উঠি। পরে চিন্তা করে বের করা যাবে কোথায় আশ্রয় নেওয়া যাবে।
রেহানা বললেন, আমিও মার সঙ্গে থাকব। মাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।
ওয়াজেদ মিয়া বললেন, আমার অফিসের কলিগ ড. মোজাম্মেলের বাসা আছে খিলগাঁওয়ে। গ্রামের দিকের ওই বাসায় সহজে মিলিটারি যাবে না। আমি, হাসিনা ওই বাসায় থাকতে পারি। আমি একটু গিয়ে দেখে আসি, ওই বাসার কী অবস্থা।
হাসিনা বললেন, আচ্ছা যাও। দেখে আসো।
ওয়াজেদ মিয়া বের হলেন। টেবিলে নাশতা সাজানো হচ্ছিল। তা খাওয়ার সময় নেই। বিকেল ৪টা থেকে আবার কারফিউ।
ওয়াজেদ মিয়া রাস্তা ধরে এগোচ্ছেন। মানুষ ছুটছে। মানুষ পালাচ্ছে। বোচকাঁপাতি নিয়ে, সন্তান কোলে, বাক্সপেটরা ঘাড়ে চেপে, হেঁটে, রিকশায়, ঠেলাগাড়িতে, গরুর গাড়িতে, গাড়িতে, বেবিট্যাক্সিতে, ট্রাকে, বাসে মানুষ পালাচ্ছে। দুই ধারে পোড়া ঘরবাড়ি। এখানে-ওখানে পড়ে আছে লাশ।
রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার পুড়ে ছাই। এখনো কোনো কোনো কাঠ থেকে, কয়লা থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। পেট্রলপোড়া গন্ধ, বোমা-বারুদের গন্ধ, বাড়িঘর পোড়া গন্ধ, মানুষপোড়া গন্ধ।
ওয়াজেদ সাহেব গাড়ি চালাচ্ছেন। তার শরীর শিউরে উঠছে দুপাশের নারকীয় পরিস্থিতি দেখে।
খিলগাঁওয়ের রাস্তার দুই ধারে ধানখেত, কলাবাগান। দু-চারটা সদ্য ওঠা বাড়ি। ওয়াজেদ মিয়া তার সহকর্মী ড. মোজাম্মেলের বাড়ির সামনে গাড়ি রাখলেন। ভেতরে ঢুকলেন। এই বাড়িতে মোজাম্মেল সাহেব থাকেন, তাঁর আব্বা-আম্মা থাকেন, আর থাকেন ওয়াজেদ মিয়াদের আরেক কলিগ ড. ফয়জুর রহমান, একটা রুমে। তিনি মোজাম্মেল সাহেবের বোনাই হন।
.
ওয়াজেদ সাহেবের গাড়ি দেখেই সবাই ছুটে এলেন, বঙ্গবন্ধু এখন কোথায়? সবার প্রশ্ন। ওয়াজেদ সাহেব সংক্ষেপে পরিস্থিতি খুলে বললেন। তাঁর স্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তানসম্ভবা, তার একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার, এখানে তারা থাকতে পারবেন কি না, এই হলো প্রশ্ন। ফয়জুর রহমান বললেন, ওয়াজেদ ভাই, আপনি এখনই ভাবিকে নিয়ে চলে আসুন। আমার ঘরটা আমি ছেড়ে দিচ্ছি। একদম অসুবিধা হবে না।
ওয়াজেদ সাহেব তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন ক্যাপ্টেন রহমান সাহেবের বাড়িতে।
হাসিনা, জেলি, চটপট উঠে পড়ো গাড়িতে। আমরা খিলগাঁওই যাচ্ছি। সব ব্যবস্থা করে এসেছি। ফয়জুর সাহেব ঘর ছেড়ে দিয়েছেন আমাদের। জন্য।
হাসিনা উঠলেন। চলাফেরায় কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু সেটা তিনি কাউকে বলবেন না। মা চিন্তা করবেন।
আপার হাত ধরে কাঁদতে শুরু করে দিলেন রেহানা, আপা, তুমি কোথায় যাচ্ছ। আমরা কোথায় যাচ্ছি। কিছুই তো জানি না। আর কীভাবে দেখা হবে। কীভাবে খোঁজ পাব?
হাসিনা ঠিক করেছেন তিনি কাঁদবেন না। এটা কাদার সময় নয়। তিনি বললেন, মাকে দেখে রাখিস। জেলি, চল।
হাসিনা, জেলি গাড়িতে উঠলেন। ওয়াজেদ মিয়া গাড়ি স্টার্ট দিলেন। রওনা হলেন খিলগাঁওয়ের দিকে। হাসিনাকে মিলিটারি চিনে ফেলতে পারে। আবার রাস্তায় চেকপোস্টে তল্লাশিও হতে পারে। সামনের সিটে ওয়াজেদ মিয়ার পাশে বসেছেন জেলি। পেছনের আসনে লম্বা ঘোমটা দিয়ে বসে
আছেন হাসিনা। নানা ঘুরপথে ওয়াজেদ মিয়া কারফিউয়ের আগেই। খিলগাঁওয়ে মোজাম্মেল সাহেবের বাড়িতে পৌঁছাতে সমর্থ হলেন।
.
রাতের বেলা মাদুর পেতে একসঙ্গে খেতে বসেছেন তারা। মোজাম্মেল সাহেবের বোন একটা সাংঘাতিক কথা বললেন–
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি তাদের কন্ট্রোল রুম থেকে বিভিন্ন ইউনিটকে যে সমস্ত ওয়্যারলেস মেসেজ দিয়েছিল, সেই সবকিছুই তিনি রেকর্ড করে রেখেছেন। তাঁর কাছ থেকে আরও জানা গেল, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। বিভিন্ন দেশের রেডিওতে সেই ঘোষণা আসছে। চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকেও বলা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।
ব্যাঙ্গমা বলে, মোজাম্মেল সাহেবের বোন যেমন নিজের রেডিওতে শুইনা ফালাইছিলেন পাকিস্তানি মিলিটারি গো ওয়্যারলেস মেসেজ, টিক্কা খানের অ্যাসিস্ট্যান্টও তেমনি শুইনা ফালাইছিলেন শেখ সাহেবের ওয়্যারলেস মেসেজ, নিজের রেডিওতে। সেই রেডিও লইয়া তিনি দৌড়ায়া গেছিলেন টিক্কা খানের কাছে।
.
ওয়াজেদ মিয়া মুখের ভাত চিবুতে পারছেন না। স্বাধীনতা আসছে। স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়। তাঁর মনে পড়ল, গাড়ি নিয়ে চলাচল করার সময় কত অগ্নিদগ্ধ ঘরবাড়ি দেখেছেন। দেখেছেন রাস্তার পাশে পড়ে আছে মানুষের লাশ।
