জি বাচ্চু ভাই।
এর মানে কী?
এর মানে ঢাকায় আর ব্ল্যাকআউট হচ্ছে না।
রাইট। দেশ শত্রুমুক্ত। আমরা জয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছি।
জি বাচ্চু ভাই।
তোমার কেমন লাগছে, পাশা।
আশ্চর্য লাগছে বাচ্চু ভাই।
আশ্চর্য কেন?
দেশ স্বাধীন, অথচ আমি বেঁচে আছি। বাড়ি যাচ্ছি। টিটো তো বাঁচল না বাচ্চু ভাই। মানিক ভাই বাঁচলেন না। আমার প্রথম অপারেশনেই জাকির ভাই। শহীদ হলেন।
যুদ্ধ তো এই রকমই পাশা।
চারদিকে জয় বাংলা স্লোগান। মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলেই হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারাও হাত নেড়ে জবাব দিচ্ছে। জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত ঢাকার আকাশ-বাতাস।
চানখারপুলে পাশাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামালেন বাচ্চু ভাই।
বাচ্চু ভাই, আমাদের বাসায় চলেন।
তুমি যাও। আমি আরেক দিন যাব। এই ছেলেদেরও তো আমার নামাতে হবে।
আচ্ছা। সবাইকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে পাশা ঢুকল তাদের বিল্ডিংয়ে। বাসার দরজায় গিয়ে বেল টিপল।
দরজা খুললেন আম্মা। দরজা খুলেই চিৎকার করে উঠলেন, পাশা এসেছে। ছোট দুই ভাই রামা আর ডারা ছুটে এল। আব্বা একটা ইজিচেয়ারে বসে রেডিওতে বিবিসির খবর শুনছিলেন, দৌড়ে এলেন। সবাই হাসছে। পাশা হাসছে, ভাই দুটো হাসছে, মা হাসছেন। আম্মা জড়িয়ে ধরলেন পাশাকে। তারপর একবার হাসেন, একবার কাঁদেন। শেষে বললেন, গরম পানি চুলায় দিই। গোসল কর।
আব্বা বললেন, তোর হাতে এটা কী?
জি-৩ রাইফেল।
এটার গুলি আনলোড কর। বাচ্চারা ধরে অ্যাকসিডেন্ট করে বসতে পারে।
পাশা এটা খুব ভালো জানে। কিছুদিন আগেই তাদের একজন সহযোদ্ধা। আলতাফ মারা গেছে অ্যাকসিডেন্টে। অস্ত্রে গুলি নেই ভেবে একজন ট্রিগার টিপে বসেছিল। পাশার সামনেই ঘটে এ দুর্ঘটনা।
অস্ত্র ভয়াবহ জিনিস। ট্রেনিংয়ের সময় বারবার করে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
পাশা ম্যাগাজিন আলাদা করে ফেলল।
আম্মা ভাত চড়ালেন।
গরম পানিতে গোসল করে সে খেতে বসল। সবাই তাকে ঘিরে ধরেছে। ছোট ভাই দুটো প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
কত দিন পরে গরম পানিতে গোসল। কত দিন পরে টেবিল-চেয়ারে বসে গরম ভাত খাওয়া। কত দিন পরে আম্মার হাতের রান্না।
ভাত খেয়ে পাশা বিছানায় গেল। কত দিন পরে বিছানায় ঘুম।
রাজ্যের ঘুম জমেছিল তার চোখে। সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
১১৭
ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন পিজি হাসপাতালের কেবিনে। চিকিৎসাধীন। ডা. নুরুল ইসলাম এলেন ভোর ছয়টায়। বললেন, ইন্ডিয়ান রেডিও বলছে, আজ নয়টা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি। এরপর একযোগে নয়টা থেকে বিমান হামলা শুরু করবে। পিজি হসপিটাল বড় বিল্ডিং। এখানে বোমা পড়ার চান্স বেশি। এর মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট কাছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলেও আর্মি ক্যাম্প। আপনি আপনার দাদাশ্বশুর, দাদিশাশুড়ি, ফুফুশাশুড়িকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যান। আমি আমার আম্মাকে নিয়ে যাচ্ছি। উনিও এই হাসপাতালেই আছেন।
একটা অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেল। তাতে নুরুল ইসলাম, শেখ লুৎফর রহমান, সায়েরা খাতুন, ডাক্তার সাহেবের আম্মা, ওয়াজেদ আর হাসিনা রেহানাদের লিলি ফুফু উঠলেন। প্রথমে নুরুল ইসলাম সাহেবকে তার বাড়িতে নামিয়ে দেওয়া হলো। তারপর অ্যাম্বুলেন্স গেল সোবহানবাগে। লিলিদের বাসায়। লুত্বর রহমান সাহেবেরা নামলেন। তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওয়াজেদ মিয়া এলেন ৩২ নম্বর সড়কে। মোশাররফ সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিলেন।
পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। ওয়াজেদ খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেন যে হাসিনারা কেমন আছেন। কিন্তু ১৮ নম্বরের দিকে যাওয়া যাচ্ছে না। সবাই নিষেধ করছে। ওই বাড়ির কাছে গেলেই গুলি করে লোকদের মেরে ফেলছে।
রাতের বেলা আর তিনি চেষ্টা করলেন না। পরের দিন আবার গেলেন ১৮ নম্বর রোডে। তখন সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে।
দূর থেকে দেখলেন হাজি মোরশেদ সাহেবকে।
হাজি মোরশেদ এগিয়ে এলেন। বললেন, ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে এই বাড়ির দিকে আসছিলাম। নানাজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ১৮ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর পরিবার থাকেন। আমি একটা গাড়ি করে আসছি। ওই গাড়িটা। আমার মামাতো ভাইয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই মিলিটারির চিৎকার : মাত আও।
তখন আরেকজন নামাজ পড়ে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, বললেন, করছেন। কী! কালকে সারা দিনে গুলি করে কয়েকজনকে এই রাস্তায় মেরে ফেলছে। হায়দার আকবর খান রনোর বোন ডাক্তার আয়েশাকে মেরে ফেলেছে।
আমি তখন গাড়ি করে চলে গেলাম সার্কিট হাউস। দেখা পেলাম ভারতীয় মেজর গঞ্জালেসের। তাঁকে বললাম, শেখ মুজিবস ফ্যামিলি ইন সিরিয়াস কন্ডিশন। ওদের মেরে ফেলবে। তুমি চলো ওদের উদ্ধার করতে হবে। মেজর গঞ্জালেস বললেন, গাড়ি আছে তোমার সঙ্গে? আমি বললাম, আছে। বললেন, চলো তো এয়ারপোর্ট যাই। এয়ারপোর্টে গিয়ে আমার গাড়ি আর মিলিটারিদের আরেকটা গাড়িতে করে মেজর অশোকতারাকে নিয়ে এলাম। সঙ্গে কয়েকজন সৈন্য। মেজরের হাতে অস্ত্র নেই। সৈন্যদের সঙ্গে ছিল। উনি সৈন্যদের গাড়িতে রেখে একা হেঁটে গেছেন।
ওয়াজেদ সব শুনলেন। তাঁরা দূর থেকে দেখছেন কী হয়। এর মধ্যে ভিড় হয়ে গেছে।
