তারপর বাচ্চু ভাই হলেন কমান্ডার।
এখন পাকিস্তানি বাহিনী সারেন্ডার করেছে। বাচ্চু ভাই সাভার ডেইরি ফার্ম থেকে একটা জিপ জোগাড় করে এনেছেন। পাশাকে বলেছেন, পাশা, চলো, ঢাকা যাই, তোমাকে তোমার বাড়ি নামিয়ে দিই। আজ রাতে বাড়িতে ঘুমাও। কাল আবারও এই ক্যাম্পে এসে রিপোর্ট করবে।
পাশা খুশিতে কী করবে বুদ্ধি পাচ্ছে না। তার গায়ে একটা মলিন সাদা শার্ট। পরনে লুঙ্গি। শাহিন স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র পাশার হাতে একটা জি ৩ রাইফেল।
এটা সে নিয়েছে তাদের হাতে ধরা পড়া পাঠানের কাছ থেকে।
পাঠানটার জন্য বড় মায়া লাগে কিশোর বয়সী পাশার। বড় নরমসরম। ভালো মানুষ পাঠানটা। ১৪ ডিসেম্বরের যুদ্ধে সে তাদের হাতে ধরা পড়ে।
১৪ ডিসেম্বরের যুদ্ধেই পাশা হারায় তার মানিকজোড় বন্ধু টিটোকে। গোলাম দস্তগীর টিটো তারই মতো ক্লাস টেনের ছাত্র। সে পড়ত মানিকগঞ্জের এক স্কুলের ক্লাস টেনে। তারই মতো সে-ও আগরতলা থেকে এসে পড়েছে। সাভারে। আশুলিয়ার গ্রামে তাদের ক্যাম্প।
১৪ ডিসেম্বর তাদের ওয়াচম্যানরা খবর আনল, পাকিস্তানি বাহিনীর একটা বড় দল তাদের ক্যাম্পের দিকেই আসছে। সম্ভবত রাজাকাররা খবর দিয়েছে। তারা পথ দেখিয়ে আনছে। তাদের ক্যাম্প আক্রমণ করবে। বাচ্চু ভাই সবাইকে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র হাতে নিয়ে ডিফেন্স নিতে বললেন। তারপর আবার লোক পাঠালেন আসল খবর আনতে।
খানিক পরে খবর এল। পাকিস্তানিরা আসলে পালিয়ে ঢাকা শহরের দিকে যাচ্ছে। আরিচা সড়ক ধরে গেলে ভারতীয় বাহিনী, মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পড়বে, এই ভয়ে তারা গ্রামের পথ নিয়েছে।
বাচ্চু ভাই বললেন, আমরা ওদের অ্যাম্বুশ করব। তিন ভাগে ভাগ করলেন পুরো দলকে। ডানে এক দল। বাঁয়ে একদল। মাঝখানে আরেক দল।
টিটো ছিল পাশার পাশেই। কথা ছিল, পাকিস্তানিদের সামনে থাকা স্কাউটরা চলে যাবে। তাদের আক্রমণ করা হবে না। মূল দল তাদের নিশানার মধ্যে ফাঁদে এসে পড়বে, তারপর একযোগে গুলি করা শুরু হবে। কিন্তু উত্তেজনার বশে কেউ একজন স্কাউটদেরই গুলি করে বসে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানিদের মূল দল বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করা শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি শুরু করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা আর এগোচ্ছে না। জায়গা থেকেই তারা গুলি করছে। তাদের কাছে আছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ। গুলি আর থামছে না।
পাশা আর টিটো একবার দম নিতে গেল। কলা আর পাউরুটি খেল। আবার এসে পজিশন নিয়ে গুলি করতে শুরু করল।
আড়াই ঘণ্টা গোলাগুলির পর একটু যেন ঠান্ডা হলো পরিস্থিতি। আর কোনো গুলি হচ্ছে না।
টিটো বলল, পাশা, পাকিস্তানিরা কি পলায়া গেল নাকি? দেখা দরকার।
পাশা বলল, টিটো। খবরদার, মাথা তুলবি না।
টিটো কথা শুনল না। দাঁড়িয়ে হাতের মেশিনগান তুলে গুলি করতে লাগল।
অমনি একটা গুলি এসে ওর পেটে লাগল। টিটো লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। পাশা এগিয়ে গেল। টুনি, জামিসহ আরও দু-তিনজন এগিয়ে গেল ক্রল করে করে। টিটোকে তুলে নিয়ে তারা ছুটল ক্যাম্পের দিকে।
রক্তে টিটোর শরীর ভেসে যাচ্ছে।
টিটোকে ক্যাম্পে এনে পাশা তার মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে। গাড়ি আনা হচ্ছে। টিটোকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিতে হবে।
টিটো বলল, পাশা, আমাকে বাঁচা। আমি বাঁচতে চাই।
একটা গামছা টিটোর পেটে বাঁধা হয়েছে। গামছা রক্তের স্রোত আটকাতে পারছে না।
টিটো বলল, পাশা, তুই না আমাদের ডাক্তার। মেডিকেলে থাকিস। আমার চিকিৎসা শুরু কর। আমাকে বাঁচা।
বাচ্চু ভাই এলেন। বললেন, গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ইন্ডিয়ান আর্মি আরিচা-ঢাকা রোড ধরে ঢাকার দিকে যাচ্ছে। যেকোনো সময় দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। আমরা অবশ্যই টিটোকে বাঁচিয়ে রাখব।
টিটো বলল, ভাই, আমি কি স্বাধীনতা দেইখা যাইতে পারুম না? আমার ঠান্ডা লাগে।
টিটোকে কম্বলে জড়িয়ে রাখা হলো।
টিটোকে বাঁচানো গেল না। গাড়ি আসার আগেই পাশার কোলে টিটো মারা গেল।
সাভার ডেইরি ফার্মের সামনে তাকে কবর দেওয়া হলো।
ততক্ষণে পাকিস্তানিরা ওই এলাকা ছেড়ে অন্য দিকে চলে গেছে। এখানে ওখানে পড়ে আছে কতগুলো পাকিস্তানি সৈন্যর লাশ।
শুধু টিটোকে গুলি করেছিল যে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সৈন্য, তাদের ধরে ফেলেছে গ্রামবাসী।
মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে গেল পাকিস্তানি সৈন্য দুজনকে উদ্ধার করতে। একজনের পা ছিল অনেক ফোলা। গ্রামবাসী তার প্যান্ট তুলে দেখল, পা ভরা ঘড়ি। সে পায়ে ঘড়ি পরেছে অনেকগুলো। মানিকগঞ্জে ঘড়ির দোকান লুট করেছে সে। তাকে গ্রামবাসী পিটুনি দিতে লাগল। আরেকজন পাঠানকে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে নিয়ে আসতে পারলেও আরেকজন পাঞ্জাবি সেনা ঘড়ি চুরির অপরাধে গণপিটুনিতে মরেই গেল।
সেই পাঠানটা বলেছিল, আমাদের আসলে পাঠানো হয়েছে হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এখানে এসে দেখি সব মুসলমান। কেন যে এসেছি যুদ্ধ করতে জানি না। সে বলেছিল, আমার সঙ্গের সৈনিকটা কই?
সে মারা গেছে।
আমার কাছে ৪০ টাকা আছে। এটা দিয়ে ওই সৈন্যকে একটু দাফন কাফন কোরো।
সেই পাঠান সৈনিকটির কাছ থেকেই একটা জি-৩ রাইফেল নিয়ে বাচ্চু ভাইয়ের পাশে বসেছে টিটো। তাদের গাড়িতে ঢাকার আরও কজন মুক্তিযোদ্ধা।
বাচ্চু ভাই বললেন, পাশা, দেখো, ঢাকায় আলো জ্বলছে।
