রেনু হঠাৎ কেঁদে ফেললেন, তোর আব্বার স্বপ্ন সফল হলো। এখন আমার তো ওই চিন্তা হচ্ছে, তিনি বেঁচে আছেন নাকি তাকে মেরেই ফেলল।
সবাই মিলে গোল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। শুধু জয় কিছু বুঝতে পারছে না। সে আ আ আ করতে লাগল।
রাসেল বলল, জয় মামা, বলো জয় বাংলা।
আবার একটা গাড়ির শব্দ। আবার গুলি। আবদুল বলল, এই গাড়ির ড্রাইভারও মইরা গেছে। গাড়িটা গাছের গায়ে গিয়া খাড়ায়া আছে।
মিলিটারিরা চিৎকার করছে, বাত্তি বন্ধ করো, বাত্তি বন্ধ করো। কে বন্ধ করবে? চালক তো মারা গেছে।
.
রাতের বেলা সবাই মিলে বিবিসি শুনলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব ভাষণ দিলেন। রাস্তায় লোকেরা জয় বাংলা ধ্বনি দিচ্ছে, তার রেকর্ড বাজাল বিবিসি আকাশবাণী। কিন্তু এই বাড়ির মিলিটারিরা তাদের পোস্ট ছাড়ছে না। কী মুশকিল!
১১৪
রিমি বলল, মা, দেশ তো স্বাধীন হলো। আজ কি আব্বু আমাদের কাছে আসবেন না!
রিপি বলল, আজকে তো আল্লুকে আসতে হবে।
তারা অপেক্ষা করতে লাগল। লিলি ওদেরকে বললেন, ভাত খেয়ে নাও।
রিমি-রিপি বলল, আন্ধু আসবে তো। আব্বু আসবে, তারপর খাব।
লিলি বললেন, তোমার আব্দুর আজকে তো আরও বেশি কাজ। কেবল পাকিস্তানি মিলিটারি সারেন্ডার করেছে, এখনো তো দেশে কোনো আইনকানুন হয়নি। আজকে রাতে তোমার আব্বকে বেশি কাজ করতে হবে। তোমরা খাও। আব্বু এলে তো দেখা পাবেই।
ওরা বলল, আচ্ছা ভাত খাব না। অন্য খাবার দাও। ভাত আব্বু এলেই খাব।
.
তাজউদ্দীনের কাছে এসেছেন সাংবাদিকেরা। থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের অফিসে বিকেলের পর থেকেই ভিড়। সবাই মিষ্টি বিতরণ করছে। কলকাতার বুদ্ধিজীবী, নেতারা ছুটে আসছেন। জয় বাংলার লোকেরা আসছে। বাংলাদেশ মিশন তো লোকে লোকারণ্য। কলকাতাবাসী রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। তারাও স্লোগান দিচ্ছে জয় বাংলা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
রেডিওর সাংবাদিক টেপ রেকর্ডার ধরেছেন তাজউদ্দীনের সামনে। বাংলাদেশ মুক্ত হয়ে গেল, পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করল, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
তাজউদ্দীন বললেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয় নাই। আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। তাঁকে মুক্ত করে আনা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবেই। বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন।
.
রাত ১২টার পর তাজউদ্দীন এলেন বাসায়।
রিমি আর রিপি তার আব্দুর কোলে গিয়ে উঠল। বলল, তোমার সঙ্গে ভাত খাব বলে আমরা ভাত খাই নাই।
প্রায় ৯ মাস পরে আব্দুর সঙ্গে বসে একসঙ্গে খেল তারা।
১১৫
১৬ ডিসেম্বর। জেনারেল গুল হাসান দাঁড়িয়ে আছেন ইয়াহিয়ার খাসকামরার দরজায়। প্রেসিডেন্ট বের হচ্ছেন না। গুল হাসান নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। প্রেসিডেন্ট তখনো বসে বসে মদ খাচ্ছেন।
কাল রাত থেকে শুরু হয়েছে তার অবিরাম মদ্যপান। রাতে মদের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে তিনি হঠাৎ ভেসে উঠলেন। বললেন, রেডিও-টিভিকে খবর দাও। আমি এখনই আমার বিশেষ ক্ষমতাবলে নতুন সংবিধান ঘোষণা করব। পাকিস্তান হবে ইসলামিক দেশ। এই দেশ আজ থেকে ইসলামিক রাষ্ট্র। ব্যস। বলেই তিনি বমি করতে লাগলেন। বমির দুর্গন্ধে প্রেসিডেন্ট ভবন ভেসে যেতে লাগল।
গুল হাসান বললেন, স্যার। আপনাকে রেডিওতে যেতে হবে।
কেন?
স্যার, আপনাকে একটা ভাষণ দিতে হবে।
শোনো, থার্টি ফার্স্টে আমি রাওয়ালপিন্ডির রাস্তায় মানেকশকে দিয়ে প্যারেড করব। জ্যাকবকে প্যারেড করাব। জগজীবনকে কোমরে দড়ি বেঁধে। রাস্তায় ঘোরাব।
স্যার। আপনাকে উঠতে হবে, স্যার।
জেনারেল হামিদও এলেন, স্যার প্লিজ।
হামিদ। এসো, তুমিও খাও। তোমার মনে আছে আমরা লারকানায় ভুট্টোর বাগানবাড়িতে কত মদ খেয়েছিলাম। সেদিনই তো আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, মুজিবকে আমরা ক্ষমতা দেব না। আলোচনা সব লোকদেখানো। মনে আছে? তোমরা দুজনে আমাকে রাজি করিয়েছিলে। মনে আছে?
স্যার। এই সব মনে রাখার সময় আর নাই। পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঘটে গেছে। আপনি অনুমতি দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানে আমরা সারেন্ডার করতে যাচ্ছি। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
হামিদের চোখে জল।
হামিদ তুমি কাঁদছ কেন?
আমি সেনাবাহিনীর প্রধান। আমার সৈন্যরা সারেন্ডার করছে, আমি কি হাসব?
গুল হাসান। তুমি কী মনে করো? কোনো মরদ লোক কাঁদতে পারে? ইয়াহিয়া বললেন।
না স্যার। গুল হাসান নিজেই কাঁদতে শুরু করলেন।
১১৬
পাশার কানে লাগছে ডিসেম্বরের সন্ধ্যার শীতের বাতাস। সে খিলখিল করে হাসছে। গাড়ি চালাচ্ছেন বাচ্চু ভাই। তাঁদের কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু (২১)। নয়াপল্টন এলাকায় বাচ্চু ভাইয়ের বাসা, তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সাভার এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল দলটির তিনিই এখন কমান্ডার।
তৌফিকুর রহমান ওরফে পাশা আগরতলার ২ নম্বর সেক্টর থেকে মেজর হায়দারের নির্দেশে নভেম্বরে এসে যোগ দিয়েছে সাভার দলের সঙ্গে। ২৫ মার্চের গণহত্যার নিদর্শন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্বচক্ষে দেখে ১৬ বছরের পাশা সেই যে বেরিয়েছিল যুদ্ধের খোঁজে, পল্টনে গিয়েছিল মানিক ভাইয়ের। বাড়িতে, সেই মানিক ভাই, রেজাউল করিম মানিক, সাভার এলাকার কমান্ডার। ছিলেন। নভেম্বরে মানিক ভাই শহীদ হলেন। ভায়াডুবি ব্রিজ অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন মানিক ভাই।
