রেহানা ছুটে বাইরে যেতে চাইছে। দূরে রাস্তায় শোনা যাচ্ছে জয়ধ্বনি জয় বাংলা।
হাসিনা জয়কে কোলে নিয়ে পায়চারি করছেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করছে। যুদ্ধ শেষ হবে। আমরা মুক্তি পাব।
কিন্তু আব্বা কোথায়? আব্বা কেমন আছেন? আব্বার বিচার করা হচ্ছে, এটা তো তারা শুনেছেন। নজমুল হক সাংবাদিক তো আব্বাকে দেখে এসেছেন পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে। আব্বার নাকি মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। আব্বাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? নাকি মেরে ফেলেছে?
আকাশে আবার হেলিকপ্টারের শব্দ। রাসেল ওপরে যেতে চায়। মা বলেন, আরে বাবা। যাস না। গোলাগুলির মধ্যে পড়বি।
হাসিনার মনে নানা দুশ্চিন্তা। কামাল কেমন আছে? জামাল কেমন আছে? নাসের চাচা কেমন আছে? মণি ভাই কোথায়? শহীদ ভাই?
রাস্তা থেকে হাজার কণ্ঠের স্লোগান ভেসে আসছে। জয় বাংলা। তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব।
কিন্তু এই রাস্তায় কাউকে আসতে দিচ্ছে না। ফোন নেই। বাড়িতে কোনো আসবাবও নেই। শুধু দুইটা চৌকি ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই যাতে কেউ বসে থাকতে পারে।
নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছে, তো এই পায়েন্দা খানেরা আত্মসমর্পণ করছে না কেন।
এই রাস্তা দিয়ে লোকেরা যাচ্ছে। অমনি গুলির শব্দ।
এই বাড়ির পাহারাদার মিলিটারিরা ১৮ নম্বর সড়কটির দুই মাথায় ব্যারিকেড বসাল। এই রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে দেবে না।
লোকজন আনন্দে যেন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। রাস্তায় অস্ত্র হাতে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলতে বলতে একটা মিছিল যাচ্ছে।
রেহানা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল : মুক্তিবাহিনী মুক্তিবাহিনী।
কাঁদেরিয়া বাহিনীর একদল লোক এই রাস্তা দিয়ে অস্ত্র হাতে মিছিল করতে করতে যাচ্ছিল। এই বাড়ির মিলিটারিরা গুলি করা শুরু করল। তারা পাল্টা গুলি করবে। ওদের নেতা নিবৃত্ত করলেন। ভেতরে বঙ্গবন্ধুর পরিবার আছে। তোমরা গুলি করলে ওরা মারা যাবে।
.
স্লোগান। মিছিল। গুলি। রেডিওতে শোনা যাচ্ছে বিজয়ের নানা সংবাদ।
হাসিনা জয়কে কোলে নিয়ে মেঝেতে বসেছেন। সবাই মাদুরে বসা। রেনু, রেহানা, খোকা কাকু।
বিকেলের দিকে হঠাৎ বাড়ির সামনে গাড়ির শব্দ। কে এই রাস্তায় এসেছে? তারা আবার চিৎকার করছে জয় বাংলা। নারীকণ্ঠের স্লোগান।
অমনি গুলি। পানি পানি বলে চিৎকার।
রেনু ছুটে বাইরে গেলেন। বললেন, তোমরা কী করছ? ওদের মেরে ফেললে নাকি? তোমাদের নিয়াজি সারেন্ডার করেছে। তোমরাও সারেন্ডার করো। আমাকে যেতে দাও। আমি পানি নিয়ে যাব। তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকে জগে করে পানি নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। মিলিটারিরা দরজা আটকে রইল।
সরো। তোমাদের সেনাবাহিনী প্রধান তো সারেন্ডার করছে।
নিয়াজি কর সকতা হ্যায়, হাম নেহি করেঙ্গা। হামারা পাস এতনা তাগদ হ্যায়, হাম নেহি করেঙ্গে। সিপাহির উত্তর।
রেহানাও ছুটে বের হলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে বললেন, মা এ তো ইঞ্জিনিয়ার হাতেম আলী সাহেবের গাড়ি। গাড়িতে মহিলারা ছিলেন। বোধ হয় গুলিতে মারা গেছেন।
এক মহিলা নেমে গেলেন। মনে হচ্ছে হাতেম আলীর স্ত্রী। তার হাত বেয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে।
ওরা চিৎকার করছেন, পানি পানি। রেহানা রেনুর হাত থেকে জগ কেড়ে নিয়ে বললেন, সরো, আমি যাব।
অন্দর যাও কুছ নেহি হোতা।
সাদা পতাকা উড়িয়ে দুজন এলেন। গাড়ির ভেতর থেকে একজন মহিলাকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটছেন। মহিলার মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। ইমা গো। রেহানা বললেন, মনে হয় মাথায় গুলি লেগেছে।
আরেকজন লোককে বের করল একজন। তাকেও কোলে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গাড়িটা রেহানাদের বন্দিবাড়ি থেকে খানিকটা দূরে রাস্তার ধারে আটকে আছে বলে হয়তো মিলিটারিরা আর গুলি করছে না।
মা, ডোরা আপা মারা গেছেন। রেহানা বললেন।
কোন ডোরা?
ডাক্তার ডোরা।
রনো-জুনোর বোন?
হ্যাঁ।
কেমন করে বুঝলি।
ওরা বলছিল। আমি শুনেছি। আর মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
হাসিনা জয়কে বুকে চেপে ধরলেন। রাসেল গিয়ে শান্ত ছেলের মতো মায়ের কোলে বসল।
রেহানা কাঁদতে লাগলেন।
একটু পরে রেডিওর খবরে বলা হলো, রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছেন। যৌথ বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডার জেনারেল অরোরার কাছে তিনি করেছেন এই আত্মসমর্পণ।
হাসিনার মনে নানা চিন্তা পাক খাচ্ছে। দেশ আজ বিজয়ের আনন্দে হাসছে। আব্বা যেখানে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ঘোষণা করেছিলেন, সেই রেসকোর্স মাঠেই পাকিস্তানি মিলিটারি সারেন্ডার করল। এই ময়দানেই তো বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এই মাঠেই তো এমএনএ, এমএলএরা শপথ নিয়েছিলেন যে তাঁরা ৬ দফার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।
দেশ স্বাধীন হচ্ছে। আব্বার সারা জীবনের স্বপ্ন পূর্ণ হচ্ছে। আব্বা-আম্মার সারা জীবনের কষ্ট আজ সার্থকতা পাচ্ছে। আব্বার সারা জীবনের সাধনা আজ সফল হচ্ছে। আব্বা নেই।
এদিকে দাদা-দাদি পিজিতে ছিলেন। তাঁদেরই-বা খবর কী। পিজি হাসপাতালে ওয়াজেদ মিয়াও ছিলেন। খোদা জানে, তার কী খবর।
হাসিনা হাসবেন না কাঁদবেন, বুঝতে পারেন না।
রেনু হঠাৎ বললেন, হাসু, তোর আব্বা ২৫ মার্চ রাতে আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল, আমি বাড়ি থেকে পালায়া যাব, আমি বলছিলাম, না, পালাবা না। তোমাকে ধরে নিয়ে গেলে কী হবে? মেরে ফেললে দেশ স্বাধীন হবে। বাঁচায়া রাখলেও দেশ স্বাধীন হবে। কিন্তু পালায়া তুমি যাবা কোথায়? তোমার মতো বড়সড় মানুষ আর এত বড় নেতা ক্যান পালাবে? পালালে পাকিস্তানিরা পালাবে।
