ত্রিকালদর্শী ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলে :
মানুষ ভাবতে থাকে সে হইল সব।
আমি সব, আমি কেন্দ্র, করে কলরব ॥
ওপরে বিধাতা হাসে, তিনি অন্তর্যামী!
পূর্বনির্ধারিত সব, এতটুকু জানি ॥
তোমার ভাগ্যের লাইগা, দায়ী করো কারে?
আমেরিকা চীন পিছে কলকাঠি নাড়ে!
রাশিয়া ভারত আছে, তারা বইসা নাই,
আমেরিকা-পিরিতিতে পাকিস্তান ছাই ॥
ব্যাঙ্গমা বলে, পাকিস্তানের পাপ হইল জন্মের পাপ। জন্মের সুময়ই আমেরিকার নজর পড়ছিল তার ওপরে, ট্রমান আর মার্শাল ঠিক করছিল তারে পিরিতের আঠায় বাইন্দা রাখব। সেই পাপে পাকিস্তানিরা, চিরটাকাল ছারখার হইয়া গেল। যে শিশু কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না, অবোধ শিশু স্কুলে। গেছে, বোমায় পুইড়া মইরা গেল। ২০২১ সালের মে মাসে রমজানের দিনেও হ্যাঁগো স্কুলে বোমা পইড়া স্কুলের বাচ্চারা মইরা গেল। হায় পাকিস্তান!
১১১
তখন দিল্লিতে লোকসভার অধিবেশন চলছে। ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করলেন : ঢাকা মুক্ত। ঢাকা এখন মুক্ত দেশের মুক্ত রাজধানী। আজ ৪টা ৩১ মিনিটে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ কমান্ডের প্রতিনিধি জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে জেনারেল এ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছেন। এই হাউস এবং এই জাতি এই আনন্দের মুহূর্তে উদ্বেলিত। আমরা বাংলাদেশের মানুষকে এই জয়ে অভিনন্দন জানাই। অভিনন্দন জানাই বাংলাদেশের সাহসী মানুষ এবং ছেলেদের। কী সাহসিকতাই না তারা দেখিয়েছে! এই জয় অস্ত্রের নয়। আদর্শের। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এত কষ্ট স্বীকার করে এত বীরত্ব দেখাতে পারত না, যদি না তারা জানত তারা লড়ছে আদর্শের জন্য, একটা স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের বাহিনীও লড়তে পারত না যদি না তারা বাংলাদেশের এই কারণটিকে হৃদয়ে ধারণ করতে না পারত।
১১২
রেডিও ঘিরে বসে আছেন মুক্তিযোদ্ধারা। কমান্ডার শাজাহান ভলুম বাড়িয়ে দিলেন। সৈয়দপুরের কাছে তাদের ক্যাম্প। মিত্রবাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ হিসেবে তারা এগিয়ে চলেছেন রংপুরের দিকে। পাকিস্তানিরা পালাচ্ছে। এখন শীতের রাতে তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বালিয়ে বসে আছেন। মুক্তিযোদ্ধারা। জোনাকির আলো আশার মতো জ্বলছে। কুয়াশা এই আলো ঢাকতে পারছে না। শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে চষা-জমির ওই ওপারের বাঁশঝাড় থেকে। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার হতে শুরু করল চরমপত্র।
তারা শুনছেন আর হেসে গড়িয়ে পড়ছেন।
মেজিক কারবার। ঢাকায় অখন মেজিক কারবার চলতাছে। চাইরো মুড়ার থনে গাবুর বাড়ি আর কেকা মাইর খাইয়া ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়া সোলজারগুলা তেজগাঁ-কুর্মিটোলায় আইস্যা-আ-আ আ দম ফালাইতাছে। আর সমানে হিসাবপত্র তৈরি হইতাছে। তোমরা কেডা? ও-অ-অ টাঙ্গাইল থাইক্যা আইছ বুঝি? কতজন ফেরত আইছ? অ্যাঃ ৭২ জন! কেতাবের মাইদে তো দেখতাছি লেখা রইছে টাঙ্গাইলে দেড় হাজার পোস্টিং আছিল। ব্যস্ ব্যস, আর কইতে হইব না–বুইজ্যা ফালাইছি। কাঁদেরিয়া বাহিনী বুঝি বাকিগুলার হেই কারবার কইরা ফালাইছে। এইডা কী? তোমরা মাত্র ১১০ জন কীর লাইগ্যা? তোমরা কতজন আছলা? খাড়া খাড়াও–এই যে পাইছি। ভৈরব-১,২৫০ জন। তা হইলে ১,১৪০ জনের ইন্নালিল্লাহে ডট ডট ডট রাজেউন হইয়া গেছে। হউক কোনো ক্ষেতি নাই। কামানের খোরাকের লাইগ্যাই এইগুলারে বঙ্গাল মুলুকে আনা হইছিল। রংপুর দিনাজপুর, বগড়া-পাবনা মানে কিনা বড় গাং-এর উত্তর মুড়ার মছুয়া মহারাজ গো কোনো খবর নাইক্যা। হেই সব এলাকায় এক শতে এক শর কারবার হইছে। আজরাইল ফেরেশতা খালি কোম্পানির হিসাবে নাম লিখ্যা থুইছে।
শাজাহান বললেন, আমাদের এলাকার খবরও তো বলল।
১৪ বছরের রাখালবালক বাদল, যে এই এলাকায় পথনির্দেশনা দেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা দলে সঙ্গী হয়েছে, সে বলল, কমান্ডার বাহে, যুদ্ধ তো শ্যাষ হয়া আসতেছে, আপনেরা তো টাউনত চলি যাইবেন, মুই কী করমো? হামাক তোমরা সাথে করি ধরি নিয়া যান।
শাজাহান যুদ্ধের আগে পড়তেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, সত্যি, যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে, কত মৃত্যু, কত কান্না, কত ত্যাগের মধ্য দিয়ে আসছে স্বাধীনতা, তারপর কী? তিনি তো রাজশাহী চলে যাবেন, এই বাদল কই যাবে? তারা কি আর কোনো দিনও একই থালায় খাবার ভাগ করে খাবেন?
১১৩
রাসেলকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল। আকাশে প্লেন উড়তে দেখলেই সে দৌড়ে ছাদে যাচ্ছে আর চিৎকার করে উঠছে : জয় বাংলা। রেহানাও প্লেন দেখলেই উঁকিঝুঁকি মারে।
অথচ ছাদে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংকার বানিয়ে রেখেছে।
আবদুল আর রমা দুই কিশোর পরিচারক সুযোগ পেলেই বাইরে যাচ্ছে। এসে বলছে, মুক্তিবাহিনী ঢাকায় ঢুইকা পড়ছে আর চিন্তা নাই।
রেহানা রেডিও কোলে করে ঘুরছে, হাতিয়ার ডাল দো। পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসাররা, তোমরা সারেন্ডার করো। তোমাদের জেনেভা কনভেনশন অনুসারে মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া হবে। উর্দুতে আর ইংরেজিতে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে আকাশবাণী থেকে।
রেডিও বলছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করবে। জেনারেল নিয়াজি ঘোষণা দিয়েছেন সমস্ত ইস্ট কমান্ড যেন অস্ত্র সংবরণ করে।
আকাশবাণী থেকে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডার জেনারেল এ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছেন। তিনি সারা বাংলাদেশে তার সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছেন আত্মসমর্পণ করার জন্য।
