অরোরা গাড়িতে উঠলেন। সঙ্গে মিসেস অরোরা। নিয়াজি আর এয়ার ভাইস মার্শাল দেওয়ান এক গাড়িতে উঠলেন। জ্যাকবকে আরেকটা গাড়িতে উঠতে হলো। সবার সামনের গাড়িতে সাবেগ সিং আর মেজর হায়দার। শিখ থাকলে মুক্তিরা ছেড়ে দেয়। আর হায়দারের চেহারায় বাঙালিত্বের ছাপ স্পষ্ট। গাড়িবহর সোজা চলছে রেসকোর্স ময়দানের দিকে।
রাস্তায় মানুষ। রাস্তায় মুক্তিবাহিনী। রাস্তায় চিৎকার জয় বাংলা। রাস্তায় আনন্দ। রাস্তায় অশ্রু। আকাশে-বাতাসে জয়ধ্বনি। মানুষ ছুটছে রেসকোর্সের দিকে।
হায়দার নামলেন গাড়ি থেকে। সঙ্গে জালাল আর একজন মুক্তি। হায়দার বললেন, জালাল, যাও, একটা টেবিল, দুটো চেয়ার নিয়ে এসো।
জালাল ছুটল ঢাকা ক্লাবে। মুক্তি দেখে অবাঙালি ড্রাইভার ভয়ে কাঁদতে লাগল। জালাল বলল, ভয় নাই, দুইটা চেয়ার আর একটা টেবিল দাও। দুইটা কাঠের চেয়ার আর একটা কাঠের টেবিল পাওয়া গেল। সেগুলো তিনজনে ধরাধরি করে শাহবাগের রাস্তায় আনার সঙ্গে সঙ্গে জনতাই ধরাধরি করে চেয়ার-টেবিল পৌঁছে দিল রেসকোর্সে।
হায়দার নিয়াজির বাঁ পাশে। নিয়াজির ডানে অরোরা। সবার সামনে তাঁরা। পেছনে আরও আরও অফিসার। তারা বড় বড় পা ফেলে রেসকোর্সের চেয়ার-টেবিল পাতা জায়গাটায় গেলেন। পৌনে পাঁচটার পৌষের রোদ এসে পড়ল হায়দারের মুখে। তাঁকে দেখতে লাগছিল একটা দেবদূতের মতো।
পাকিস্তানি সৈন্যদের একটা দল অরোরাকে গার্ড অব অনার দিল।
টেবিলে বসলেন অরোরা আর নিয়াজি। পেছনে দাঁড়িয়ে জ্যাকব, বিমানবাহিনীর মার্শাল দেওয়ান, ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণান, এ কে খন্দকার। জ্যাকব দেখলেন, কাগজে লেখা : ইনস্ট্রমেন্ট অব সারেন্ডার। টু বি সাইনড অ্যাট ১৬৩১ আওয়ারস আইএসটি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জ্যাকব দেখলেন ৪টা ৫৫।
নিয়াজি ও অরোরা সাইন করলেন। নিয়াজি তাঁর ব্যাজ খুলে অরোরাকে দিলেন। একটা রিভলবার তুলে দিলেন অরোরার হাতে। তাঁর চোখে টপ টপ করে জল ঝরছে।
ঠিক সামনে থেকে সেই দৃশ্য দেখলেন মেজর সফিউল্লাহ।
জেনারেল নাগরা একটা মাইকে সামনে দাঁড়ানো সারি সারি পাকিস্তানি সৈন্যদের বললেন, তোমাদের ওপরে কোনো প্রতিশোধ নেওয়া হবে না। তোমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। মর্যাদার সঙ্গে তোমাদের ট্রিট করা হবে।
.
পাকিস্তানি সৈন্যরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা বেল্ট খুলে ফেলে। গায়ের পোশাক প্যান্টের ভেতর থেকে বের করে। তারা হাতের অস্ত্র মাটিতে রাখে। তারা সবাই কাঁদছিল।
আর চারদিকে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা জয় বাংলা চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। এত মানুষ কোথায় ছিল এই ঢাকায়।
জনতা চিৎকার করে বলে, নিয়াজিকে আমাদের হাতে ছেড়ে দাও।
জয় বাংলা, জয় হিন্দ, শেখ মুজিব জিন্দাবাদ, ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ স্লোগানে মুখর তখন রমনার আকাশ-বাতাস।
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি তখন রমনার গাছের ডালে ওড়ে আর গেয়ে ওঠে : জয় বাংলা বাংলার জয় হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়…
ব্যাঙ্গমা বলে, তোমারে কি কইছিলাম, বহুদিন আগে, এই ট্র্যাজেডি পূর্বনির্ধারিত?
ব্যাঙ্গমি বলে, হ কইছিলা। গ্রিক ট্র্যাজেডির পরিণতি দেবতারা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখেন। ক্যাস্টালিয়া ঝরনার জলকল্লোল, গভীর গর্ত থাইকা উইঠা আসা বাষ্পমালা, তারই আড়ালে তিন ঠ্যাংওয়ালা চৌকি থাইকা অ্যাপেলো করতেন ভবিষ্যদ্বাণী!
মনে আছে তোমার তাইলে? আর আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে বইসা আমেরিকাওয়ালারা কয়, পৃথিবীতে কে হাসব, কে কান্দব, এইটা ঠিক করুম আমরা। তারা বাঙালিরা কান্নারে কান্না মনে করে নাই। এক লক্ষ লোক মারা গেল, দুই লক্ষ লোক মারা গেল, দশ লক্ষ লোক মারা গেল, বিশ, ত্রিশ, তারা কয়, আমরা নীরব থাকুম। নীরব না থাইকা তারা পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাইল, শেষে ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ তথা সপ্তম নৌবহর পাঠাইল বঙ্গোপসাগরের দিকে, কিন্তু তাতে কি নিয়াজির কান্না, ইয়াহিয়ার অপমান ঠেকাইতে তারা পারল?
পারে নাই। কিন্তু ইতিহাসে একদিন এই প্রশ্ন তো উঠব যে, নিক্সন যদি ইয়াহিয়ার প্রেমে না পড়তেন, ইন্দিরা গান্ধীরে এত অপছন্দ না করতেন, স্টেট ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র অফিসারগো কথা যদি তিনি শুনতেন, তাইলে এত লক্ষ লক্ষ বাঙালি মারা যাইত না, এত এত ভারতীয় সৈন্যরেও জীবন দিতে হইত না, এত এত পাকিস্তানি নারীকে বিধবা হইতে হইত না, এত এত বিহারিকেও বিপদে পড়তে হইত না।
১৯৪৭ সালে যে সুময় পাকিস্তান হয়, সেই সুময় আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্শাল চিঠি লেখছিলেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানরে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান নামে একটা রাষ্ট্র হইতে যাইতেছে ভারতের উত্তর পশ্চিমের বড় অংশ আর দক্ষিণ-পুবের একটা ছোট্ট অংশ লইয়া, এইটারে আমগো পকেটে পুরতে হইব, সবচায়া বড় মুসলিম দ্যাশ আর সবচায়া ইম্পরট্যান্ট স্ট্র্যাটেজিক এলাকা, চীনের পাশে, রাশিয়ার কাছে, এইটারে আমার আছর করতেই হইব। সেই যে ট্রমান আর মার্শাল মিইলা পাকিস্তানের লগে পিরিত শুরু করলেন, বিধি এই যে, আমেরিকা যারে জাপ্টায়া ধরছে, তার কপালে আর কোনো দিনও উন্নতি নাই। এই যে পাকিস্তান জ্বলতে শুরু করল, ২৩ বছরে একটা সংবিধান দিতে পারল না, একটা ইলেকশন হইল, মিলিটারি আর কায়েমি শাসকশ্রেণি, সামন্ত প্রভু, বণিক আর শিল্পপতিরা মিইলা জনগণের ইচ্ছারে ট্যাংকের তলায় পিষল, সেই আগুন কোনো দিনও নিভব না। পাকিস্তান জ্বলছে, জ্বলতেই থাকব। পাকিস্তানের গরিব মানুষ কানতাছে। কানতেই থাকব। পাকিস্তানে বোমা ফোটে। ফুটতেই থাকব।
