১৬ ডিসেম্বরে ৯৭ জন চিকিসাধীন মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্ণৌ হাসপাতালের একটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেডিও শুনতে লাগলেন। পাকিস্তানিরা একটু পর সারেন্ডার করবে…একজন গাইতে শুরু করলেন, আমার সোনার বাংলা…
সবাই কাঁদতে লাগলেন।
.
খালেদ মোশাররফ যখন লক্ষ্ণৌ হাসপাতালে, তার যোগ্য সহযোগী মেজর এ টি এম হায়দার চলে এসেছেন ঢাকায়। মেজর হায়দার ডিসেম্বরের ৮ তারিখেই নির্দেশ দিয়েছেন, ২ নম্বর সেক্টরের ঢাকা গেরিলারা কেউ ঢাকা ছাড়বে না। রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ হতে পারে। তোমাদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বালু নদের পারে ছিল তাদের বাহিনী। সাভারের গ্রামে ছিল নাসির উদ্দীন ইউসুফের দল। তাদের কমান্ডার মানিকের মৃত্যুর পর নাসির উদ্দীন। ইউসুফ বাচ্চুই কমান্ডার। সাভার-ঢাকার রাস্তায় ঢাকামুখী পাকিস্তানি মিলিটারিদের অ্যাম্বুশ করে তাঁরা ছত্রখান করে দিচ্ছিলেন। ২ নম্বর সেক্টরের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তা ভরে ফেলে। রাস্তায়। যদিও কারফিউ, কিন্তু মুক্তি, ভারতীয় বাহিনী, পাকিস্তানি মিলিটারি সবাই রাস্তায় চলাচল করছিল। নিয়াজি আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন যুদ্ধ পরিত্যাগ করতে। মানেকশ নিজেও যুদ্ধবিরতি সকাল ৯টা থেকে বাড়িয়ে বিকেল ৩টা পর্যন্ত করে দিয়েছিলেন।
মেজর হায়দারের গায়ে লম্বা একটা লেদার জ্যাকেট। এটা তিনি কিনেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের লান্ডিকোটাল মার্কেট থেকে। তিনি ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই ঢাকায় ব্যস্ত। ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিংকে নিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গেলেন। এটা রেডক্রসের এলাকা। নো ওয়ার জোন। ভেতরে গভর্নর মালিকসহ অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন। সামনে মুক্তিযোদ্ধারা ভিড় করে আছে। জনতা উত্তেজিত। এর মধ্যে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে থেকে পদত্যাগী গভর্নর ডা. মালিকের সঙ্গে দেখা করে বের হলেন জেনারেল রাও ফরমান। মুক্তিবাহিনী, যাদের অনেকের পরনে লুঙ্গি, হাতে স্টেনগান, তাঁকে মেরে ফেলতে চায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। উৎসুক জনতা। তারা চিৎকার করছে, রাও ফরমান আলীকে আমাদের হাতে দাও। সে খুনি।
ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং বললেন, খবরদার। যুদ্ধবিরতি চলছে। ওরা সারেন্ডার করবে। নো মোর ওয়ার।
হায়দার বললেন, যুদ্ধ নয়, শান্তি।
রাও ফরমান আলী বাংলা জানতেন। তিনিও বললেন, যুদ্ধ নয়, শান্তি।
রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। হাজার হাজার মুক্তিবাহিনীর ছেলে। সবার হাতে রাইফেল। তারা চিৎকার করছে : তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। তারা স্লোগান দিচ্ছে : তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। হঠাৎ জনতার নজরে পড়ল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশেই রেডিও অফিস। সেখানে একটা পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। জনতা কাটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে গেল সেখানে। মুহূর্তে নামিয়ে ফেলল পাকিস্তানের পতাকা।
বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিল তারা ঝটপট। তখন ১৬ ডিসেম্বরের দুপুর। ঝকঝকে রোদ্দুরে সবুজের মধ্যে লাল, লালের মধ্যে হলুদ বাংলাদেশের মানচিত্র নিয়ে পতাকাটি পতপত করে উড়তে লাগল।
হায়দারের পাশে এসে দাঁড়াল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছেই বাড়ি ছিল যার, সেই জহিরউদ্দিন জালাল। হায়দার তাকে বললেন, তোমরা আমার সঙ্গে থাকো। হায়দার আর সাবেগ সিংয়ের সঙ্গে জালাল আরও দুজন তরুণ গেরিলা অস্ত্র হাতে পাশাপাশি চলতে লাগল। তারা জিপ নিয়ে ছুটে গেলেন। বিমানবন্দরে। হেলিকপ্টারে নামলেন জেনারেল জ্যাকব।
তাঁরা নিয়াজির সদর দপ্তরে চলে গেলেন।
.
দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডেমরায় যুদ্ধ করছিলেন মেজর কে এম সফিউল্লাহ। ভীষণ যুদ্ধ। শেষে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে। সফিউল্লাহ ভীষণ ক্লান্ত। এই সময় ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিংয়ের কাছ থেকে খবর এল, নিয়াজি সারেন্ডার করবে, তিনটায় এয়ারপোর্টে থাকতে হবে। চারটায় রমনা রেসকোর্সে। ডেমরা থেকে এয়ারপোর্টের রাস্তায় তখনো পাকিস্তানি বাহিনী গোলাগুলি করছিল। মেজর সফিউল্লাহ আত্মসমর্পণকারী কমান্ডার খিলজিকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি করে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেন। কে ফোর্সকে বলেন রমনায় ৪টার মধ্যে হাজির থাকতে।
গোলাগুলির মধ্যেই সফিউল্লাহ বিমানবন্দরে হাজির হন তিনটার আগেই।
বেলা তিনটার দিকে সাবেগ সিং এবং মেজর হায়দার আবার গেলেন বিমানবন্দরে। এর দায়িত্ব এরই মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ে নিয়েছে। জালালদের নিয়ে মেজর হায়দার ও সাবেগ সিং বিমানবন্দরে ঢুকলেন। ১৫-২০টা হেলিকপ্টার নামল। জেনারেল অরোরা, তাঁর স্ত্রী, এ কে খন্দকার হেলিকপ্টার থেকে নামলেন। জনতা ছুটে গেল ফুলের মালা নিয়ে। তাঁদের মাল্যভূষিত করা হলো বিপুলভাবে। কাদের সিদ্দিকী দাঁড়িয়ে ছিলেন এদিকটায়, তাকে দেখে মিসেস অরোরা দৌড়ে এলেন, জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমার বিয়ে কিন্তু আমি দেব। পাত্রী আমি ঠিক করব।
.
বিমানবন্দরে জেনারেল নিয়াজি তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন। জ্যাকব তো সঙ্গে ছিলেনই। বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতেও তাঁদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় মুক্তিবাহিনী আটকাচ্ছিল। ভাগ্যিস সঙ্গে শিখ সৈন্য ছিল। তার পাগড়ি দেখে মুক্তিবাহিনী ছেড়ে দিচ্ছিল।
