জ্যাকব হেলিকপ্টারে উঠে পড়লেন। যশোরে গিয়ে জ্বালানি ভরতে হলো। দুপুরের মধ্যে তিনি পৌঁছে গেলেন ঢাকা এয়ারপোর্টে। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে ব্রিগেডিয়ার বকর সিদ্দিকী উপস্থিত আছেন।
জ্যাকব নেমে প্রথমে জেনারেল অরোরাসহ কলকাতা থেকে জেনারেল ও সাংবাদিকদের নিয়ে আসা হেলিকপ্টারগুলোর অবতরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারটা দেখলেন। তারপর তাঁরা চললেন নিয়াজির অফিসের দিকে।
পথে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তাদের গতিরোধ করে।
জ্যাকব বলেন, আজ বিকেলে সারেন্ডার হবে।
তারা বলে, আমরা হেডকোয়ার্টার দখল করব। নিয়াজিকে হত্যা করব।
জ্যাকব বলেন, খবরদার। যুদ্ধের নিয়ম এটা না। রক্তপাতহীন সারেন্ডার হবে। তোমাদের সরকার ক্ষমতা নেবে। তারা বিচারের ব্যবস্থা করবে। সবাইকে ডিসিপ্লিন মানতে বলো। সবাইকে… গো… ডু ইট…
১০৮
জেনারেল ওসমানীকে তাজউদ্দীন বলে রেখেছেন, যেকোনো সময় আত্মসমর্পণের ঘোষণা আসবে। আপনি কোথাও যাবেন না। আপনি আপনার সদর দপ্তরে থাকুন।
ওসমানী চুপ মেরে গেলেন। তারপর বললেন, সারেন্ডারের অনুষ্ঠানে কি মানেকশ যাবে?
না। ইস্টার্ন কমান্ডার লে. জেনারেল অরোরা যাবেন।
তাহলে আমি কী করে যাব? আমার উপপ্রধান যেতে পারেন।
আপনি যাবেন, কারণ যৌথ কমান্ডের প্রধান আপনি আর অরোরা সাহেব।
আচ্ছা। আমি তাহলে প্রথমে যাব সিলেটে। হজরত শাহজালালের দরগা জিয়ারত করতে।
তাজউদ্দীন অসহায় বোধ করতে লাগলেন। সারাটা যুদ্ধে ওসমানী তার রুমে থাকতে ভালোবাসতেন। তিনি যুদ্ধকৌশল নিয়ে বই লিখেছেন। সৈয়দ নজরুল সাহেব বলেছিলেন, যুদ্ধের মধ্যে এই বই কে পড়বে? এটা বই লেখার সময়?
ওসমানী তাঁর এডিসি শেখ কামাল, কর্নেল রব, ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্তকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠলেন। সিলেট যাচ্ছেন।
কিন্তু পথে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি ছুঁড়ে বসল। গুলি হেলিকপ্টারের তেলের ট্যাংকি ফুটো করে দিল। সেই তেল হেলিকপ্টারের ভেতরেই পড়ছে। ওসমানী তার জ্যাকেট খুলে সেটা দিয়ে ফুটাটা চেপে ধরতে গেলেন। গরম তেল হাত পুড়িয়ে ফেলল।
সঙ্গে ছিলেন কর্নেল রব সাহেব। তাঁর পায়ে গুলি লেগেছে। ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বলের কবজি ফুটো হয়ে যায়। শেখ কামাল অক্ষত থেকে যান।
পাইলট বললেন, আমাদের অবতরণ করতে হবে। এইভাবে চলা রিস্কি। আমরা জানি না হেলিকপ্টারের আর কী ক্ষতি হয়েছে।
হেলিকপ্টার এক পাশে কাত হয়ে গেল। আবার সোজা হলো। সোজা নিচে নামতে লাগল।
ওসমানী বললেন, ওই মাঠের মধ্যে ল্যান্ড করো। ওই মাঠে।
পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার আলম বললেন, স্যার। অধীর হবেন না। পাখা ঠিক আছে। কাজেই আমরা ঠিকঠাক ল্যান্ড করতে পারব।
তারা মিত্রবাহিনীর একটা ঘাটির কাছে অবতরণ করলেন। মিত্রবাহিনীর লোকেরা এসে তাদের সালাম করল। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা ওসমানী এবং বিশেষ করে শেখ কামালকে দেখে খুশি হলো খুব। তারা বলল, আমরা যোগাযোগ করছি। আরেকটা হেলিকপ্টার আনিয়ে দিচ্ছি।
টাইগার ওসমানী বললেন, আমি আর হেলিকপ্টারে উঠব না। আমাকে শিলং এয়ারপোর্টে পৌঁছে দাও। আমি প্লেনে ঢাকা যাব।
শেখ কামাল বললেন, স্যার। চলেন যাই। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে। দেশ শত্রুমুক্ত হচ্ছে। এইটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। এটার সাক্ষী হতে পারা বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। আপনি আমাদের প্রধান সেনাপতি। আপনি থাকবেন না, এটা হয় না!
বাবা, আমি আর জীবনেও হেলিকপ্টারে উঠব না বাবা! তুমি যদি যেতে চাও যাও।
.
মুজিবনগর সরকার পাগলের মতো এ কে খন্দকারকে খুঁজছে। তিনিও অফিসে নেই। তিনি তখন কলকাতা নিউমার্কেটে। গলায় বাঁধার জন্য মাফলার খুঁজছেন। ইদানীং বেশ ঠান্ডা পড়েছে। আর শার্টের সঙ্গে মাফলার পরলে তাকে সুন্দর দেখায়।
মুজিবনগর সরকারের লোকেরা, গোয়েন্দারা, বিএসএফের লোকেরা নিউমার্কেট চষে তাকে ধরে গাড়িতে তুলে সোজা নিয়ে এল থিয়েটার রোডের অফিসে। তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলেন তিনি।
তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো দমদমে। তুলে দেওয়া হলো হেলিকপ্টারে।
ফারুক আজিজ খান আর নুরুল ইসলাম শিশু তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছেন। তাদের হেলিকপ্টার শূন্যে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জগজিৎ সিং অরোরা হেলিকপ্টারে উঠেছেন। তার স্ত্রীও তাঁর পাশে বসেছেন। অরোরার সঙ্গে মোটা কালো নিবের স্থায়ী কালির কলম। এটা তিনি নিউমার্কেট থেকে কিনে আনিয়েছেন। এরই মধ্যে জ্যাকবের বানানো আত্মসমর্পণের চুক্তিপত্র দিল্লি থেকে অনুমোদিত হয়ে এসেছে। সেটার অনেকগুলো কপি করা হলো এবং সঙ্গে নেওয়া হলো।
জ্যাকবের সঙ্গে কথা হয়েছে। জ্যাকব ঢাকায় লাঞ্চ করছেন।
১০৯
জ্যাকবের সামনে নিয়াজি। পাশে জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ, রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ, এয়ার কমোডর ইমাম। তাদের পাশে নাগরা। ঠিক বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ভারতীয় কর্নেল খারা।
জ্যাকব আত্মসমর্পণের কাগজটা বের করলেন। এই হলো চুক্তিপত্র।
সবাই চুপ করে আছে।
জ্যাকব টেবিলে কাগজ রাখলেন। সেটা কেউ পড়ছে না।
জ্যাকব বললেন, কর্নেল খারা। এটা পড়ে শোনাও।
খারা পড়তে লাগলেন :
পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীসহ সব আধা সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।
