তোমারই মেজর জেনারেল নাগরা
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
সকাল ৮টা ৩০।
.
দুটো গাড়ি নিয়ে ৬ জন যাচ্ছে মিরপুর থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে। চারজন ভারতীয়, দুজন মুক্তি। তাদের সঙ্গে সাদা পতাকা নেই। সাদা শার্ট ছিঁড়ে দুটো সাদা পতাকা বানিয়ে গাড়ির সঙ্গে বাঁধা হলো।
তারা ঢুকে গেল ক্যান্টনমেন্টে। সেনাসদরে গেল। চিঠি দেখাল। বলল, এই চিঠি জেনারেল নিয়াজির কাছে পৌঁছে দাও।
তখন সকাল নয়টা। নিয়াজি, জামশেদ, রাও, রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ হেডকোয়ার্টারেই আছেন। সারা রাত ঘুমাননি।
চিঠি নিয়ে ব্যাটম্যান গেল তাদের কাছে।
রাও ফরমান বললেন, এই লোক কি ভারতীয়দের পক্ষ থেকে দেনদরবার করতে এসেছে?
নিয়াজি চুপ করে থাকলেন।
রাও ফরমান বললেন, আপনার কাছে কি কোনো রিজার্ভ আছে?
নিয়াজি নীরব।
শরিফ পাঞ্জাবিতে বললেন, কুচ পাল্লে হ্যায়? থলেতে কি কিছু আছে? নিয়াজি তাকালেন জামশেদের দিকে। জামশেদ ভাবলেন, কিছু কাদালেপা মাইক্রোবাস আর আলবদর আছে। তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করছে। এটা তো রাও ফরমান আলীও জানেন, নিয়াজিও জানেন। এর বাইরে তো আর কিছু নেই।
জামশেদ না-সূচক মাথা নাড়লেন।
রাও ফরমান আর শরিফ একসাথে বলে উঠলেন, তাইলে আর কী! নাগরাকে ডেকে এনে জামাই আদর করুন।
নিয়াজি বললেন, জামশেদ। যাও। নাগরাকে নিয়ে এসো।
সামরিক ওয়্যারলেসগুলো সচল হয়ে উঠল। ক্যান্টনমেন্ট মিরপুর রোডে ইন্ডিয়ানরা ঢুকবে। কেউ হামলা কোরো না।
জামশেদ বার্তা বাহকদের বললেন, তোমরা যাও। আমরা আসছি।
সারেন্ডার করছ?
আমরা সিজ ফায়ার করব। নাগরাকে রিসিভ করতে আমি যাব।
মেজর জেনারেলের ব্যাজ দেখে ওরা আশ্বস্ত হলো। ওদের মনে ফুর্তি। সারেন্ডার হতে যাচ্ছে।
ওরা দুই জিপ তীব্র বেগে ছুটিয়ে মিরপুরের দিকে ছুটল। বাতাসে সামনের জিপের সাদা পতাকা খুলে গেছে, তারা টের পায়নি।
মিরপুরের কাছে যেতেই মিত্রবাহিনী গুলি ছুঁড়ে বসল।
নিজেদের গুলিতে মারা গেল দুজন। আহত দুজন।
তাদের হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে পাঠানো হলো।
পেছনের গাড়ির বাহকেরা জানাল, মেজর জেনারেল জামশেদ আসছেন।
.
মেজর জেনারেল জামশেদ আরও কয়েকজন অফিসার একটা মার্সিডিজ বেঞ্জ আর দুটো জিপ নিয়ে চলে এলেন মিরপুরে। নিজেদের বেল্ট, ক্যাপ খুলে দিলেন নাগরার হাতে। অস্ত্র তুলে দিলেন।
নাগরা, ক্লেয়ার, কাদের সিদ্দিকী তাদের সঙ্গে চলে এলেন ক্যান্টনমেন্ট হেডকোয়ার্টারে।
নিয়াজির রুমে বসলেন।
নিয়াজি এলেন। স্যালুট করলেন। সবার সঙ্গে হাত মেলালেন। হাত বাড়ালেন কাদের সিদ্দিকীর দিকে। কাদের সিদ্দিকী হাত ফিরিয়ে নিলেন। বললেন, আমি কোনো খুনির সঙ্গে হাত মেলাই না।
ব্রিগেডিয়ার বকর ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দুপুরে লাঞ্চ করতে আসবেন। জেনারেল জ্যাকব। ভালো খাবার দরকার। হেডকোয়ার্টারের রুমগুলো সব নোংরা। পরিষ্কার করা দরকার। মেহমানরা আসছেন। কী লজ্জা! কত দিন। এগুলো ঝাড়ু দেওয়া হয় না। এখানে-ওখানে ম্যাপ পড়ে আছে। তিনি সব। গোছগাছ করলেন। দুপুরের খাবারের মেনু কী হবে জিজ্ঞেস করলেন।
কাদের সিদ্দিকী বললেন, আত্মসমর্পণ হতে হবে রেসকোর্স ময়দানে। নাগরাকে তিনি বিশেষভাবে বললেন, আমি একটু টাঙ্গাইল ঘুরে আসব। এখুনি বের হব। বিকেলের আগেই পৌঁছাব। আপনি রেসকোর্সের ব্যাপারটা এনশিওর করবেন। কাদের সিদ্দিকী বিদায় নিলেন।
.
নাগরা আর নিয়াজি পূর্বপরিচিত। পুরোনো দোস্ত।
নিয়াজি কৌতুক বলতে শুরু করলেন। সবই অশ্লীল কৌতুক। একজন সৈনিক মরুভূমিতে গেছে যুদ্ধ করতে। সে একটা উটের রাখালকে বলল, সেক্স উঠলে তোমরা কী করো। রাখাল উট দেখিয়ে দিল…
১০৭
জেনারেল জ্যাকব কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে তাদের হেডকোয়ার্টারে। সকালবেলা তিনি নাশতা করছিলেন মাংস আর নানরুটি। মাংসে ঝাল বেশি হওয়ায় তাঁকে পানি খেতে হলো। নাশতাটা ভালো হলো না। চায়ের কাপে বেশি করে দুধ ঢেলে নিয়ে তিনি মুখে দিচ্ছেন। এই সময় ফোন বেজে উঠল। তিনি উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন।
জ্যাক-ফোনের ওপার থেকে আওয়াজ এল।
ইয়েস স্যার।
সকালের নাশতা কেমন হয়েছে?
ভালো না।
গুড। পেট খালি রাখো।
কেন স্যার?
দুপুরে নিয়াজির সঙ্গে লাঞ্চ করতে হবে।
এটা কি রসিকতা নাকি অফিশিয়াল অর্ডার।
অফিশিয়াল অর্ডার। সে তোমাকে ইনভাইট করেছে।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি। কিন্তু সারেন্ডারের ডকুমেন্ট আমি যে একটা বানিয়েছি, এটা কি আপনারা দেখেছেন?
না। তুমি নিজের মতো করে করো। জ্যাক, একটা কথা বলি, বেশি জোরাজুরি কোরো না। শুধু একটা পয়েন্ট, সিজ ফায়ারেই রাজি হয়ে যেয়ো না। ওরা অস্ত্রসমর্পণ করবে।
ওকে। আমি একটা ডিড করেছি। সেটা আমি অরোরাকে দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
জ্যাকব যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে গেলেন। পথে দেখা পেলেন মিসেস অরোরার। তিনি বললেন, আত্মসমর্পণ দেখতে আমি ঢাকা যাচ্ছি। আমি আমার হাজব্যান্ডের পাশে বসব।
ঢাকা এখনো নিরাপদ নয়।
তাহলে আমি আমার স্বামীকে ছাড়ব কেন?
জ্যাকব জেনারেল অরোরার কাছে গেলেন। আত্মসমর্পণের ড্রাফট দেখালেন। অরোরা বললেন, ঠিক আছে।
জ্যাকব উঠলেন। আরও কিছু কাজ বাকি। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর সিডনি শনবার্গ বলে রেখেছেন সেই ৩ ডিসেম্বরে। তাঁকে যেন আত্মসমর্পণে নিয়ে যাওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী এবং উপ-সেনাপতি এ কে খন্দকারকে নিতে হবে। আত্মসমর্পণ হবে যৌথ বাহিনীর কাছে, ভারতীয় কমান্ডের কাছে নয়।
