গাড়ি থেকে নামলেন রেনু, জামাল, রাসেল, খোকা। বেল টিপতেই বেরিয়ে এলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন রহমান। তিনি এঁদের আগে থেকেই চিনতেন, সাদরে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
এরই মধ্যে দারোয়ানের মুখে শোনা গেল, ধানমন্ডি ৮ নম্বর ব্রিজের কাছে পড়ে আছে একটা লাশ। কার লাশ কেউ বলতে পারে না। তবে লোকে বলাবলি করছে, শেখ কামাল মারা গেছে।
শুনে রেনু মেঝেতে গড়াগড়ি করে কাঁদতে আরম্ভ করলেন, কামাল রে, তুই কই গেলি রে…।
মমিনুল হক বের হলেন ঘটনা কী তা জানার জন্য। বললেন, ভাবি, আমি খোঁজ নিতে বের হচ্ছি, কামাল কই আছে, সেটাও বের করব। হাসিনা রেহানাদের ওখানেই যাই। ওদের খবরও তো জানা দরকার।
৯
হাসিনার তো ভালো খাবারদাবার দরকার। একটু বিশ্রাম দরকার। ভালো রকমের একটা বিছানা পেলেও তো তিনি খানিকটা জিরিয়ে নিতে পারতেন। ওয়াজেদ মিয়া উদ্বিগ্ন বোধ করেন। কাল সারাটা দিন গেছে একই খিচুড়ি খেয়ে। আজকে সকালেও আর কোনো উপায় নেই। খিচুড়িই চুলায় বসাচ্ছে। পাগলা।
রেহানা বারবার বারান্দায় যাচ্ছেন। আকাশ মেঘলা। বাইরের আকাশ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই, বেলা বাড়ছে। হঠাৎই ডোরবেল বাজার শব্দ।
রেহানা এগিয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন স্বপ্ন দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে একটা জগ। বললেন, মা পাঠিয়েছেন। হাসিনা আপার জন্য। দুধ।
রেহানা দরজা খুললেন।
স্বপ্ন বললেন, কারফিউ উইথড্র করেছে।
ওয়াজেদ মিয়াও এগিয়ে এসেছেন। তিনি বললেন, কারফিউ উইথড্র করেছে! তাহলে চলো, আমরা ৩২ নম্বরে যাই।
হাসিনা বললেন, হ্যাঁ। সেটাই ভালো।
জেলি বললেন, আমি একটু দুধটা গরম করে দিই।
স্বপ্ন বললেন, গরম করতে হবে না। জ্বাল দেওয়া দুধ।
পাগলা একটা গেলাস এগিয়ে দিল। স্বপ্ন তাতে দুধ ঢেলে হাসিনার দিকে। এগিয়ে ধরলেন।
পাগলা বলল, কারফিউ নাই। আমি ৩২ নম্বর গেলাম। আম্মা, রাসেল ভাই আর সাহেবের খবর আগে লই। তারপর বাকি কথা। সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
ওয়াজেদ মিয়া বাইরে বের হয়ে একটা ধাক্কামতো খেলেন। গেটের সামনে দুটো মিলিটারি জিপ। জলপাই রঙের জিপে সশস্ত্র সৈনিকদের মনে হচ্ছে যমদূত। গাড়িটা গ্যারেজে। সেখানে যেতে হলে গেটের বাইরে মিলিটারি জিপ পার হয়ে যেতে হবে। ওয়াজেদ মিয়া সাহস করে এগোলেন। মিলিটারিদের বললেন, এই গ্যারেজে আমার গাড়ি আছে।
মিলিটারিরা তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দিল।
ওয়াজেদ মিয়া গ্যারেজের দরজা খুললেন। ভেতরে গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা আর কাঁচের মধ্যে জয় বাংলা পোস্টার। বাড়ির ভেতর থেকে পানি আর ন্যাকড়া এনে পোস্টার তুললেন ঘষে ঘষে। বাংলাদেশের পতাকা খুলে ফেললেন। তারপর গাড়ি এনে রাখলেন বাড়ির সিঁড়ির সামনে।
হাসিনা, রেহানা, জেলি গাড়িতে উঠে বসলে ওয়াজেদ মিয়া গাড়ি স্টার্ট দিলেন। প্রথমে তারা গেলেন ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে। বাড়ি সিলগালা করা। ভেতরে ঢোকা গেল না।
গাড়ির শব্দ পেয়ে ডাক্তার সাহেবের বড় ছেলে বেরিয়ে এলেন তাঁদের বাসা থেকে। বললেন, আপনারা বাসার ভেতরে আসুন।
ডাক্তার সাহেব ছিলেন। তিনি বললেন, মিনিট পাঁচেক আগে খোকা ভাই এসেছিলেন। তিনি ভাবি, জামাল, রাসেলকে নিয়ে গেছেন। ধানমন্ডি ২ নম্বরের দিকে গেছেন।
রেহানা বললেন, খোকা চাচার বন্ধুদের বাসা আমি চিনি। ২ নম্বর রোডে তাঁর খুব খাতিরের বন্ধু আছে। চলেন আমরা সেখানে যাই। যদি খোঁজ পাওয়া যায়।
২ নম্বরে ঠিক বাসাতেই গেলেন ওয়াজেদ মিয়া। শুনতে পেলেন একটু আগে খোকা এখান থেকে চলে গেছেন বেগম মুজিবদের নিয়ে। এইখানে তো সারা রাত গোলাগুলি হয়েছে। কাছেই পিলখানা। একেবারে যুদ্ধক্ষেত্র। হয়ে গিয়েছিল এই রাস্তাটা। আমরা চলে যাচ্ছি গ্রামে।
একজন বললেন, কামাল ভাই মারা গেছে জানো। ৮ নম্বরে লাশ পড়ে আছে।
আরেকজন বললেন, না না। ওইটা কামাল না। পানাউল্লাহ সাহেবের ছেলে খোকনের লাশ। ও রাতে ওখানে ব্যারিকেড দিচ্ছিল। তখন মারা গেছে।
হাসিনা, রেহানা, জেলি পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। তাঁদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে যে কামাল মারা যাননি। কারণ, ওমর ভাই খোঁজ দিয়ে গেছেন। কামাল ভাই-ই তাকে পাঠিয়েছিলেন।
হাসিনা বললেন, মা তো আমাদের খোঁজে আমাদের ভাড়া করা বাড়িতেও যেতে পারে। চলো, ওই বাড়ির দিকে যাই।
রেহানা বললেন, হ্যাঁ। তা-ই হতে পারে। মা আগে আমাদের খোঁজ নিশ্চয়ই নিতে যাবেন।
ওয়াজেদ মিয়া গাড়ি চালাতে শুরু করলেন।
১৫ নম্বর সড়কের ভাড়া বাসার কাছে যেতেই হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল, হাছু আপা, দেনা আপা, দুলাভাই…
রাসেলের গলা। ওয়াজেদ মিয়া ব্রেক কষলেন। ১৫ নম্বরে ক্যাপ্টেন রহমান সাহেবের দোতলায় রাসেল।
সামনে দেখা গেল খোকা চাচার গাড়ি।
সবাই গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দোতলায় গেলেন।
বেগম মুজিব ওরফে রেনু মেঝেতে শুয়ে আছেন। তিনি প্রলাপ বকছেন। ওয়াজেদ সাহেবকে দেখে তিনি বললেন, বাবা, ওরা কামালকে মেরে ফেলেছে।
রেহানা বললেন, মা, যে লাশটাকে সবাই কামাল ভাই ভাবছে, ওইটা কামাল ভাই না। খোকন ভাই। তুমি কান্নাকাটি কোরো না। কামাল ভাই খবর দিয়ে ওমর ভাইকে পাঠিয়েছিলেন। উনি ভালো আছেন।
রেনু বললেন, ও বাসায় ঢোকার পর যা গুলি করেছে, কেমনে বেঁচে থাকে!
ঠিক এই সময় আবার ডোরবেল বেজে উঠল। দেখা গেল, কামাল এসেছেন।
