ভুট্টো পোল্যান্ডের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন। রাগে কাপেন। চোখের পানি ফেলেন। তারপর তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে তিনি পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
গ্যালারিতে পাকিস্তানি ছাত্ররা হাততালি দিয়ে ওঠে: ভুট্টো কামাল কর দিয়া।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, ভুট্টোর আসল উদ্দেশ্য পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণরে নিজের দাপট দেখানো। তিনি দেশের সেনাবাহিনীর অপমান বন্ধ করার থাইকা নিজের ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করার দিকেই নজর দিতেছেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, আর ভুট্টো যদি পোল্যান্ডের প্রস্তাব পাস হইতে দিতেন, একই ফল ঘটত, যা ১৬ তারিখে ঘটব, মুজিব বাংলাদেশে ক্ষমতা পাইতেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব বাংলা ছাড়ত। আর বাংলাদেশ স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত হইয়া যাইত। পাকিস্তানি সৈন্য ও জনতা কইত, এইটা ভুট্টো করাইছেন। এখন তিনি কইতে পারবেন, আমি আত্মসমর্পণের লজ্জার অংশ না।
.
ভুট্টো কাগজ ছিঁড়ে ফেললে ভারতীয়রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক। ভারত যা চায়, ভুট্টো তা-ই করলেন। যুদ্ধবিরতি হচ্ছে না। আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তানিরা।
১০৬
জেনারেল মানেকশর কাছে পৌঁছে গেল নিয়াজির বার্তা। তিনি জবাব পাঠালেন। ওকে, আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাচ্ছি। সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত সব ধরনের হামলা বন্ধ থাকবে।
চুক্তি যা করার করবে ইস্টার্ন কমান্ড। আমরা রেডিও লিংক দিয়ে দিচ্ছি। ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করো। মনে রেখো, ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে যদি রাজি না হও, তাহলে একযোগে আক্রমণ করা হবে।
.
ঢাকা চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে মুক্তিবাহিনী। হাজারে হাজারে। মিত্রবাহিনী আসছে। তাদের সঙ্গে ভারী অস্ত্র, অনেক রসদ, অনেক গোলাবারুদ। তাদের। আসতে সময় লাগছে। মুক্তিবাহিনীর ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্তরা ছাড়াও স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং পাওয়া, কখনো ভারতে না যাওয়া এবং শত্রুদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হাজার হাজার যোদ্ধা খালি পায়ে, নৌকায়, সাইকেলে, রিকশায়, গাড়ি করে, বাসে চড়ে, ট্রাকে চড়ে ঢাকার দিকে আসছে। এর মধ্যে ২ নম্বর সেক্টর থেকে ট্রেনিং ও অস্ত্র নিয়ে আসা আরবান গেরিলারা আছে ঢাকার ভেতরেই।
.
১৫ ডিসেম্বরে মেজর গান্ধর্ব নাগরা রাত কাটাচ্ছেন টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে। রাত ১১টা। কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইলের জেলা পরিষদ ভবনে অফিস বানিয়ে কাজ করছেন। নাগরার ফোন এল তার কাছে। বারো হাজার সৈনিকের নাশতা লাগবে। এটা কি এখন থেকে ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে জোগাড় করে দেওয়া যাবে?
কাদের সিদ্দিকী বললেন, টাঙ্গাইল আমার এলাকা। আপনি এখানে আছেন। আমিও আছি। টাঙ্গাইলে বসে যদি কয়েক হাজারজনের নাশতা না দিতে পারি, কী পারব তাহলে? মেনু বলুন।
রুটি-হালুয়া। চা হলে ভালো হতো। কিন্তু সৈন্যরা ঢাকার কাছে। এত দূর চা নিয়ে যাবেন কী করে?
কাদের সিদ্দিকী অর্ডার দিলেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় যে সংগ্রাম কমিটি করতে বলেছিলেন, তা সেই মার্চ থেকে অনেক কাজে লেগেছে। এইবারও লাগল। কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর কর্নেল ফজলু, কর্নেল নিয়ত আলী, ক্যাপ্টেন খোরশেদ, মোয়াজ্জেম লেগে পড়লেন দুই শ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। কুড়ি হাজার রুটি, কুড়ি হাজার পরোটা, ত্রিশ হাজার পাউরুটির স্লাইস, দশ ডেকচি ডাল, দশ ডেকচি খাসির মাংস, দশ হাঁড়ি সবজি তৈরি হলো ৬ ঘণ্টা ধরে।
ভোর ছয়টায় দুটো হেলিকপ্টার এল। নাশতা উঠল অর্ধেক একটাতে। আরেকটায় জেনারেল নাগরা, কাদের সিদ্দিকী উঠলেন।
আধঘণ্টার মধ্যে তারা প্রথমে নামলেন গাজীপুর মৌচাক স্কাউট ক্যাম্পে। ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার ছুটে এলেন। এটা তাঁর সদর দপ্তর। তিনি বললেন, খবর শুনেছ? নিয়াজি সম্ভবত আত্মসমর্পণ করবে।
ক্লেয়ারকে নিয়ে তারা আবার উঠলেন হেলিকপ্টারে। আরেকটা হেলিকপ্টার নাশতা আনা-নেওয়া করছে টাঙ্গাইল থেকে।
তারা সাভার মিরপুর রোডের ওপরে হেলিকপ্টার নামালেন। এখানে আছেন ব্রিগেডিয়ার সান সিং। তিনি এলেন। বললেন, সারা রাত ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে।
সান সিংয়ের কমান্ডে যৌথ বাহিনী মিরপুরের দিকে দুই কলামে রাস্তার দুই ধার দিয়ে ঢাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কাদের সিদ্দিকী, নাগরা, ক্লেয়ার, সান সিংও যাচ্ছেন। আধা মাইল দূরে আরেকটা সেতুর কাছে যেতেই দেখা গেল, মুক্তিযোদ্ধারা দৌড়ে দৌড়ে আসছে। তারা বলল, তারা অনেক আগেই এখানে পৌঁছে গেছে।
কীভাবে পারলে? নাগরা বললেন। তোমরা তো আমাদের সাথেই ছিলে?
ওরা হাসল। বলল, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা তো আগে আগেই যাব। এটা আমাদের চেনা জায়গা।
সান সিং হুকুম করলেন, সোলসার্জ, কুইক মার্চ। সামনে শত্রু নেই। দ্রুত চলো।
সকাল আটটার মধ্যে তারা হেমায়েতপুর সেতুর ওপরে পৌঁছালেন। মেজর জেনারেল নাগরা দুরবিন দিয়ে দেখতে লাগলেন ঢাকা। ঢাকার স্কাইলাইন খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। দুরবিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আর্কিটেক্ট লুই কানের নকশা করা জাতীয় সংসদ ভবনের চূড়া।
নাগরা গাড়ির বনেটে কাগজ রাখলেন। কলম বের করে তিনি নিয়াজির উদ্দেশে লিখতে লাগলেন :
প্রিয় আবদুল্লাহ,
আমরা এসে গেছি। আমি এখন মিরপুরে। তুমি আমার কামানের ব্যারেলের রেঞ্জের মধ্যে। অযথা রক্তক্ষয় কোরো না। আত্মসমর্পণ করো। তোমাদের জেনেভা কনভেনশন অনুসারে মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তুমি কি আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে তোমার কোনো অফিসারকে পাঠাবে?
