বার্তা নিয়ে মিলিটারি সেক্রেটারি ইসহাক ঢুকে গেলেন সেই পার্টিতে।
কী চাও? ইয়াহিয়া বললেন। মদের গেলাস থেকে একঝলক মদ তাঁর শার্টে পড়ে গেল।
নিয়াজি আর রাও এটা পাঠিয়েছেন আমেরিকানদের কাছে। ইন্ডিয়ানদের পাঠানো হচ্ছে।
কী বিষয়ে?
ইস্ট পাকিস্তানে সিজ ফায়ার।
ইস্ট পাকিস্তান? সেটা আবার কী? আমি কী করতে পারি? ইস্ট পাকিস্তান নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।
তিনি গুনগুন করে গান গাইতে লাগলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি পৃথিবীর বাইরে। তিনি এই জগতে বিরাজ করছেন না।
১০৫
ভুট্টো নিজেকে ভাবছেন একজন হিরো।
নিউইয়র্কের হোটেলের রুমে আয়নায় নিজেকে দেখে নিলেন। সাদা শার্ট। কালো কোট। কালো টাই। মাথার সামনে টাক। সেটা তাকে একটু বিদ্বান বলে চিহ্নিত করছে, মন্দ না। এই চেহারা আর অনলবর্ষী বক্তৃতা দিয়ে তিনি জনতাকে বশ করেন আর পটিয়ে ফেলেন নারীদের। তিনি আজকে একটা শো। করবেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটা অনলবর্ষী ভাষণ দেবেন। কী বলবেন, একবার রিহার্সাল করা দরকার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি। একটা ভাষণ দিয়ে নিলেন। নিজের পারফরম্যান্সে নিজেই মুগ্ধ হয়ে তিনি হোটেলকক্ষ থেকে বের হলেন।
তিনি লিফটে এলেন। ১৫ ডিসেম্বরের শীতে নিউইয়র্কে ম্যানহাটানের রাস্তাগুলোর ম্যানহোল থেকে ধোয়া উঠছে। মাঠগুলোয় তুষার দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান দূতাবাস থেকে আসা গাড়ি এবং অফিসাররা তাঁকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৌঁছে দিলেন। তাঁকে বরণ করে নিলেন জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি। সবাই ধোপদুরস্ত পোশাকে তরবারির মতো ঝকঝক করছে। সবাই পরেছে কালো কোট, কালো টাই। তাদের দলটাকে সত্যি ভালো দেখাচ্ছে।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সভাকক্ষে গিয়ে বসলেন। দর্শক গ্যালারিতে পাকিস্তানের কিছুসংখ্যক ছাত্র উপস্থিতি। তারা ভুট্টোর শো দেখতে এসেছেন।
পোল্যান্ড নিরাপত্তা পরিষদে নতুন প্রস্তাব এনেছে। নিঃসন্দেহে এটা এসেছে সোভিয়েতদের কাছ থেকে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং উদ্বিগ্ন নন। তবে কৌতূহলী। তাদের নীতি হলো, যথাসম্ভব জাতিসংঘের কার্যক্রমকে বিলম্বিত করে দেওয়া। আর দু-এক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব কমান্ডে আত্মসমর্পণ করবে। কাজেই পোল্যান্ডের প্রস্তাব যদি গৃহীতও হয়, তবু ভারত তা মানবে না। শেষ আঘাত ভয়ংকর শক্তিতে হানবে পূর্ব সেক্টরে, ঢাকায় হার মানাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে। ইন্দিরা গান্ধীর এই পরিকল্পনা শরণ জানেন।
ইন্দিরা গান্ধী ডি পি ধরকে পাঠিয়েছেন মস্কোতে। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিনকে একটা চিঠি দিয়ে। কোসিগিন তখন অশ্বথপাতার মতো থরথর করে কাঁপছেন। তিনি বললেন, ভারতের অভিযানের অবস্থা কী? যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। ইন্দিরা গান্ধী নিক্সনকেও চিঠি লিখেছেন। তিনি কূটনৈতিকভাবে যা করার করছেন, কিন্তু তিনি তাঁর প্ল্যান জানেন। দু এক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশকে মুক্ত করে ফেলতে হবে। দ্রুত। ভারত সব মাধ্যমে সবাইকে এই একটা বার্তা দিচ্ছে, এই লড়াই বাংলাদেশের, ভারত মোটেও নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করছে না, পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চায় না, পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো ভূমিই সে দখল করবে না, আজাদ কাশ্মীর দখল করে নেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পোল্যান্ডের প্রস্তাব হলো, এখনই যুদ্ধবিরতি। যে সৈন্য যেখানে আছে, সেখানে সে অবস্থাতেই স্থির হয়ে যাবে। শেখ মুজিবের হাতে পুবের ক্ষমতা দেওয়া হবে। আর পাকিস্তান পুব থেকে। তার সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবে ভেটো না-ও দিতে পারে। নিক্সন, কিসিঞ্জার সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। সোভিয়েত-আমেরিকা সম্পর্ক চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে বলে হুমকি দিয়েছেন।
ভুট্টো এলেন জাতিসংঘ দপ্তরে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদে একটা বিবৃতি দিতে চান।
তিনি ফ্লোর নিলেন। বলতে শুরু করলেন : জাতিসংঘ ব্যর্থ। এই নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ। চার দিন ধরে আমি এই বিতর্কে অংশ নিচ্ছি। গতকাল দেড় ঘণ্টা ধরে শুধু এই আলোচনা হয়েছে যে আজ কি অধিবেশন সাড়ে নয়টায় শুরু হবে, নাকি সকালের নাশতা, রাতের ঘুমের জন্য ১১টায় শুরু হবে?
গোটা অধিবেশনের একটাই লক্ষ্য। বিলম্বিত করা। যাতে ঢাকার পতন ঘটে।
ঢাকার পতন ঘটলে কী এসে যাবে? সারা পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঘটলে কী এসে যাবে? সারা পাকিস্তানের পতন ঘটলেই-বা কী এসে যায়? আমরা নতুন পাকিস্তান গড়ে তুলব।
তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগাশাহি। আরও ৬ জন। সবার মুখ পাথরের মতো শক্ত, মেঘলা আকাশের মতো থমথমে।
ভুট্টো বলেন, আমরা হাজার বছর ধরে লড়ব। ভারত আজ তার সামরিক সফলতায় পাগল হয়ে গেছে। এ হচ্ছে কেবল শুরু। আজ পাকিস্তানে আমরা গিনিপিগ। কাল অন্যরাও গিনিপিগ হবে। আপনারা চান আমরা পা চাটি। আমরা পা চাটব না। আমি ইঁদুর নই। আমার জীবনে। আমি কখনো ইঁদুরের কাজ করিনি। আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি সাহসের সঙ্গে তা প্রতিরোধ করেছি। আমি নত হব না। আমি এই নিরাপত্তা পরিষদ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে অপমানিত মনে করছি। আমার দেশকে অপমানিত করা হয়েছে মনে করছি। আমি আগ্রাসনকে বৈধতা দেবার অংশ হতে পারি না। আমরা ফিরে যাব এবং লড়াই করব। আমার দেশ আমাকে চাইছে। আপনি আপনার নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে থাকুন।
